Monday, May 27, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

গ্রামীণ এলাকায় গৃহস্থালি কাজে পরিবর্তন হচ্ছে পুরুষের ভূমিকায়

বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গৃহস্থালীর কাজে পুরুষদের দেখতে পাওয়া একসময় অসম্ভব ছিল

আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০২২, ১২:১৪ পিএম

সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা ভাদুরী রানী (৬৫) তার মা ও নানির মতোই গতানুগতিক জীবনযাপন করে আসছিলেন। রান্নাঘরের কাজ করা, স্বামীর কাজে সাহায্য করা এবং এক হাতে পরিবার সামলানোর পাশাপাশি কৃষিজমিতে কাজ করা তার জন্য স্বাভাবিক ছিল।

তার মেয়ে হরিদাসী (৪২) একইরকম জীবনযাপন করছিলেন। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে চলে আসার এই রীতি একসময় বদলে যায়। হরিদাসী স্বামী রবি দাস (৫০) এখন আর তাকে মারধর করেন না।

উপজেলার বাজার গ্রাম পরিদর্শনকালে এই প্রতিবেদককে রবি নামে একজন স্বল্প আয়ের হস্তশিল্প কারিগরকে তার স্ত্রীকে রান্নাঘরের কাজে সাহায্য করতে দেখেন।

শহুরে দৃষ্টিকোণ থেকে দৃশ্যটি অনেকের কাছেই স্বাভাবিক মনে হতে পারে। তবে গ্রামীণ সংস্কৃতি পুরুষদের দ্বারা “নারীর কাজ” করার বিষয়টিকে সহজভাবে দেখা হয় না।

তবে, অনেক গ্রামেই এই পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। কারণ পুরুষরা পরিবারের নারী সদস্যদের সাহায্য করার জন্য গৃহস্থালির কাজে অংশগ্রহণ করছে।

সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ ও শ্যামনগর, খুলনার কয়রা ও দাকোপ উপজেলার চারটি ইউনিয়নে এই ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের (ডব্লিউভিবি) “নবযাত্রা” প্রকল্পের মাধ্যমে।

প্রকল্পের অধীনে, জেন্ডার-সমতাপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের জন্য এবং গৃহস্থালীর কাজে পুরুষদের সম্পৃক্ততা বাড়াতে “মেনকেয়ার” অধিবেশন (সেশন) পরিচালিত হয়।

এই সেশনগুলো জেন্ডার সমতা এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির (জিইএসই) ওপর দৃষ্টিনিবন্ধ করে পরিচালিত হয়।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, উইনরক ইন্টারন্যাশনালের অংশীদারিত্বে এবং ইউএসএআইডি’র অর্থায়নে প্রকল্পটি ডব্লিউভিবি’র দ্বারা বাস্তবায়িত হচ্ছে।

রবি বলেন, “আমি আগে কখনও ভাবিনি পুরুষরা নারীদের কাজ করবে। এখন আমি মনে করি সমস্ত গৃহস্থালী কাজ পুরুষ এবং জন্য একই।” 

তিনি বলেন, “এগুলো আমার পরিবারের সুখের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ।” 

এই পরিবর্তন অবশ্য একদিনে আসেনি। বিয়ের ৩৫ বছর পর, দুই ছেলেকে তাদের স্ত্রীদের গৃহস্থালির কাজে সাহায্য করতে দেখে রবির নিজের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাতে শুরু করে।

হরিদাসী বলেন, “আমি আমার স্বামীকে ঘরের সমস্ত কাজ শেষ করার পর বাঁশের ঝুড়ি তৈরি করতে সাহায্য করি।”

তিনি আরও বলেন, “আগে পরিবারের সবার যত্ন নেওয়ার দায়িত্ব শুধু আমার ছিল। এখন যখন দেখি আমার স্বামী আমাকে দুপুরের খাবার রান্নায় সাহায্য করছেন, তখন আমার ক্লান্তি দূর হয়ে যায়।”

সহিংসতা হ্রাস

যেসব উপজেলায় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হয়েছে সেখানে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা কমাতে প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, বাজার গ্রামের একদল নারী-পুরুষ একটি উঠানে একত্রিত হয়ে আলোচনা করছেন।

তারা জানান, ডব্লিউভিবি কর্মীদের দ্বারা পরিচালিত এই সভাগুলো প্রতি ১৫ দিন পর পর পরিবারে জেন্ডার সম্পর্ক এবং নারীদের জীবনকে সহজ করার জন্য যৌথ সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করার জন্য অনুষ্ঠিত হয়।

ছয় মাসে “উঠান বৈঠক” নামে ১২টিরও বেশি সেশনে, পরিবারের পুরুষ সদস্যদের গঠনমূলক জেন্ডার সমতার গুরুত্ব শেখানো হয়েছে।

এসব সেশনে অংশগ্রহণের পর অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী একমত হন যে গার্হস্থ্য সহিংসতা অপরাধ, বাল্যবিবাহ ক্ষতিকর এবং পুষ্টি গুরুত্বপূর্ণ।

২০১৬-১৭ সালের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০১৫ সালে প্রকল্পটি চালু হওয়ার পর থেকে, স্বামী-স্ত্রীরা যৌথভাবে পরিবারের ৭৭% সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার মধ্যে খাদ্য, পোশাক এবং স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো রয়েছে।

আরও লক্ষণীয় বিষয় হল, ২০১৫ সালে ৮.৩% বেসলাইন থেকে ২০২০ সালে নবযাত্রা প্রকল্প এলাকার মধ্যে ৯২.৬৫% পুরুষ বলেছেন, দম্পতিদের বাড়ির কাজ এবং শিশু যত্নে অংশ নেওয়া উচিত। এই পরিবর্তনটি “মেনকেয়ার” সেশনের সরাসরি সুফল।

বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গৃহস্থালীর কাজে পুরুষদের দেখতে পাওয়া একসময় অসম্ভব ছিল।

তবে, প্রকল্পের তথ্য থেকে জানা যায়, এখন ৫২.৮% পুরুষ তাদের সন্তানদের খাওয়াচ্ছেন, ৮৪.৯% পুরুষ অসুস্থতার সময় তাদের সন্তানদের যত্ন নিচ্ছেন এবং ৫২.৮% পুরুষ সন্তানদের মেনকেয়ার সেশনের পরে গোসল করাচ্ছেন।

নবযাত্রা প্রকল্পের সুশাসন ও সামাজিক জবাবদিহিতার উপদেষ্টা নির্মল সরকার ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “এই পদ্ধতি নারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের পথ প্রশস্ত করে।

তিনি বলেন, “মেনকেয়ার পদ্ধতির ফলে লিঙ্গ সমতার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ফলাফল এসেছে। স্বামী-স্ত্রী আয়-ব্যয় এবং সম্পদের বিষয়ে একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। সেশনগুলো এই অঞ্চলগুলোতে গার্হস্থ্য সহিংসতা কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।”

About

Popular Links