Wednesday, May 22, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

মিরপুর চিড়িয়াখানা হবে আধুনিক সাফারি পার্ক!

মিরপুরে অবস্থিত জাতীয় চিড়িয়াখানাকে একটি আধুনিক সাফারি পার্কে পরিণত করার জন্য বড় ধরনের সংস্কারের পরিকল্পনা করছে

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২২, ১২:৩৩ পিএম

কল্পনা করুন একটি খাঁচা ছাড়া চিড়িয়াখানা। যেখানে রয়েল বেঙ্গল টাইগাররা রাজকীয় ভঙ্গিতে বনের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে, বানররা খাঁচার বদলে তাদের জন্য তৈরি প্রাকৃতিক আবাসস্থলে এক গাছ থেকে আরেক গাছে দোল খাচ্ছে। আর এই দৃশ্যগুলোবাস্তবেই কোনো “ভাসমান প্ল্যাটফর্ম” বা ট্রামের মধ্যে বসে বন্যপ্রাণীদের নাগালের বাইরে থেকে উপভোগ করছেন। তাহলে কেমন হতো?

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই দৃশ্য কিছুটা অবাস্তব মনে হলেও সত্যিই এই কল্পনা বাস্তবে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার রাজধানী ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত জাতীয় চিড়িয়াখানাকে একটি আধুনিক সাফারি পার্কে পরিণত করার জন্য বড় ধরনের সংস্কারের পরিকল্পনা করছে।

নতুন এই ডিজাইনের অধীনে, চিড়িয়াখানাটিকে কয়েকটি জোনে বিভক্ত করা হবে যেখানে প্রাণীরা অবাধে বিচরণ করতে পারবে এবং দর্শকরা নিরাপদ দূরত্ব থেকে তাদের দেখতে পারবে।

প্রাণীদের নিরাপদে দেখার জন্য, দর্শনার্থীদের জন্য নৌকা, ভাসমান পন্টুন, ট্রাম এবং অন্যান্য যানবাহনের ব্যবস্থা থাকবে।

পরিকল্পিত অঞ্চলগুলোর মধ্যে রয়েছে- বাংলাদেশের আবাসস্থল, আফ্রিকান বাসস্থান, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আবাসস্থল, নিশাচর প্রাণীদের বাসস্থান, কৃত্রিম জলাভূমি এবং একটি নার্সারি।

ইনফোগ্রাফ ঢাকা ট্রিবিউন

মিরপুর চিড়িয়াখানার চেয়ে আকারে ছোট রংপুর চিড়িয়াখানাতেও একই ধরনের সংস্করণ করা হবে।

ইতোমধ্যে বিশ্বখ্যাত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বার্নার্ড হ্যারিসন অ্যান্ড ফ্রেন্ডস লিমিটেড চিড়িয়াখানা দুটির মাস্টারপ্ল্যান প্রায় শেষ করেছে। এ প্রকল্পে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ব্যয় হবে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

“ঢাকা চিড়িয়াখানার সংস্কার তিন ধাপে করা হবে। আমরা সংস্কারের জন্য চিড়িয়াখানাটি বন্ধ করব না তবে কাজের জন্য প্রাণীদের এক অংশ থেকে অন্য অংশে স্থানান্তর করব,” জাতীয় চিড়িয়াখানার পরিচালক আবদুল লতিফ ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন।

পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার পর প্রকল্পটি আগামী অর্থবছরে অর্থায়নের জন্য একনেকের সামনে উপস্থাপন করা হবে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী এস এম রেজাউল করিম বলেন, “বিভিন্ন অঞ্চল, অবকাঠামো নির্মাণ পরিকল্পনা এবং অন্যান্য বিষয় নির্ধারণের জন্য চিড়িয়াখানা দুটি প্রয়োজন অনুসারে পুনর্গঠন করা হবে। মহাপরিকল্পনায় প্রাকৃতিক পরিবেশ অক্ষুণ্ন রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।” 

কেমন হবে মিরপুর চিড়িয়াখানা?

পরিকল্পনা অনুযায়ী, মিরপুর চিড়িয়াখানার তিনটি প্রধান অঞ্চল বিদ্যমান বনের ওপর ভিত্তি করে নির্মাণ করা হবে। বাংলাদেশের আবাসস্থল সুন্দরবনের ওপর ভিত্তি করে, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আবাসস্থল সাল বনের আদলে এবং আফ্রিকান আবাসস্থল ওকাভাঙ্গো ডেল্টা জলাভূমির ওপর ভিত্তি করে নির্মাণ করা হবে।

চিড়িয়াখানার উত্তর লেকের তীরে ভাসমান পন্টুন বোর্ডওয়াক দিয়ে সারিবদ্ধ করা হবে, প্রাণীদের দেখার জন্য একটি বৃত্তাকার হাঁটা পথ তৈরি করা হবে। অঞ্চলটিকে একটি লেক সাফারি হিসেবে ধারণা করা হয়েছে, যেখানে ঐতিহ্যবাহী নৌকায় চড়ে সুন্দরবনে ঘোরার অনুভূতি পাওয়া যাবে। ১৮ হেক্টর অঞ্চলে ২১টি প্রাণীর ঘের থাকবে যেখানে ১০২ প্রজাতির মাছ, সরীসৃপ, পাখি এবং স্তন্যপায়ী প্রাণী থাকবে।

এছাড়া, আফ্রিকান বাসস্থানে, দর্শনার্থীরা একটি পরিবর্তিত ট্রাক ব্যবহার করে সাফারি অভিজ্ঞতার মাধ্যমে ভ্রমণ করবে। চিড়িয়াখানার দক্ষিণ হ্রদে জলজ ও আধা-জলজ ঘেরগুলো অন্য একটি নৌকা যাত্রার মাধ্যমে উপভোগ করা যাবে। মাস্টারপ্ল্যান অনুসারে ২২.৪ হেক্টর এলাকা জুড়ে ৪০টি বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর জন্য ২০টি ঘের থাকবে।

পানির গভীরতা কম থাকায় ও স্থিতিশীলতার কারণে ওকাভাঙ্গো ডেল্টায় ব্যবহৃত নৌকাগুলো সম্ভবত ক্যাটামারান টাইপ নৌকা হতে পারে।

অন্যদিকে, ক্রান্তীয় বাসস্থান ও ট্রাম রুটটি চিড়িয়াখানার কেন্দ্রে অবস্থিত হবে। ট্রামটি দর্শনার্থীদের দক্ষিণ প্রবেশদ্বার থেকে সাইটটির চারপাশে নিয়ে যাবে এবং বাংলাদেশ ও আফ্রিকান আবাসস্থলে থামবে।

ক্রান্তীয় অঞ্চলে সাঁতার কাটার জন্য এশিয়ান হাতিদের একটি বড় পুকুর থাকবে। ওরাংওটাং, হুলক গিবন, উত্তর পিগ-টেইলড ম্যাকাক, কাঠবিড়ালি বানর, মাকড়সা বানর, কালো ও সাদা লেমুর এবং কোটিস থাকবে। এটি ২৬টি প্রাণীর ঘের ও ৬৬টি প্রজাতিসহ ১৪.১ হেক্টর এলাকা জুড়ে হবে।

নিশাচর বাসস্থানে একটি হাঁটা ট্রেন হবে যা শুধুমাত্র রাতে খোলা হবে। এটি একটি আপমার্কেট রেস্তোরাঁর সঙ্গে একযোগে ডিজাইন করা হয়েছে যা দক্ষিণ লেকের দিকে মুখোমুখি হবে। এখানে, সাড়ে চার হেক্টর অঞ্চলে ১৫টি প্রজাতির প্রাণীর জন্য ১০টি ঘের থাকবে।

নাইট সাফারিতে প্রবেশের জন্য আলাদা টিকিট থাকবে।

গাছের কী হবে?

পরিকল্পনা অনুসারে, উদ্দেশ্য হলো চারটি আবাসস্থলের ল্যান্ডফর্ম, উদ্ভিদের প্রজাতি এবং ল্যান্ডস্কেপে তাদের বিন্যাসের ভিজ্যুয়াল চেহারা পুনরায় তৈরি করা।

মূল উদ্বেগ হচ্ছে, প্রধান আবাসস্থল থেকে উদ্ভিদের প্রজাতি ঢাকায় বৃদ্ধি পাবে এবং স্থানীয়ভাবে সেগুলো উৎস পাওয়া যাবে কি-না। যদি আসল প্রজাতি পাওয়া না যায় বা এলাকার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম না হয়, তাহলে বিকল্প উদ্ভিদের প্রজাতি জন্মাতে হবে।

এ কারণে, সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ প্রজাতির পরিবর্তে, কর্তৃপক্ষ এমন গাছ বেছে নেবে যেগুলো মিষ্টি জলে জন্মায়, সহজে উৎসারিত এবং তিন বছর পর্যন্ত ব্যাগে জন্মানো যায়।

মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী, বিদ্যমান ৫ হাজার ৫০৫টি গাছ নতুন নকশায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা

পরিকল্পনা অনুযায়ী, চিড়িয়াখানায় একটি অ্যাক্টিভিটি জোন থাকবে। যেখানে বাচ্চাদের হিংস্র নয় এমন প্রাণীদের দেখার জন্য একটি পোষা চিড়িয়াখানা থাকবে। এটি একটি খেলার মাঠের পাশে হবে।

এছাড়াও, দুটি অ্যাম্ফিথিয়েটার ডিজাইন করা হবে। যার একটি উত্তর লেকের পাশে শিকারি পাখির উপস্থাপনার জন্য এবং আরেকটি মিশ্র প্রজাতির প্রাণী উপস্থাপনার জন্য।

বাংলাদেশের আবাসস্থল উপ-ব্যাখ্যা কেন্দ্রে একটি মোহনা এবং সুন্দরবনের আন্ডারওয়াটার ট্যাঙ্ক এবং আফ্রিকান আবাসস্থল উপ-ব্যাখ্যা কেন্দ্রে একটি মিঠা পানির ট্যাঙ্ক ছাড়া কোনো অ্যাকোয়ারিয়াম জোন থাকবে না।

চিড়িয়াখানায় একটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অঞ্চল ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্ল্যান্টও থাকবে।

“দ্য ব্যাক অব দ্য হাউজ” (বিওএইচ) জোনটিতে যেখানে কয়েকটি একতলা বিল্ডিং থাকবে। যেখানে হাউজ সাবস্টেশন, ওয়ার্কশপ এবং একটি ভেটেরিনারি হাসপাতাল।

বিদ্যমান দক্ষিণ প্রবেশদ্বারটি একটি অভ্যন্তরীণ প্লাজা দিয়ে আপগ্রেড করা হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী মূল প্রবেশ বিল্ডিং টিকিটিং, অতিথি পরিষেবা, খুচরা দোকান, একটি ক্যাফে, পাবলিক টয়লেট, আগমন-প্রস্থান এবং অন্যান্য বিষয়গুলোর জন্য হবে।

এছাড়াও, ৩০০টি গাড়ির জন্য মূল প্রবেশপথে একটি পার্কিং বিল্ডিংও থাকবে এবং দ্বিতীয় প্রবেশপথে ২৭০টি গাড়ির জন্য পার্কিং ব্যবস্থা থাকবে। পরিকল্পনায় একটি নতুন প্রবেশপথও যুক্ত হয়েছে যেটি দর্শনার্থীদের সরাসরি উত্তর লেকে নিয়ে যাবে।

About

Popular Links