Friday, May 24, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

ঘুষের টাকা বৈধ করতে নির্বাচন কর্মকর্তার ঠুনকো অজুহাত

ঘুষের টাকা জব্দ হওয়ার ভয়ে ৬ ফেব্রুয়ারি ব্যাংকে গচ্ছিত ২৪ লাখ টাকার মধ্যে থেকে ২০ লাখ টাকা তার স্ত্রী ফেরদৌসি বেগমের ব্যাংক হিসাবে ট্রান্সফার করে দেন

আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০৯:৫৪ পিএম

ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলা নির্বাচন অফিসার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠে। সদ্য শেষ হওয়া ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন ঘিরে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিলের ভয় দেখিয়ে এবং জাতীয় পরিচয়পত্র করাসহ বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে প্রার্থীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছেন বলে প্রার্থীদের অভিযোগ।

এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে গঠন করা হয় দুই সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি। তদন্ত কর্মকর্তারা হলেন, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সহকারী সচিব (সংস্থাপন-১) মো. জিলহাজ উদ্দিন ও জেলা নির্বাচন অফিসার মো. হাবিবুর রহমান।

এদিকে মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম তার ব্যাংক হিসাবে গচ্ছিত ঘুষের প্রায় ২৪ লাখ টাকা বৈধ বলে চালিয়ে দিতে ঠুনকো অজুহাত দাঁড় করিয়েছেন।

তদন্ত কর্মকর্তারা উপজেলা নির্বাচন অফিসারের ব্যাংক হিসাব তলব করে সোনালী ব্যাংক শাখায় তার অ্যাকাউন্টে প্রায় ২৪ লাখ টাকা পেয়েছেন। টাকার উৎস জানতে চেয়ে চিঠি দিলে ২৪ লাখ টাকাই তার পারিবারিক লেনদেনের অর্থ বলে জানান নির্বাচন অফিসার।

এমনকি ঘুষের টাকা জব্দ হওয়ার ভয়ে ৬ ফেব্রুয়ারি ব্যাংকে গচ্ছিত ২৪ লাখ টাকার মধ্যে থেকে ২০ লাখ টাকা তার স্ত্রী ফেরদৌসি বেগমের ব্যাংক হিসাবে ট্রান্সফার করে দেন।

অফিসারের বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়েছে, ২৮ নভেম্বর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে বিভিন্ন প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিল করার ভয় দেখিয়ে মোটা অংকের টাকা উৎকোচ গ্রহণ করতে থাকেন সাইফুল ইসলাম। নির্বাচন শেষ হওয়ার পর গাজীরটেক ইউনিয়নের নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থী আহসানুল হক মামুন এবং একই ইউপির এক নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য প্রার্থী আব্দুর রউফ উপজেলা নির্বাচন অফিসারের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেন।

পরে তদন্ত কমিটি গঠন হওয়ার পর নির্বাচন অফিসার সাইফুল ইসলাম সোনালী ব্যাংক শাখায় তার জমা করা ঘুষের কালো টাকা সাদা করতে মরিয়া হয়ে ওঠেন।

ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, সোনালী ব্যাংক শাখায় উপজেলা নির্বাচন অফিসার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের একটি ব্যাংক হিসাব রয়েছে। সেই অ্যাকাউন্টে ২০২১ সালের অক্টোবর মাসের শেষের দিক থেকে ২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন দফায় প্রায় ২৪ লাখ টাকা জমা করা হয়।

উপজেলার ইউপি নির্বাচন চলাকালীন সময়ে দেড় লাখ, দুই লাখ বা এক লাখ টাকা করে উক্ত হিসাবে অর্থ জমা রাখা হয়। এছাড়াও নির্বাচনকালীন সময়ে এক লাখ বা আশি হাজারের মত ঘুষের টাকাগুলো নির্বাচন অফিসের কর্মচারী দিয়ে ব্যাংক হিসাবে জমা করেছেন এবং দুই লাখ বা আড়াই লাখের মত বড় অংকগুলো তিনি নিজেই জমা দিয়েছেন বলে গেছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাচন অফিসার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমার শ্বশুর আমার কাছ থেকে টাকা ধার নিয়েছিলেন। সেই পাওনা টাকা আমাকে ফেরত দিলে উক্ত টাকা আমি ব্যাংকে জমা কারার পর আবার আমার স্ত্রীর হিসাবে ট্রান্সফার করেছি। আর এর প্রতিবেদন ব্যাংকে জমা দিয়েছি। আমি কোনো ঘুষ গ্রহণ করিনি।”

তিনি আরও বলেন, “আমার ব্যাংক হিসাবের খবর সাংবাদিকরা কিভাবে জানলেন? আমি ব্যাংকের বিরুদ্ধে ইলিগেশন দিবো।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যাংকের এক ক্যাশ অফিসার ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “এখন ব্যাংক হিসাবগুলো অনলাইন। তাই কোনো তথ্য গোপন রাখার সুযোগ নেই, বাংলাদেশের যে কোনো সোনালী ব্যাংক শাখায় গিয়ে অনলাইন হিসাব নাম্বার সার্চ দিলেই সব তথ্য পাওয়া যায়।”

অভিযোগ উঠেছে, তদন্ত কর্মকর্তারা নির্বাচন অফিসারের ব্যাংক হিসাব তলব করার পর ৬ ফেব্রুয়ারি ব্যাংকে গচ্ছিত ঘুষের ২৪ লাখ টাকা স্ত্রীর অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করেন তিনি। তার স্ত্রী হলেন মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর উপজেলার নির্বাচন অফিসার ফেরদৌসি বেগম।

গাজীরটেক ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে অংশগ্রহণকারী আহসানুল হক মামুন জানান, নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে মনোনয়ন পত্র দাখিলের পরও নির্বাচন অফিসার বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে, প্রার্থিতা বাতিল করার ভয় দেখিয়ে তার কাছ থেকে প্রথম দফায় নগদ পৌনে দুই লাখ টাকা এবং পরে আরও দুই দফায় নগদ ৫০ হাজার টাকাসহ মোট সোয়া দুই লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছেন।

তিনি বলেন, “ঐ কর্মকর্তা মিথ্যাচার করছেন। উনার শ্বশুর টাকা ধার নিয়ে নির্বাচনের সময়ই ফেরত দিল! এই বক্তব্য একেবারেই ভিত্তিহীন। আর ঐ কর্মকর্তা যদি টাকা ধার দিয়েই থাকেন তাহলে সেটা তো তার নিজের টাকা, সেটা কেন তার স্ত্রীর একাউন্টে রাখবেন।”

গাজিরটেক ইউনিয়নের এক নম্বর ওয়ার্ড সদস্য পদে নির্বাচনে অংশ নেওয়া আব্দুর রউফ জানান, মনোনয়নপত্র দাখিলের দিন সব কাগজপত্র চেক করে সবকিছু ঠিক আছে বলে জানিয়ে দেন নির্বাচন অফিসার। জমা দেওয়ার দুদিন পর তিনি মুঠোফোনে অফিসে ডেকে নিয়ে যান। তারপর মনোনয়নপত্রের কোনো এক জায়গায় স্বাক্ষর না থাকায় প্রার্থিতা বাতিল হয়ে যাবে বলে হুমকি দিয়ে দুই দফায় নগদ মোট ২৫ হাজার টাকা ঘুষ নেন। তার বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলায় হওয়ায় অনেক বড় ক্যাডার বাহিনী তার হাতে থাকে বলেও তিনি হুমকি দেন।

নির্বাচন কর্মকর্তার স্ত্রী ফেরদৌসি বেগমের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো কথা বলবেন না বলে ফোন কেটে দেন।

জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান এ বিষয়ে জানান, চরভদ্রাসন উপজেলার নির্বাচন অফিসার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগের তদন্ত চলছে। তার ব্যাংক হিসাব তলব করা তারই অংশ। আর তার অভিযোগটি তদন্তাধীন এজন্য আর কিছু জানাতে পারছি না।

গত বছরের ২৮ নভেম্বর অত্র উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শেষে বিজয়ী চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা গেজেটভুক্ত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন দপ্তরে উক্ত নির্বাচন অফিসারের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের লিখিত অভিযোগ করেন। চরভদ্রাসন উপজেলার গাজীরটেক ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থী আহসানুল হক মামুন ও একই ইউনিয়নের এক নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আব্দুর রউফ গত ৩০ ডিসেম্বর প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে এ লিখিত অভিযোগ পেশ করেন।

About

Popular Links