Monday, May 20, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

ডায়াবেটিস-হৃদরোগ-ক্যান্সার প্রতিরোধী ‘চিয়া’ চাষ হচ্ছে দেশে

পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ও কৃষকদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তনে চিয়া ফল উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে কাশিয়ানী হর্টিকালচার সেন্টার

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০৬:৩৭ পিএম

আমাদের দেশে “চিয়া” নামের ফলটি খুব একটা পরিচিত নয়। উচ্চ ওষুধি গুণসম্পন্ন ও পুষ্টিসমৃদ্ধ এ ফলের ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও ক্যান্সার প্রতিরোধী ক্ষমতা রয়েছে। সে কারণেই দক্ষিণ আমেরিকান এ ফলের খ্যাতি বিশ্বব্যাপী। করোনাভাইরাসসহ বিভিন্ন জীবাণুর বিরুদ্ধে চিয়া শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। পাশাপাশি ত্বকের লাবণ্য ধরে রাখা, ওজন কমানো এবং শক্তি যোগাতে এটি সহায়ক।

তাই স্বাস্থ্য সচেতন যে কেউ এমন একটি খাবার খাদ্যতালিকায় রাখতে চাইবেন।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, চিয়া যেমন সাধারণ মানুষের পুষ্টির চাহিদা পূরণে সক্ষম, পাশাপাশি এটি চাষ করে কৃষকরাও লাভবান হতে পারেন। তাই দেশে চিয়ার চাষাবাদ ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী হর্টিকালচার সেন্টার।

বছরব্যাপী ফলনের জন্য পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় রবি মৌসুমে কাশিয়ানী হর্টিকালচার সেন্টারের তিনটি প্লটের ২০ শতক জমিতে চিয়া বীজ চাষাবাদ করা হয়েছে। এ মাসেই তিনটি প্লট থেকে ৪০ কেজি চিয়া বীজ সংগ্রহ করা হবে। এছাড়া, আগামী রবি মৌসুমে ২৫ বিঘা জমিতে চাষাবাদের জন্য গোপালগঞ্জের কৃষকদের হাতে চিয়া বীজ পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

কাশিয়ানী হর্টিকালচার সেন্টারের উপসহকারী উদ্যান কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম প্রধান ও মো. শহিদুল ইসলাম জানান, অক্টোবর-নভেম্বর মাসের দিকে উঁচু জমিতে চিয়ার চাষাবাদ করতে হয়। ফেব্রয়ারিতে ক্ষেত থেকে ফল সংগ্রহ করা যায়। ১১০ থেকে ১১৫ দিনের মধ্যেই স্বল্পমেয়াদী চিয়ার ফলন পাওয়া সম্ভব। জীবনকালে চিয়া গাছে মাত্র তিনবার সেচ দিতে হয়। মাঝেমাঝে আগাছা পরিষ্কার করেতে হয়। এ ফসলে কোনো ধরনের পোকার আক্রমণ হয় না।

তারা আরও জানান, মাত্র সাত হাজার টাকা খরচে ১ বিঘা জমিতে সার, সেচ, বীজ ও পরিচর্যাসহ চিয়ার চাষাবাদ সম্ভব। প্রতি বিঘা জমিতে ১০০-১১০ কেজি ফলন আসে। প্রতি কেজি চিয়া কমপক্ষে ৫০০ টাকায় বিক্রি সম্ভব। ফলে উৎপাদন খরচ ছাড়া কৃষকরা বিঘাপ্রতি অন্তত ৪৩ হাজার টাকা লাভ করতে পারবেন।

হর্টিকালচার সেন্টারের কর্মকর্তারা আরও বলেন, “আমরা কৃষকদের চিয়া চাষে উদ্বুদ্ধ করছি। আগামী রবি মৌসুমে আমরা কৃষকের মাঠে চিয়া চাষ ছড়িয়ে দেবো।”

কাশিয়ানী হর্টিকালচার সেন্টারের উদ্যান তত্ত্ববিদ মো. রাকিবুল হাসান বলেন, “চিয়া সাধারণ মানুষের পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। পুষ্টির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধক হিসেবে অসাধারণ ওষুধি গুণসম্পন্ন চিয়া মানুষের জীবনরক্ষা করবে। এ ফসল কৃষকের আয় অন্তত সাতগুণ বাড়িয়ে দেবে। বেকার তরুণরা চিয়ার চাষ করে বেকারত্ব ঘোচাতে পারবেন।”

কাশিয়ানী হর্টিকালচার সেন্টারের উপ-পরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, “স্যালমন মাছের তুলনায় চিয়ায় ৮ গুণ বেশি ওমেগা থ্রি ও ফ্যাটি এসিড রয়েছে। টিয়ায় ব্রকলির চেয়ে ৭ গুণ বেশি ম্যাগনেশিয়াম বিদ্যমান। দুধের চেয়ে এতে ৫ গুণ বেশি ক্যালশিয়াম ও ৪০% ফাইবার রয়েছে। তাছাড়া, কলার চেয়ে দ্বিগুণ বেশি পটাশিয়াম ও পালং শাকের তুলনায় ৩ গুণ বেশি আয়রন আছে এ ফলে।”

তিনি আরও বলেন, “চিয়ায় রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণ এন্টি অক্সিডেন্ট, যা শরীরের ক্ষতিকারক কোলেস্টোরেল এলডিএল কমিয়ে উপকারি কোলেস্টোরেল এইচডিএল বাড়ায়। একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ প্রতিদিন মাত্র ৩০ গ্রাম চিয়া খেয়ে সুস্থতা নিশ্চিত করতে পারেন। শিশুরা বয়স ভেদে ৫-১০ গ্রাম চিয়া খেতে পারে। চা, কফি, দুধ বা বিভিন্ন খাবারের সঙ্গে চিয়া খাওয়া যায়।”

এ কর্মকর্তা বলেন, “আমাদের দেশে প্রচুর ধান উৎপাদন হয়। এর মাধ্যমে আমাদের ক্ষুধা দূর হয়েছে। এখন সুস্থ সবল জাতি গড়তে পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। চিয়া সে লক্ষ্য পূরণ করে কৃষকের আয় বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।”

কাশিয়ানী উপজেলার রাতইল গ্রামের কৃষক মো. কামরুল ইসলাম বলেন, “চিয়ার চাষাবাদ খুবই সহজ। রবি মৌসুমে প্রচলিত যেকোনো ফসলের চেয়ে চিয়া উৎপাদন করে খুব লাভবান হওয়া যায়। তাই আগামী বছর আমি ৫ বিঘা জমিতে চিয়ার চাষ করব।”

কাশিয়ানী উপজেলার বরাশুর গ্রামের কৃষক গোলাম কিবরিয়া বলেন, “হর্টিকালচার সেন্টারে চিয়ার ভাল ফলন হয়েছে। সেখানের কৃষি বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে নতুন ও উচ্চ মূল্যের চিয়া ফসল সম্পর্কে শুনেছি। আগামীতে আমি মানবদেহের জন্য উপকারী এ ফসলের চাষ করব।”

একই উপজেলার ঘোনাপাড়া গ্রামের কৃষক সুমন হোসেন বলেন, “ক্যান্সার প্রতিরোধী ও পুষ্টিসমৃদ্ধ চিয়ার চাষ করে মানুষের জীবন রক্ষা করা যাবে। সেই সঙ্গে পাওয়া যাবে অর্থও। এটি আমাদের ভাগ্যেরও পরিবর্তন ঘটাবে। তাই আগামীতে আমি চিয়া চাষ করব। সেই সঙ্গে প্রতিবেশীকেও চিয়া চাষে উদ্বুদ্ধ করব।”

About

Popular Links