Tuesday, May 28, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

হাসপাতালের বর্জ্য নিচ্ছে না পৌরসভা, সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা

৯ বছর ধরে বকেয়া পৌরকর পরিশোধ না করায় ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালের সঙ্গে পৌর কর্তৃপক্ষের বিরোধ সৃষ্ট থেকে হাসপাতাল বর্জ্য পরিষ্কার করা বন্ধ করে দিয়েছে পৌরসভা

আপডেট : ২২ মে ২০২২, ১২:৩১ পিএম

ফরিদপুর শহরের প্রাণকেন্দ্র মুজিব সড়কের উত্তর দিকে ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালের অবস্থান। হাসপাতালের দ্বিতীয় গেট দিয়ে ঢুকে বাঁ দিকে ডায়রিয়া ওয়ার্ড ও ডান দিকে সার্জারি ওয়ার্ড। একটু এগোতেই দুর্গন্ধে নাক বন্ধ হওয়ার উপক্রম। সামনের কোয়ার্টার রাস্তায় তাকাতেই দুই চোখ ছানাবড়া হওয়ার জোগাড়। ডাস্টবিন উপচে পড়ে কেমিক্যাল বর্জ্য ছড়িয়ে পড়েছে রাস্তায়।

ডাস্টবিনের ২০০ গজ জায়গাজুড়ে স্তূপ হয়ে আছে হাসপাতালের বর্জ্যে। ময়লার স্তূপের ৩০০ গজ দূরে পশ্চিম পাশে হাসপাতাল জামে মসজিদ। ওই মসজিদে হাসপাতাল–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ছাড়াও স্থানীয় লোকজন নিয়মিত নামাজ পড়েন। এছাড়াও রাস্তাটি ব্যবহার করেন হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্সসহ তিনটি আবাসিক ভবনের বাসিন্দারা।

জানা গেছে, ৯ বছর ধরে বকেয়া পৌরকর পরিশোধ করছে না ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতাল। এ নিয়ে বিরোধের জেরে প্রায় দুই মাস ধরে ময়লা পড়ে আছে ডাস্টবিনেই। হাসপাতাল ক্যাম্পাসের উত্তর দিকে ডাস্টবিন সংলগ্ন সড়কে স্তূপ করে রাখা এসব বর্জ্য দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে রোগী, চিকিৎসক, নার্স, স্থানীয় বাসিন্দাসহ পথচারীদের। সঙ্গে রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ফরিদপুর সিভিল সার্জন কার্যালয়কে দেওয়া পৌরসভার চিঠি সূত্রে জানা গেছে, ২০১২-১৩ অর্থবছর থেকে ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালের পৌরকর বকেয়া রয়েছে ১ কোটি ৬৪ লাখ ১২ হাজার ৮৩ টাকা। এ টাকা পরিশোধ করা হয়নি বলে বর্জ্য অপসারণ করা বন্ধ করে দিয়েছে পৌরসভা।

তবে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের দাবি, পৌরসভার কাছে বকেয়ার বছরভিত্তিক হিসেব ও প্রত্যয়ন চাইলেও তা দিতে পারছে না। এজন্য বকেয়ার টাকা পরিশোধ করতে পারছে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

ডায়রিয়া ওয়ার্ডে বৃহস্পতিবার ভর্তি হন শহরের আলীপুরের বাসিন্দা মাহাবুব খান। তিনি ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “ময়লা পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। ওয়ার্ডের উত্তর পাশের জানালাগুলো খোলা যাচ্ছে না। যে অবস্থা, তাতে রোগ সারাতে এসে নতুন রোগ নিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে না হয়।”


প্রায় দুই মাস ধরে ময়লা পরিষ্কার করছে না পৌরসভা/ ঢাকা ট্রিবিউন

তিনি আরও বলেন, “ওয়ার্ডের ভেতরে হাসপাতালের লোকজন পরিষ্কার করেন, আমি দুই দিন ধরে আছি। এর মধ্যে স্তূপ করে রাখা ময়লা কাউকে পরিষ্কার করতে দেখলাম না। গোসল করতে ও পানি আনতে আমাদের ওই পথে যাতায়াত করতে হয়। তখন মুখে কাপড় বেঁধে চলাচল করতে হয়।”

ফরিদপুর জিলা স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র জুনায়েদ হাসানের বাবা সিভিল সার্জন অফিসের প্রধান সহকারী জালাল আহমদ। হাসপাতালের আবাসিক ভবনে তাদের বাসা। জুনায়েদ জানায়, গন্ধের জন্য বাড়িতে থাকা যায় না। জানালা বন্ধ করে রাখতে হয়। স্কুলে যাওয়ার সময় ওই জায়গাটুকু পার হতে গন্ধে পেটের নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে যায়। বৃষ্টি হলে পানি জমে ময়লা রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে।

হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স মর্জিয়া খানম (৫৪) বলেন, “ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার না করায় হাঁটাচলায় সমস্যা হচ্ছে। পাশে ডায়রিয়া ওয়ার্ড থাকায় স্বাস্থ্যঝুঁকি আছে। আমরা ওয়ার্ড মাস্টারের মাধ্যমে কর্তৃপক্ষকে বলি, কিন্তু কাজ হয় না।”

ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, “দূষিত পরিবেশের মধ্যে স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে আমাদের প্রতিদিন কাজ করতে হচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হচ্ছে। পৌরকর বাকি থাকায় পৌরসভা গত দুই মাস ধরে ময়লা নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। পৌরসভা জনগণের, হাসপাতালও জনগণের। এর ফলে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে জনসাধারণকে।”

ফরিদপুর পৌরসভার মেয়র অমিতাভ বোস ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমার স্টাফরা হাসপাতালের ময়লা অপসারণ করে অথচ তারা আমাদের কোনো টাকা দেয় না। আমাকে তো কর্মচারীদের বেতন দিতে হয়। বকেয়া টাকা না পেলে ময়লা পরিষ্কার করব কীভাবে?” তিনি পরামর্শ হিসেবে বলেন, “যে ময়লা জমেছে, তা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিজ উদ্যোগে পরিষ্কারের ব্যবস্থা করতে পারে।”

মেয়র বলেন, “আমার জানামতে সিভিল সার্জন বকেয়ার সমুদয় টাকা পেয়েছেন। কিন্তু টাকা পেয়েও পৌরকর পরিশোধ করছেন না। চলতি বছর আমাদের বকেয়াসহ সমস্ত টাকা পরিশোধ করতে হবে।”

ফরিদপুরের সিভিল সার্জন মো. ছিদ্দীকুর রহমান বলেন, “যে বকেয়া জমা হয়েছে, তা তো ৯ বছর ধরে বকেয়া পড়েছে। আমার আসার আগে থেকেই বকেয়া রয়েছে।”

তিনি জানান, বকেয়ার কথা জানালে মন্ত্রণালয় থেকে ১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছিল। পাশাপাশি এ টাকা দেওয়ার জন্য পৌরসভা থেকে বকেয়ার বছরওয়ারি হিসাব ও হিসাব বিভাগ থেকে বকেয়া পৌরকর জমা পড়েনি মর্মে একটি প্রত্যয়নপত্র চাওয়া হয়। জেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা ওই প্রতিবেদন না দিয়ে তাকে জানান, পাঁচ বছরের বেশি পুরনো হিসাব তার পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়; কেননা পাঁচ বছর পর তারা তা ধ্বংস করে দেন। হিসাব ও প্রত্যয়ন পাওয়া যাচ্ছে না বলে বকেয়ার টাকা দিতে পারছি না।


About

Popular Links