Thursday, May 23, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

পিকে হালদারকে নিয়ে লজ্জিত পুরো মাটিভাঙ্গা ইউনিয়ন

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, অনেক গুণী মানুষের জন্ম যে মাটিভাঙ্গায় সেখানেই অর্থ লোপাটকারী পিকে হালদারের বাড়ি। ভাই, এ পরিচয়  দিতে আমাদের এখন লজ্জা করে

আপডেট : ১৬ মে ২০২২, ১১:৪৪ এএম

প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা আত্মসাত করে ভারতে গ্রেপ্তার প্রশান্ত কুমার (পিকে) হালদারের গ্রামের বাড়ি পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার মাটিভাঙ্গা ইউনিয়নের দীঘিরজান গ্রামে। শনিবার (১৪ মে) ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গ্রেপ্তার হন তিনি। এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিটেডের সাবেক এই ব্যবস্থাপনা পরিচালকের অর্থ আত্মসাৎ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ছিল দেশব্যাপী আলোচনার শীর্ষে।

এই অর্থপাচারকারীর কর্মকাণ্ডে তার গ্রামের মানুষ লজ্জিত। ভারতে ধরা পড়ার পর গ্রাম তো বটেই ইউনিয়নবাসীই তার কর্মকাণ্ডে বিব্রত।

নাজিরপুরের মাটিভাঙ্গা ইউনিয়নেই জন্ম স্বনামধন্য রাজনীতিবীদ ও সাবেক মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীর। ইউনিয়নের তারাবুনিয়া গ্রামে বাড়ি সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক বর্তমান মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিমের। সাবেক মন্ত্রী ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক মোস্তফা জামাল হায়দার এবং ন্যাপ কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহ-সভাপতি ও বরিশাল জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আ. সাত্তার মিয়ার বাড়ি ইউনিয়নের বরইবুনিয়া গ্রামে।


আরও পড়ুন- পিকে হালদার ভারতে গ্রেপ্তার


মাটিভাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান জাহিদুল ইসলাম বিলু ছাত্র ইউনিয়ন পিরোজপুর জেলা  সংসদের সাবেক সভাপতি। বর্তমানে তিনি জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য।  

রবিবার তার কাছে পিকে হালদারের গ্রামের বাড়ির বিষয়ে জানতে চায় ঢাকা ট্রিবিউন। উত্তরে চেয়ারম্যান বলেন, “পি কে হালদারের বাড়ি মাটিভাঙ্গায় এ পরিচয় পত্রিকায় দিয়েন না।” পরে অবশ্য এই জনপ্রতিনিধি বলেন, “ইউনিয়নের দীঘিরজান গ্রামে পিকে হালদারের বাড়ি।”

জাহিদুল ইসলাম বিলু আরও বলেন, “অনেক গুণী মানুষের জন্ম যে মাটিভাঙ্গায় সেখানেই অর্থ লোপাটকারী পিকে হালদারের বাড়ি। ভাই, এ পরিচয়  দিতে আমাদের এখন লজ্জা করে।”


আরও পড়ুন- স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: পিকে হালদারের বিষয়ে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি


গ্রামে পিকে হালদারের আসা-যাওয়া কেমন ছিল, জানতে চাইলে ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, “খুব কম আসত।”

এরপর তিনি বলেন, “প্রায় এক যুগ আগে তাকে দীঘিরজান মাধ্যমিক বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি করা হয়। একবার ম্যানেজিং কমিটির সভায় পিকে হালদার বহিরাগত এক ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে অশালীন কথা বলে। বিষয়টি ওই ব্যক্তির কানে গেলে তিনি সভায় ঢুকে পিকে হালদারকে চড় দেন। এরপর থেকে পিকে হালদারকে বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভায় আর দেখা যায়নি।”

পিকে হালদার ও তার সহযোগীরা ঢাকা ট্রিবিউন

জাহিদুল ইসলাম বিলু জানান, “পিকে হালদারের প্রধান সহযোগীদের বাড়িও নাজিরপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে। কয়েক মাস আগে দুদকের হাতে গ্রেপ্তার পি কে হালদারের তিন সহযোগী অবন্তিকা বড়াল, সুকুমার মৃধা ও অনিন্দিতা মৃধার (মেয়ে) বাড়িও নাজিরপুর উপজেলায়।”


আরও পড়ুন- পিকে হালদারকে বাংলাদেশে পাঠাবে ভারত


স্থানীয়দের সঙ্গে  আলাপ করে জানা গেছে, পিকে হালদারের বাবা প্রণবেন্দু হালদার ছিলেন দীঘিরজান বাজারের একজন দর্জি। মা লীলাবতি হালদার ছিলেন স্কুল শিক্ষক।

প্রশান্ত কুমার  ১৯৮২ সালে দীঘিরজান মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করেন।  এরপর বাগেরহাটের সরকারি পিসি কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে ভর্তি হন বুয়েটের মেকানিক্যাল ডিপার্টমেন্টে। বুয়েটের পড়াশোনা শেষে তিনি চাকরি শুরু করেন একটি বেসরকারি পাটকলে।

১৫-১৬ বছর আগে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী এক নারীকে বিয়ে করার পর থেকে পি কে হালদার সমাজচ্যূত। তার এই অর্থ কেলেঙ্কারি সামনে আসার পর শিক্ষিকা মা ভারতে আরেক ছেলে প্রীতিশ হালদারের বাড়িতে চলে গেছেন।

তাদের আরেক ভাই প্রাণেশ হালদার কানাডায় থাকেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।


আরও পড়ুন- ভুয়া পরিচয়ে ভারতের নাগরিক হন পিকে হালদার


গ্রামে হালদার পরিবারের প্রতিবেশী অধ্যক্ষ দীপ্তেন মজুমদার ঢাকা ট্রিবিউনকে জানান, প্রশান্ত হালদারকে মেধাবী ছাত্র হিসেবে এলাকাবাসী চিনত। দীর্ঘদিন ধরে গ্রামে তার তেমন কোনো যোগাযোগ ছিল না। মানুষ জানত তিনি অনেক বড় চাকরি করেন।

তিনি বলেন, “ভিন্নধর্মের নারীকে বিয়ে করায় তিনি ধর্মত্যাগী হয়েছেন, এলাকায় এমন খবর প্রচলিত ছিল। কুষ্টিয়ায় একটি পাটকলসহ তার কোটি কোটি টাকার ব্যবসা ছিল বলে মানুষ জানে।”

দীঘিরজান গ্রামে মা লীলাবতীর নামে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন পিকে হালদার।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে পিকে হালদারকে গ্রেপ্তার করা হয়/ সংগৃহীত

বর্তমানে পিকে হালদারদের গ্রামের বাড়িতে পুরেনো একটি কাঠের টিনশেড ঘর আছে। সেখানে তার চাচাত ভাই দীপেন্দ্র নাথ হালদার থাকেন।

বাড়িটিতে গেলে পিকে হালদারের আত্মীয়রা জানান, তারা এই বাড়ি দেখে-শুনে রাখছেন। কিন্তু প্রশান্ত (পিকে) বা তার ভাইদের কেউই তাদেও খোঁজ নেন না। পিকে হালদারের এই কেলেঙ্কারির খবর শোনার পর ভয় ও শংকার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন বলে জানান তারা।

এদিকে, অর্থ লোপাটকারী প্রশান্তের “উপদেষ্টা” হিসেবে এলাকায় পরিচিত সুকুমার মৃধা। তার বাড়ি উপজেলার বাকসি গ্রামে। গত ১৫ বছর ধরে নিজের এলাকা নাজিরপুর, পিরোজপুর ও খুলনায় দানশীল, শিক্ষানুরাগী, গণমাধ্যমবান্ধব ইত্যাদি খ্যাতি ছড়াতে থাকে তার।


আরও পড়ুন- পি কে হালদারসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা


পেশাগত জীবনে তিনি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি, খুলনার রূপসা কলেজের অধ্যক্ষসহ একাধিক চাকরি করেন এবং এসব প্রতিষ্ঠান থেকে দুর্নীতির দায়ে চাকরি হারান বলে জানা যায়। নিজ গ্রাম বাকসিতে রাজলক্ষ্মী ফাউন্ডেশন নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলে সরকারি খাস জমিতে মহাবিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেন, বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, পাঁচটি মন্দির, দুঃস্থ ছাত্রীনিবাস, বৃদ্ধাশ্রম ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়া এলাকায় অনেক মসজিদ ও মাদ্রাসা তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন বলে দাবি তার ম্যানেজার সুভাষ চন্দ্র মণ্ডলের।

সুকুমার মৃধার খুলনায় “আলোকিত বাংলাদেশ” নামে অধুনালুপ্ত একটি সংবাদপত্রও ছিল ।

দুদকের হাতে আটক পি কে হালদারের বান্ধবী অবন্তিকা বড়াল ওরফে কেয়ার গ্রামের বাড়ি নাজিরপুর উপজেলার সদর ইউনিয়নের আমতলা গ্রামে। পিরোজপুর শহরের খুমুরিয়া এলাকায়ও তাদের একটি বাড়ি রয়েছে। অবন্তিকার বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা অরুণ কুমার বড়াল ছিলেন সরকারি কলেজের প্রভাষক।

বাবার মৃত্যুর পর অবন্তিকা ঢাকায় গিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন।

জানা গেছে, বর্তমানে রাজধানীর ধানমন্ডির ১০/এ সাত মসজিদ রোডে দামী ফ্ল্যাট রয়েছে অবন্তিকার। কয়েক কোটি টাকা মূল্যের ওই ফ্ল্যাটে তার মা অপর্ণা বড়াল ও অন্য দুই বোন থাকেন।

উল্লেখ্য, ইতোমধ্যে পিকে হালদারের একাধিক সহযোগী ঢাকায় দুদকের মামলায় কারাগারে রয়েছেন।

 

About

Popular Links