Thursday, May 23, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে, কুমিল্লার খাদির বিক্রি তত বাড়ছে

‘খাদি কাপড়ের বুননে বৈচিত্র্য আসায় নারী-পুরুষ সবার কাছে যুগের পর যুগ ধরে এর জনপ্রিয়তা অক্ষুণ্ন রয়েছে’

আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০২২, ১০:১২ পিএম

ঈদ-উল ফিতর যত ঘনিয়ে আসছে, কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী খাদি পোশাক ও কাপড়ের বাজার তত জমে উঠছে। প্রতিটি দোকানেই দিনরাত ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিক্রেতারা বলছেন, দাম অপেক্ষাকৃত কম হওয়ায় সীমিত আয়ের মানুষের কাছে খাদি পোশাকের কদর বেশি। পুরুষরা কিনছেন পাঞ্জাবি ও ফতুয়া। নারীদের প্রিয় খাদির থ্রি-পিস। সেই সঙ্গে বিক্রি হচ্ছে খাদি কাপড়ের তৈরি বিছানার চাদর ও নকশি কাঁথা। তারা জানান, ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মিশেলে এ বছর নানা ধরনের নকশায় তৈরি করা হয়েছে খাদি।

মঙ্গলবার (১৯ এপ্রিল) দুপুরে নগরের কান্দিরপাড়ে লাকসাম সড়কের দুপাশে ১৯টি খাদি দোকানে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। কেউ একা, কেউবা দলবেঁধে আবার অনেকেই সপরিবারে কেনাকাটা করছেন।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক রুচিশীল পোশাক তৈরি করে আনা হয়েছে। মিহি সুতার সঙ্গে মোটা সুতার ব্লেন্ড এবং খাদির সঙ্গে রকমারি সুতার চেক বুনে কাপড়েও বৈচিত্র্য আনা হয়েছে। আবার ব্লক দিয়েও তৈরি করা হয়েছে সুন্দর পোশাক। দামও ধরা হয়েছে মোটামুটি ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে।

এবারে খাদি পোশাকগুলোর মধ্যে সাদা ও রঙিন পাঞ্জাবি সর্বনিম্ন ৫৫০ থেকে সর্বোচ্চ ৩ হাজার টাকা, মেয়েদের থ্রিপিস ৪৩০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা, শর্ট ফতুয়া ৪০০ থেকে ৯০০ টাকা, শাড়ি ৪০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা, শার্ট ৪০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা দামে মিলছে। এছাড়া বিছানার চাদর ৩০০ থেকে ৬ হাজার টাকা এবং নকশি কাঁথা ৩ থেকে ৮ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

কান্দিরপাড়ের কুমিল্লা খাদির কুটির নামের দোকানে কথা হয় বরুড়া উপজেলা থেকে আসা একটি পরিবারের সঙ্গে। তারা জানান, এবার পরিবারের পাঁচ সদস্যের সবার জন্যই খাদি কাপড় কেনা হয়েছে। দামও নাগালের মধ্যে।

কুমিল্লার খাদি কাপড় বিক্রির দোকানঢাকা ট্রিবিউন

রাজগঞ্জ এলাকার খাদিঘরের স্বত্বাধিকারী প্রদীপ কুমার রাহা বলেন, “একসময় খাদি কাপড় অনেক ভারি ছিল। এখন ওই কাপড় প্রতিনিয়ত মিহি করা হচ্ছে। তরুণ প্রজন্ম এখন খাদি নিয়ে ভাবছে এবং গবেষণা করছে। এদের হাত ধরেই খাদি কাপড় এবং এর তৈরি পাঞ্জাবি ও ফতুয়ার নকশায় বৈচিত্র্য আসছে। বর্তমানে সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও ইতালিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে খাদি কাপড়ের চাহিদা রয়েছে।”

কুমিল্লার তিন নদী পরিষদের সভাপতি আবুল হাসনাত বলেন, “খাদি কাপড়ের বুননে বৈচিত্র্য আসায় নারী-পুরুষ সবার কাছে যুগের পর যুগ ধরে এর জনপ্রিয়তা অক্ষুণ্ন রয়েছে।”

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে আজও ঐতিহ্য, সুনাম ও খ্যাতি অক্ষুণ্ন রাখার লড়াইয়ে রয়েছে কুমিল্লার খাদি। হাজার বৈচিত্র্যের মধ্যেও চরকায় বোনা খাদি কাপড়ের পোশাকের গুরুত্ব কমেনি বরং বুননবৈচিত্র্যে যুগ যুগ পেরিয়ে মানুষের কাছে এর আকর্ষণ নতুন করে ফিরে এসেছে। এখন তো খাদি হয়ে উঠেছে রঙিন, ডিজাইনের ভিন্নতায় অনন্য। গরমে আরাম এবং পোশাক আধুনিক রুচিশীল হওয়ায় নতুন প্রজন্মেরও মন জয় করে নিয়েছে খাদি। কুমিল্লার খাদি কাপড়ের কদর মানুষের কাছে বাড়তে থাকায় দেশীয় ফ্যাশন হাউজগুলো খাদি কাপড়ের পোশাক নির্মাণে বিশেষ নজর দিচ্ছে, আনছে নিত্যনতুন ডিজাইনের খাদি কাপড়ের পোশাক। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকাসহ উন্নত বিশ্বে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বিপুলসংখ্যক বাঙালির কাছেও খাদির কদর দিন দিন বাড়ছে।

ভারত উপমহাদেশজুড়ে ব্রিটিশবিরোধী অসহযোগ আন্দোলনের সময় ১৯২১ সালে কুমিল্লায় খাদি কাপড় ও পোশাকের যাত্রা শুরু হয়। তখন সর্বত্র বিদেশি পণ্য বর্জনের আওয়াজ ওঠায় খাদি কাপড় ও পোশাক খুব দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে। আবার ১৯৪৭ এর দেশ বিভাগের পর ভারত পৃষ্ঠপোষকতা প্রত্যাহার করে নিলে কুমিল্লার খাদিশিল্পে সংকট দেখা দেয়। পরবর্তীতে এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হাল ধরেন বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমির (বার্ড) প্রতিষ্ঠাতা ড. আখতার হামিদ খান। 

খাদের (গর্তে) চরকায় বসে এ কাপড় তৈরি করা হয় বলে এর নামকরণ হয় খাদি। জেলা সদর ছাড়াও চান্দিনা, দেবীদ্বার এবং আদর্শ সদর উপজেলায় খাদি কাপড় তৈরি হয়।

বর্তমানে কুমিল্লা মহানগরীর কান্দিরপাড়ি, মনোহরপুর ও রাজগঞ্জে প্রায় অর্ধশতাধিক দোকানে খাদির বিভিন্ন পোশাক বিক্রি হচ্ছে। ঈদ, নববর্ষ ও পূজা উপলক্ষে খাদির পাঞ্জাবি, ফতুয়ার থ্রিপিস ও শাড়ির বেশ চাহিদাও রয়েছে। সেই সঙ্গে বিক্রি হচ্ছে খাদি কাপড়ে তৈরি বিছানার চাদর ও নকশি কাঁথা।

About

Popular Links