Saturday, May 18, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

বাংলাদেশে যে কারণে মহাবিপন্ন বন্যপ্রাণীর তালিকায় শকুন

১৯৭০ সালে বাংলাদেশে শকুন শুমারিতে ৫০ হাজারের মত শকুন দেখা গিয়েছিল। এই সংখ্যা পরবর্তী ২০০৮-০৯ শুমারিতে ১৯৭২টিতে নেমে আসে। এরপর ২০১১-১২ সালে এসে দাঁড়ায় ৮১৬টিতে। সর্বশেষ ২০১৪ সালের শকুন শুমারিতে এসে দাঁড়ায় ২৬০টিতে

আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০২২, ০৮:৩৩ পিএম

বাংলাদেশের সরকার শকুন রক্ষায় বিশেষ কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার পরেও প্রতি বছর কমছে মহাবিপন্ন এই প্রাণীটির সংখ্যা। সর্বশেষ ২০১৪ সালের শুমারি বলছে, বর্তমানে দেশে মোট শকুন রয়েছে ২৬০টি। এর সবগুলোই বাংলা শকুন। এ ছাড়াও দেশে আরও পাঁচ প্রজাতির শকুন দেখা যায়। কিন্তু সেগুলো অনিয়মিত ভিত্তিতে দেখা যায়।

বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শকুন এখন প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক আন্তর্জাতিক ইউনিয়ন আইইউসিএন-এর লাল তালিকাভুক্ত প্রাণী। এর মানে হচ্ছে, যদি কোনো প্রাণীর ৯০%-ই প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যায় তাহলে সেটি রেডলিষ্ট বা লাল-তালিকাভুক্ত প্রাণী হয়।

আইইউসিএন বলছে, জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশে আরও একটি শকুন শুমারি চলছে। যা আগামী মার্চ মাস পর্যন্ত চলবে। এই শুমারি শেষে বলা যাবে, দেশে বর্তমানে শকুনের সংখ্যা কত এবং তাদের প্রজননের কি অবস্থা।

২৬ লক্ষ বছর ধরে পৃথিবীতে শকুন বসবাস করে আসছে। শকুন বড় ডানাওয়ালা ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টির অধিকারী একটি পাখি। এদের মাথা, ঘাড় এবং গলায় পালক নেই, তাদের ঠোঁট খুব ধারালো। এরা ময়লার ভাগাড় থেকে খাবার খুঁজে খায়। এই পাখি অনেক উপর থেকে পশুর মৃতদেহ দেখতে পায়। তারপর সেখানে নেমে আসে এবং সেই পশুর দেহ দ্রুত সাবাড় করে।

শকুন পচা-গলা মাংস খাওয়াসহ ভয়াবহ অনেক জীবাণু হজম করতে পারে। মৃত পশুর দেহ তো বটেই, তাদের হাড় পর্যন্ত হজম করে ফেলতে পারে শকুন।

প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক আন্তর্জাতিক ইউনিয়ন আইইউসিএন বলছে, এক সময় এই উপমহাদেশে চার কোটি শকুন ছিল, কিন্তু সে সংখ্যা দ্রুত কমতে থাকে। ১৯৭০ সালে বাংলাদেশে শকুন শুমারিতে ৫০ হাজারের মত শকুন দেখা গিয়েছিল। এই সংখ্যা পরবর্তী ২০০৮-০৯ শুমারিতে ১৯৭২টিতে নেমে আসে। এরপর ২০১১-১২ সালে এসে দাঁড়ায় ৮১৬টিতে। সর্বশেষ ২০১৪ সালের শকুন শুমারিতে এসে দাঁড়ায় ২৬০টিতে।

অথচ বাংলাদেশে এক সময় প্রায় সব জায়গাতেই দেখা মিলত এই পাখিটির। বর্তমানে শুধু সিলেট এবং সুন্দরবন এলাকাতেই দেখা মেলে। বাংলাদেশে এক সময় প্রায় সাত প্রজাতির শকুনের দেখা যেত। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে রাজ শকুন পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অর্থাৎ ৪০ বছরে একটি রাজ শকুনও দেখা যায়নি।

আইইউসিএনের শকুন বিষয়ক দক্ষিণ এশিয়া সমন্বয়কারী সারোয়ার আলম দীপু বিবিসিকে বলেন, “বাংলাদেশে এই মূহুর্তে প্রায় ৬ প্রজাতির শকুন রয়েছে। এর মধ্যে দুইটি পরিযায়ী প্রজাতি। মানে শীত মৌসুমে এসে এপ্রিল মাস পর্যন্ত থাকে। এই দুই প্রজাতি হচ্ছে হিমালয়ান শকুন এবং ইউরেশীয় শকুন। তবে বাংলাদেশে শকুন শুমারিতে যে ২৬০টি শকুন পাওয়া গেছে তারা সবাই বাংলা শকুন প্রজাতির।”

তিনি আরও বলেন, “বাংলা শকুন বাদে অন্য প্রজাতির শকুন নিয়মিত দেখা যায় না। ইজিপশিয়ান শকুন খুবই বিরল। গত ১০ বছরে এই শকুন মাত্র দুইবার দেখা গেছে বাংলাদেশে। এছাড়াও আছে কালো শকুন, এরাও বিরল। বছরে তিন থেকে পাঁচটি শকুন দেখা যায় প্রতি বছর। সবশেষে আছে সরুঠোঁটি শকুন, এটি মূলত সুন্দরবনে বাস করে। কিন্তু এরাও বিরল, কারণ পাঁচ বছরে একটি শকুনের দেখা মেলে।”

আইইউসিএন বলছে, পশু চিকিৎসায় বিশেষ করে গরুর চিকিৎসায় ডাইক্লোফেনাক ও কেটোপ্রোফেন জাতীয় ওষুধের বহুল ব্যবহারের ফলেই মূলত দক্ষিণ এশিয়া থেকে শকুন প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

শকুন গবেষক আলম বিবিসিকে বলেন, “ডাইক্লোফেনাক ও কেটোপ্রোফেন জাতীয় ওষুধ খাওয়া প্রাণীর মাংস খাওয়ার তিন মিনিটের মধ্যে কিডনি বিকল হয়ে শকুন মারা যায়। কারণ শকুনের এনজাইম নেই। এনজাইম হচ্ছে এক ধরণের প্রোটিন জাতীয় পদার্থ যা জীবদেহে অল্পমাত্রায় বিদ্যমান থেকে বিক্রিয়ার হারকে ত্বরান্বিত করে, কিন্তু বিক্রিয়ার পর নিজেরা অপরিবর্তিত থাকে।”

তিনি আরও বলেন, “এখন গবাদি পশু পালন এবং চিকিৎসা পদ্ধতিতে ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে গত কয়েক দশকে। ফলে আগের মত সংখ্যায় গরু বা বড় প্রাণী অসুখে মারা যায় না। ফলে শকুনের খাদ্য সংকট হচ্ছে। এছাড়া বড় উঁচু গাছপালা কমে যাওয়ায় নিরাপদ আবাসস্থলের ঘাটতি হচ্ছে শকুনের।”

আলম আরও বলেন, “শকুনের প্রজনন প্রক্রিয়াও জটিল, ফলে এদের বংশবৃদ্ধি হার অত্যন্ত ধীর। শকুন বছরে একটি ডিম পাড়ে এবং সেই ডিম ফুটে বাচ্চা হওয়ার ক্ষেত্রে সাফল্যের হার মাত্র ৪০%। ফলে এদের প্রজননের হার খুব ধীর।”

তবে আইইউসিএন বলছে, এখন হবিগঞ্জের রেমা কালেঙ্গায় শকুনের প্রজনন সফলতা বেড়েছে। ২০১৪ সালে এটা ছিল ৪৪%, ২০২০ সালে সেটি বেড়ে ৫৭%-এ দাঁড়িয়েছে।

এদিকে, বাংলাদেশে এখনো কোন শকুন প্রজনন কেন্দ্র নাই। গবেষকেরা বলছেন, শকুনের কৃত্রিম প্রজননের কথা বাংলাদেশে এখনো ভাবা হচ্ছে না। বাড়তি খাবার দিয়ে জঙ্গলে তাদের প্রজননে উৎসাহিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

About

Popular Links