Monday, May 20, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

পথের কুকুর-বিড়ালদের সেবায় সুধা রানী

স্বল্প আয়ের মানুষ হলেও নিজের সাধ্যমতো পথের প্রাণীদের যত্ন নেন তিনি 

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২২, ০৪:১৫ পিএম

আমাদের সমাজে চারপাশে শখের বশে বাড়িতে কিংবা খামারে রেখে কুকুর-বিড়াল পোষা অথব সুযোগ পেলেই মুক্তভাবে ঘুরে বেড়ানো কুকুর-বিড়ালের মুখে কিছু খাবার তুলে দেওয়া কিছু ব্যক্তি অহরহই দেখা যায়। আবার অভিভাবকহীন কুকুর-বিড়াল দেখলে আঘাত করে তাড়িয়ে দেওয়া ব্যক্তির সংখ্যাও নেহাত কম না।

তবে এক্ষেত্রে রাজশাহী সাধারণ গ্রন্থাগারের পরিচ্ছন্নতা কর্মী সুধা রানী উজ্বল ব্যতিক্রম। সমাজের একজন সুবিধাবঞ্চিত এবং নিম্ন আয়ের কর্মজীবী মানুষ হয়েও দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে পথপ্রাণিদের সেবা করে আসছেন তিনি।

প্রাণিদের প্রতি সুধা রানীর ভালোবাসার কারণ

রাজশাহীর তানোর উপজেলার তালন্দো এলাকায় ৫৮ বছর বয়সী সুধা রানীর শৈশব কেটেছে। জন্মের এক বছরের মাথায় মা মারা যান। এরপর সৎ মায়ের কাছে অনেক নির্যাতনের মধ্য দিয়ে তিনি বেড়ে উঠেছেন। যে বয়সে তার বই-খাতা নিয়ে স্কুলে যাওয়া আর শৈশবের খেলাধুলায় মেতে থাকার কথা, তখন সৎ মায়ের নির্দেশে প্রতিদিন সুধা রানীকে রাখাল সেজে পরিবারের গরু-ছাগলকে ঘাস খাওয়াতে নিয়ে যেতে হতো।

এরই মধ্যে সুধা রানী একদিন ফাঁকা বিলের মধ্যে গরু-ছাগল নিয়ে মহাবিপদে পড়ে যান। আকাশে জমেছে কালো মেঘ, সেই সঙ্গে চলছে বজ্র-বৃষ্টি। বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কোন কূল-কিনারা খুঁজে না পেয়ে এক সময় দাঁড়িয়ে থাকা গরুর পেটের নিচে বসে পড়লেন। একসময় মেঘ সরে গিয়ে বজ্র-বৃষ্টি থেমে বিপদ কেটে যায়। এরপর থেকেই প্রাণিদের প্রতি সুধা রানী মায়া-ভালোবাসা আরও গভীর হলো।

ভাগ্যের ফেরে গ্রাম থেকে শহরে এসে সংসার শুরু

শৈশব পেরিয়ে যৌবনে পা দেওয়ার পরপরই স্বামী সুনীলকে নিয়ে রাজশাহী নগরীর মুন্সিডাঙ্গা এলাকায় সংসার শুরু করেন সুধা রানী। গৃহিনী হিসেবে বাড়িতেই থাকতেন। আর স্বামী অলোকার মোড়ে সিনেমা হলের সামনে বাদাম বিক্রি করতেন। দরিদ্র পরিবারে খেয়ে-না খেয়ে স্বামী, দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে সংসার ভালোই চলছিল। কিন্তু স্বামী একসময় মাদকাসক্ত হয়ে পড়লে তার মৃত্যুর আগেই সুধা রানী তাকে ত্যাগ করে ছেলেমেয়েদের নিয়ে আলাদা সংসার শুরু করতে থাকেন। এরমধ্যে জীবিকার সন্ধানে বাড়ির চার দেয়াল থেকে বের হয়ে নগরীর ঐতিহ্যবাহী রাজশাহী সাধারণ গ্রন্থাগারের নিম্ন পদের একটি চাকরিও জুটে গেল।

প্রতিদিন বাড়ি থেকে গ্রন্থাগারের যাওয়ার পথে অভুক্ত পাঁয়চারি কুকুর-বিড়াল তার নজরে আসে। তাদের দিকে যখন অন্যদের তেমন কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই, তখন সুধা রানী নিজের টাকা খরচ করে বিস্কুট কিনে তাদের মুখের সামনে তুলে ধরতে লাগলেন। খাবার পেয়ে তারাও সুধা রানীকে আপন ভাবতে শুরু করলো। এভাবে পথের কুকুর-বিড়ালগুলোর সঙ্গে তার সখ্যতা গড়ে উঠে।

সুধা রানীর গ্রস্থাগারে যাওয়ার পথে রাস্তার কুকুর-বিড়ালগুলো তার পিছুপিছু আসে। তবে গ্রন্থাগারে তার বড় কর্তা বিষয়টি খুব ভালোভাবে না নেওয়ায় তিনি দোকান থেকে বিস্কুট কিনে খাওয়ানোর পর তাদের বিদায় করে দেন।

যেভাবে প্রাণীদের জন্য খাবার সংগ্রহ করা হয়

সুধা রানীর ছেলে রাজশাহী নগরীতে রিকশা চালায়। সুধা রানী নিজে রাজশাহী সাধারণ গ্রন্থাগার থেকে মাসে তিন হাজার টাকা আয় করেন। মানসিকভাবে অসুস্থ এক মেয়েসহ দুই মেয়েকে নিয়ে নগরীর মুন্সিডাঙ্গায় ভাড়া বাসায় থাকেন। তবে ঘর ভাড়ার পেছনে তার দুই হাজার টাকা চলে যায়। বাকিটা দিয়ে সংসার এবং পথের প্রাণীদের খাবারের খরচ চালিয়ে নেন।

পর্দার আড়ালে থাকা এই নারীকে এখন পর্যন্ত কেউ বড় ধরনের আর্থিক সহযোগিতা করেনি। কুকুর-বিড়ালের খাবারের জন্য কোনো ব্যক্তির কাছে ১০ টাকা চাইলে তাকে ধমক দিয়ে বিদায় করে দেওয়া হয়েছে। আবার তার বাসায় পালিত কুকুর-বিড়াল প্রতিবেশী কারো খাবার খেলেও জরিমানা দিতে হয়েছে। সঙ্গে অনেক কটু কথাও শুনতে হয়েছে। তাই ভয়ে কাউকে কিছু বলতেও সাহস পান না। এজন্য নিজে কিছু কিনে খাবেন বলে অনেক সময় ১০-২০ টাকা চেয়ে নিতেন। এরপর দোকান থেকে বিস্কুট-পাউরুটি কিনে নিজে না খেয়ে পথের প্রাণীদের খাওয়াতেন। আবার নিজে কষ্ট করে বাড়ির আশেপাশের ছাত্রাবাসের বেঁচে যাওয়া কিংবা ছাত্রদের এঁটো খাবার সুন্দরভাবে পরিস্কার করে পথের প্রাণীদের মুখে তুলে দেন।

আবার যেখানে তিনি চাকরি করেন, সেখানের ছোট-খাটো অনুষ্ঠানে বেঁচে যাওয়া খাবার নিজের ও সন্তানের জন্য না নিয়ে পথে থাকা প্রাণীগুলোকে খাওয়ানোর পর বাসায় ফিরেন। শুধু তাই না, তার ভাড়া বাসায় থাকা পাঁচটি বিড়ালকেও ভাত-মাছ খাওয়াতে হয়। রাতের অন্ধকার কেটে গেলে ঘুমন্ত সুধা রানীকে বিড়ালগুলো উঠায়। তাই খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে ঘর-বারান্দা পরিস্কার করে নিজেদের আগে বিড়ালগুলোর খাবার দেন তিনি। বিড়ালগুলোর সকালের খাবার হিসেবে থাকে কয়েকটি রেস্তোরাঁর হাড়। সুধা রানীর মেয়ে বুলবুলি রানী সরকার সেগুলো সংগ্রহ করে নিয়ে আসেন।

তবে করোনাভাইরাস মহামারিকালে রেস্তোরাঁ বন্ধ থাকায় তাদের কিছুটা বিপাকে পড়তে হয়। রেস্তোরার খাবার না মিললে সুধা রানী নিজের বাসার মাছ মাংসও বিড়ালদের মুখে তুলে দেন। আবার অনেক কুকুর তার বাসার গেটের সামনে এসে বসে থাকে। মায়া লাগায় তাদেরকেও খাবার দিয়ে বিদায় করেন তিনি।

স্বীকৃতির আশায় ভালোবাসেননি তিনি

পুরস্কার বা স্বীকৃতির কথা মাথায় নিয়ে সুধা রানী কখনও এসব কাজ করেনি। তবে তার প্রাণিদের প্রতি ভালোবাসার জন্য কাজটা চালিয়ে যাওয়ার জন্য তার অর্থাভাব রয়েছে। যেখানে অনেকে শখের বশে বাড়ি কিংবা খামার করে কুকুর-বিড়ালদের সঠিক পরিচর্যা করার জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করেন, সেখানে সুধা রানী সামান্য আয়ে পশুপ্রেমের পিছপা হন না। যদিও এজন্য তার সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। অর্থাভাবে তার পক্ষে পথের কুকুরদের পছন্দনীয় মাংস আর বিড়ালদের পছন্দের মাছের ব্যবস্থা করা কষ্টসাধ্য। তাই ইচ্ছে থাকার পরও তাদের মুখে সবসময় সেগুলো তুলে দিতে পারেন না। এজন্য কেউ সহযোগিতা করলে তিনি তা সানন্দে নেবেন।

কুকুর-বিড়ালদের চিকিৎসা ও নামকরণ

অনেক ব্যক্তি বিভিন্ন সময় পথের কুকুরদের তাড়া করে পা ভেঙে দেন। আবার নিজেদের মধ্যে মারমারি করে আঘাত পেয়ে কখনও কখনও প্রাণীদের মারাত্মক ক্ষত তৈরি হয়। তখন বাড়ি থেকে তেল-হলুদসহ ঘরোয়া পদ্ধতিতে কিংবা বাজার থেকে মলম কিনে এনে সুধা রানী তাদের সুস্থ করে তোলেন।

এছাড়া, কুকুর-বিড়ালের আকার-আকৃতি অনুযায়ী তাদের বিভিন্ন নামও রেখেছেন। যেমন, গায়ের রং কালো তাই একটি কুকুরকে কালু, আবার কোনোটার নাম- মিনি, ফালি, লালু, ল্যাংড়া, মুন ফুলটসি, সোনা, মোনা ইত্যাদি। সুধা রানী এসব নামে ডাকলে এ প্রাণীগুলো তার ভাষা বুঝে।

নিজের ও পথপ্রাণীদের নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

নিজের কোনো জায়গা-জমি না থাকায় অন্যের বাসায় ভাড়া থাকেন। তাই অনেক গরীব মানুষকে যেভাবে আশ্রয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে সরকার ঘর-বাড়ি করে দিচ্ছে, তাকেও যদি সেভাবে সাহায্য করা হয় তাহলে বাসাভাড়াটা বেঁচে যেতো। আবার কুকুর-বিড়ালগুলোর বাড়িতে থাকার ব্যবস্থাও করতে পারতেন। তবে শহর থেকে তার গ্রামের দিকে যাওয়ার ইচ্ছে নেই। কারণ নিজে যেমন শহরে চাকরি করেন, তামনি সেখানে বেশি পথপ্রাণীও থাকে। তাই তাকে সাহায্য করতে শহর থেকে কোনো হৃদয়বান পশুপ্রেমী ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসলে তা তিনি সাদরে গ্রহণ করবেন।

স্বীকৃতি

তার এই মানবিক সেবার কারণে সুধা রানীকে গত বছরের ২০ নভেম্বর ঢাকার জাতীয় জাদুঘরের মিলনাতনে প্রাণবিক বন্ধু পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে।

অন্যরা সুধা রানীর এ প্রাণবিক কার্যক্রমকে যেভাবে দেখছে

সুধা রানীর ছোট মেয়ে বুলবুলি রানী সরকার জানান, মায়ের কুকুর-বিড়াল প্রেমের কারণে মানুষের কাছে অনেক কটু কথা শুনতে হয় তাদের। তবে পশুর প্রতি তাদের পুরো পরিবারের অন্য রকম এক মায়া তৈরি হয়ে গেছে। মায়ের পাশাপাশি নিজেও বাসাবাড়িতে কাজ করে সেখানকার উচ্ছিষ্ট খাবার পশুদের জন্য নিয়ে আসেন। মাঝে মাঝে এসব বিড়াল বা কুকুরগুলো তাদের প্রতিবেশীদের বাসায় গিয়ে পায়খানা সেরে ফেলে। যেটা খুবই বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে। অনেক কটু কথা শুনতে হয়। তার মা ও বড় বোন অনেক সময় এসব পশুদের পায়খানা পরিষ্কার করে দিয়েছেন। আবার একবার ক্ষোভের বর্শবর্তী হয়ে কিছু বিড়াল শহরের বাইরে রেখে আসলেও তার মা এ কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তবে এর কিছুদিন পর থেকে আবারও নতুন নতুন পশুদের সঙ্গে সখ্যতা হয়ে যায়।

রাজশাহী সাধারণ গ্রন্থাগারের অফিস সহকারী রুহুল আলম খান ওরফে শাহিন বলেন, “সুধা রানী দিদি গরীব হলেও প্রাণীদের প্রতি তার যে ভালোবাসা, সেটা সহকর্মী হিসেবে সবসময় স্বাগত জানাই। তাকে যতটুকু পারি সহযোগিতা করি। তবে এক্ষেত্রে যদি কোনো হৃদয়বান ব্যক্তি বা সরকার সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দেন, তবে এমন পশুপ্রেমী সুধা রানীরা অনুপ্রাণিত হবেন।” 

রাজশাহীতে বিভিন্ন সময় পশুদের নিয়ে কাজ করা গণমাধ্যম কর্মী মাহাবুল ইসলাম বলেন, “বর্তমান সমাজে সুধা রানীর মতো পশুপ্রেমী মানুষের খুবই অভাব। বিশেষ করে এমন নিম্ন আয়ের মানুষ হয়েও নিজের খাবার পশুদের মুখে তুলে দেওয়ার যে উদাহরণ তিনি সৃষ্টি করেছেন, তা প্রশংসা ও সহানুভূতি পাওয়ার দাবি রাখে। পথপশুর প্রতি তার যে মমত্ব ও ভালোবাসা সেটিকে অবশ্যই সম্মান জানাতে হবে। যেসব মানুষ তাকে কটু কথা শোনায় তাদেরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোতে অনেক সময় খাবার নষ্ট হয়। সেগুলো যদি একটু যত্ন করে এসব পশুদের মুখে তুলে দেওয়া যায় তবে একদিকে যেনন পরিবেশ দূষণ কমবে, অন্যদিকে পশুরাও খেয়ে বেঁচে থাকবে।”

পশুপ্রেমি রাকিবুল হক ইমিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সুধা রানীর প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “কিছু মানুষকে এ সমাজ সম্মাননা জানাতে পারলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগ হয়। কিছু মানুষ কোনদিন পুরস্কারের কথা মাথায় নিয়ে কাজ করেন না। তাদের জন্য বড় প্রাপ্তি হলো তার কাজটা চালিয়ে যাবার সক্ষমতা। এমনিই একজন প্রাণবিক সুধা রানী। মানুষটি যতদিন বাঁচবেন, ততদিন যেন তার এই পথপ্রাণীদের নিয়ে চিন্তা করতে না হয়, অন্তত তার জন্য একটা টেকসই সমাধান চাই। রাজশাহীর অবস্থাসম্পন্ন যে কেউ অন্তত প্রতি মাসে তার পথপ্রাণীদের জন্য খাবারের যোগানটুকু দিলে এটাই তার জন্য বড় উপকার হয়। নিজের জন্য তিনি কিছু চাননি। দায়িত্ব নিয়ে কেউ কিছু করতে পারলে আমাদের জানান। অথবা সরাসরি সুধা রানীর সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। তবে অনুরোধ করবো উনার হয়ে অন্য কাউকে অর্থ সাহায্য দিবেন না। আমরা সব সময় চেষ্টা করি সরাসরি যার সমস্যা তাকে সাহায্য করতে। প্রাণবিক বন্ধুদের জন্যই আমাদের পৃথিবী টিকে রয়েছে। সালাম তাদের প্রতি।”

About

Popular Links