Monday, May 27, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

অনিয়ম-দুর্নীতিতে রুগ্ন ফরিদপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল

দেশব্যাপী পর্দাকাণ্ডে সমালোচিত এই হাসপাতাল ঘিরে নানা সমালোচনা ও সংকট রয়েছে। অথচ এখানে মানসম্মত চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠায় সরকার শত শত কোটি টাকা ব্যয় করে চলেছে

আপডেট : ৩১ জানুয়ারি ২০২২, ০৮:০১ এএম

ফরিদপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (বিএসএমএমসি) স্থানীয় জনসাধারণের স্বাস্থ্যসেবায় হতে পারত এক আস্থার নাম। কিন্তু একদিকে এখানে যেমন প্রচুর রোগীর চাপ, অন্যদিকে চিকিৎসা নিতে আসা গ্রামের মানুষকে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিতে দালালদের দৌরাত্ম্য। এতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে রোগীদের। চরম অব্যবস্থাপনায় সুনাম হারাচ্ছে হাসপাতালটি।

একটি সংঘবদ্ধ চক্র হাসপাতালটিকে ঘিরে গড়ে তুলেছে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির আখড়া। হাসপাতাল পরিচালনায় কর্তৃপক্ষের রয়েছে দায়সাড়া উদাসীন ভাব।

জনবল সঙ্কট

৫১৭ বেডের হাসপাতালটিতে প্রয়োজনের তুলনায় এক তৃতীয়াংশ চিকিৎসকও নেই। নার্স, ওয়ার্ড বয়, ক্লিনার ও আয়াসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য পদও শূন্য।

হাসপাতালটিতে মাস্টার রোল কর্মচারীদের অসাধু কর্মকাণ্ড এবং দালালদের দৌরাত্ম্যের শিকার হচ্ছেন রোগীরা। ঝামেলা থেকে রেহাই পেতে সামর্থ্যবানরা ছুটছেন বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে। অথচ ওইসব হাসপাতালে এই সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরাই সময় করে রোগী দেখছেন। এ নিয়ে ভুক্তভোগীদের মাঝে রয়েছে চরম ক্ষোভ।

হাসপাতাল পরিচালকের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, এই হাসপাতালে চিকিৎসকদের জন্য বরাদ্দ প্রথম শ্রেণির ১৮৪টি পদ রয়েছে। যার মধ্যে ১১৯টিই শূন্য। কর্মরত ৬৫ চিকিৎসকের প্রায় সবাই বেসরকারি হাসপাতালে রোগী দেখেন।

মেডিকেল কলেজের ইন্টার্ন চিকিৎসক এবং নার্সরাই সময়-অসময়ে ভরসা বলে ভুক্তভোগী রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।

কর্মচারীদের দুর্ব্যবহার

হাসপাতালে নার্স, ওয়ার্ড বয়, আয়া ও ক্লিনারের পদ রয়েছে ৪২৫টি। যার মধ্যে ২৯টি শূন্য। এসব পদে শূন্যতা এবং কর্মরতরা নিয়মিত বেতন না পাওয়ায় রোগীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয় বলে কর্তৃপক্ষের দাবি।

সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের অন্তঃবিভাগে (ইনডোর) চিকিৎসা নিতে এলেই ভোগান্তিতে পড়তে হয় জনসাধারণকে। হাসপাতালটির দুটি ভবনে রয়েছে জরুরি বিভাগ। একটি ভবনের জরুরি বিভাগে গেলে রোগীদের অন্য ভবনে যেতে বলা হয়। সেখানে আবার পাওয়া যায় না কোনো সহায়তাকারী। ওয়ার্ড বয় এবং আয়ারা বিভিন্ন ওয়ার্ডে ব্যস্ত থাকেন। ফলে রোগীর স্বজনদেরই স্ট্রেচার বা হুইল চেয়ার যোগাড় করে রোগীকে ওয়ার্ডে নিতে হয়। টাকা না পেলে স্ট্রেচার ছুঁয়েও দেখেন না কর্মচারীরা।

পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা অকার্যকর

রোগীকে এক্সরে বা অন্য কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা অন্য কোনো কারণে বেড থেকে স্থানান্তরের কাজও করতে হয় স্বজনদেরই। যেসব রোগীর সঙ্গে কেউ থাকে না তাদের কাতরাতে দেখা যায় বিনা চিকিৎসায়। যদিও এসব রোগীর দুর্ভোগ লাঘবে ফরিদপুরে বেশ কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গড়ে উঠেছে। তবে অসুস্থ রোগীরা তাদের সঙ্গে সবসময় যোগাযোগ করতে পারেন না।

অফিস সময়ের পরে হাসপাতালের এক্স-রে, সিটি স্ক্যানসহ বিভিন্ন প্যাথলজি বিভাগ বন্ধ থাকে। ফলে দুপুরের পরে এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে হয় হাসপাতালের বাইরের বিভিন্ন প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে।

দিনের পর দিন এভাবেই চলছে এখানকার চিকিৎসা ব্যবস্থা।

এছাড়াও হাসপাতালের নতুন ভবনের প্রবেশমুখের পরিববেশ অপরিচ্ছন্ন ও দুর্গন্ধময়। লিফট বেশিরভাগ সময়েই বিকল থাকে।

সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম

এই হাসপাতালে গত এক বছরে বহির্বিভাগে এক লাখ ৬৭ হাজারেরও বেশি রোগী এবং অন্তঃবিভাগে প্রায় ৪৫ হাজার রোগী চিকিৎসা নিয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ রোগীর অধিকাংশ নিদারুণ অভিজ্ঞতার শিকার হন।
একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে হাসপাতালটি ঘিরে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে অনেক কর্মচারীর কর্মস্থল এটি। এসব পুরনো কর্মচারীর অনেকের বিরুদ্ধেই রয়েছে অনৈতিকতা ও দুর্নীতির অভিযোগ। পর্দাকাণ্ডের ঘটনায় অনেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে গেছে, হাসপাতালটিকে ঘিরে এক ধরনের নেতিবাচক মানসিকতা তৈরি করা হয় চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের মনে। বলা হয়, “হাসপাতালে ডাক্তার ভালোভাবে রোগী দেখবে না”, এসব বলে দালালরা রোগীদের নিয়ে যায় প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকে।

অস্বাস্থ্যকর টয়লেট

সুদৃশ্য ১১তলা নতুন ভবন চালুর পরপরই টয়লেটের প্রবেশমুখে বিভিন্ন ওয়ার্ডের বর্জ্যের স্তূপ রাখা শুরু হয়। দীর্ঘদিনে আবর্জনার স্তূপ ঠেলে টয়লেটে ঢোকাই যায়। ফলে সেগুলো অকেজো। চরম নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ সেখানে। বিভিন্ন ওয়ার্ডে টয়লেটের কোনোটিতে নেই দরজা, কোনোটি পানি জমে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। অনেকগুলো ইতোমধ্যে পরিত্যক্ত হয়ে গেছে।

রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, এসব পরিষ্কারের কথা বললে তাদের সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহার করা হয়। এমনকি চিকিৎসা সেবা পেতেও বাধার মুখে ফেলা হয়।

হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. মো. আসাদুল্লাহ বলেন, “এই হাসপাতালের ৭০ জন ক্লিনার গত সাত মাস বেতন পায় না। এ কারণে তাদের এসব কাজের ব্যাপারে আমরা বাধ্য করতে পারি না। কী কারণে তারা বেতন পাচ্ছেন না তা জানা যায়নি। হাসপাতালটিতে রোগীদের খাবার, মনিহারি ও কাপড় ধোলাইয়ের টেন্ডার হয় না।”

গত নভেম্বরে এ ব্যাপারে হাসপাতালের পরিচালক বলেছিলেন, নভেম্বরের মধ্যেই টেন্ডার করা হবে। তারা চিঠি দিয়েছেন। তবে তারপর দুই মাস চলে গেলেও অগ্রগতি হয়নি।

অযত্নে পড়ে আছে কোটি টাকার মেশিন

হাসপাতালে কোটি কোটি টাকায় কেনা মূল্যবান চিকিৎসা সরঞ্জাম পড়ে আছে অকেজো হয়ে। পরিচালক বলছেন, মামলা থাকায় সেগুলো মেরামত করা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না।

সংশ্লিষ্টরা জানান, হাসপাতালটিতে মেডিসিন, রেসপিরেটরি মেডিসিন, সাইকিয়াট্রি, গ্যাস্ট্রোএন্ট্রারোলজি, ডার্মাটোলজি, নিউরোলজি, কার্ডিওলজি, সিসিইউ, ইএনটি, চক্ষু, শিশু, গাইনি অ্যান্ড অবস, ক্যাজুয়ালিটি, অর্থো-সার্জারি, শিশু সার্জারি ইউরোলজি, নিউরোসার্জারি, বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি এবং নেফ্রোলজি ওয়ার্ডের ৫০০ বেড রয়েছে। তবে এসব ওয়ার্ডের অধিকাংশেরই চিকিৎসক নেই।

চিকিৎসকরা রোগী দেখেন বাইরে

ফরিদপুর শহরের আনাচে-কানাচে গজিয়ে উঠেছে অজস্র প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এগুলোর সামনে বিএসএমএমস হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ-পদবী ব্যবহার করে বড় বড় সাইনবোর্ড ঝুলতে দেখা যায়। এসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের রোগী ধরার বড় ফাঁদ এসব সাইনবোর্ডই।

অনেক রোগীর অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালে রোগীকে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারবেন না জানিয়ে অনেক চিকিৎসকই রোগীদের প্রাইভেট সেক্টরের হাসপাতালে যেতে পরামর্শ দেন। জানুয়ারি মাসেই হাসপাতালে আসা একজন অ্যাপেন্ডিসাইটিস রোগীকে বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ভুল চিকিৎসায় তার পায়খানার নালীই কেটে ফেলা হয়। অথচ ফরিদপুর মেডিকেলে রোগীদের সুবিধার্থে এক্সরে, আলট্রাসনোগ্রাম, সিটি স্ক্যান, এম আর আই, ইসিজি,প্যাথলজি, বায়োক্যামেস্ট্রি, ইউরিন এমসিআই, ব্রেস্ট ক্যান্সার স্ক্রিনিং, মেজর ও মাইনর সার্জারি পরীক্ষার সুবিধা রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন অজুহাতে এসব পরীক্ষার সুবিধা রোগীরা পান না। ফলে শহরের বেসরকারি ডায়গনস্টিক সেন্টারগুলোর ব্যবসা রমরমা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক মো. সাইফুর রহমান বলেন, “এই হাসপাতালে শুধু ফরিদপুরই নয়, এই অঞ্চলের রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসেন। যে কারণে রোগীদের প্রচণ্ড ভিড় থাকে। সেই অনুপাতে আমাদের জনবল নেই। এ সমস্যা নিরসনের জন্য বিভিন্ন সময়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছি। পর্যাপ্ত চিকিৎসক না থাকায় চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে।”

রোগীদের বেসরকারি হাসপাতালে চলে যাওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কেউ গেলে আমরা তাদের বাধা দিতে পারি না। এছাড়া চিকিৎসকেরা এখানে সময় দেওয়ার পরেই সেখানে প্রাইভেট রোগী দেখেন। তারা সেখানে রোগী দেখতে পারবেন না এমন কোনো বিধান নেই।”

হাসপাতালটির একের পর এক ঘটনায় সাধারণ মানুষ উদ্বিগ্ন। সম্প্রতি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে অবস্থিত একটি প্রাইভেট হাসপাতালে এক রোগীর মলদ্বারের নাড়ি কেটে ফেলা হয়। এসব ঘটনার শিকার রোগীদের জীবন এখন বিপন্ন।

হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসকের সঙ্গে আলাপকালে তারা সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তারা সবাই জানিয়েছেন, সরকার জনগণের চিকিৎসার স্বার্থে এখানে যেসব সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে তা এ অঞ্চলের অন্য কোনো হাসপাতালে নেই।

হাসপাতালটির দুটি ভবনে রয়েছে জরুরি বিভাগ। একটি ভবনের জরুরি বিভাগে গেলে রোগীদের অন্য ভবনে যেতে বলা হয়/ ঢাকা ট্রিবিউন

তারা জানান, এখানে পরমাণু চিকিৎসা কেন্দ্র ১৯৯৭ সালে চালু হওয়ার পর থেকে গত বছর পর্যন্ত প্রায় এক কোটি ৩০ লাখ টাকার বেশি রাজস্ব পেয়েছে সরকার। অন্যান্য বিভাগ ও ওয়ার্ডগুলোতেও মূল্যবান যন্ত্রাংশ রয়েছে। তবে এসব ব্যবস্থাপনায় রয়েছে চরম গাফিলতি। একটি চক্র এসবই অকেজো করে অবৈধ আয় করতে মুখিয়ে থাকে।

চলমান কোভিড সংকটে এই হাসপাতালের পুরাতন ভবনটিকে কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল করা হয়। এরপর স্থাপন করা হয় ব্যয়বহুল একটি অক্সিজেন প্ল্যান্ট। চালু করা হয় এই হাসপাতালের ১৬ বেডের সেই আলোচিত আইসিইউ ইউনিট। যেখানে ৩৭ লাখ টাকায় এক সেট পর্দা কেনার খবর সারাদেশে তোলপাড় তুলে।

দেশব্যাপী পর্দাকাণ্ডে সমালোচিত এই হাসপাতাল ঘিরে নানা সমালোচনা ও সংকট রয়েছে। অথচ এখানে মানসম্মত চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠায় সরকার শত শত কোটি টাকা ব্যয় করে চলেছে। এখানে একটি নিউক্লিয়ার মেডিসিন সেন্টার তথা পরমাণু চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। রয়েছে ২০ বেডের একটি ট্রমা সেন্টার। একটি ক্যানসার চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপনের কাজও শুরু হয়েছিল।

২৫০ বেডের ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চালু হয় ১৯৯৪ সালে। ২০১৭ সালে হাসপাতালটি নতুন বর্ধিত ভবনসহ ৫০০ বেড হাসপাতালে উন্নীত করা হয়। গত বছর এটিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নামে পরিবর্তন করা হয়।

About

Popular Links