Tuesday, May 28, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় রোল মডেল হয়েও নাকাল বাংলাদেশ

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সুনাম থাকলেও এবার সিলেট ও সুনামগঞ্জে বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে৷ কেন এমন হয়?

আপডেট : ২৮ মে ২০২২, ০৫:১১ পিএম

বাংলাদেশে এখনো আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয় বন্দরের জন্য। সতর্ক সংকেতগুলো সাধারণ মানুষ বোঝেন না। দেশের সিলেট ও সুনামগঞ্জের বন্যায় আগাম কোনো পূর্বাভাস দিয়ে কৃষকদের ফসল রক্ষায় ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ পেরেছে।

উপকূলীয় বাঁধগুলো ভাদ্রমাসের জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যায়। উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে উজাড় হয়ে যাচ্ছে। বজ্রপাত প্রতিরোধে লাগানো তালগাছ কেতাবে আছে কিন্তু বাস্তবে নেই। উপকূলের ৩২০টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় দুই লাখ ৫৬ হাজার মানুষ এবং প্রায় ৪৪ হাজার গবাদি প্রাণীর আশ্রয় গ্রহণের সুযোগ আছে। কিন্তু ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রে মানুষ আশ্রয় নিতে চায় না।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নাঈম ওয়ারা বলেন, “একটি আশ্রয় কেন্দ্রে একজন মানুষের জন্য দুই বর্গফুট জায়গা বরাদ্দ। সেই জায়গায় একজন মানুষ কতক্ষণ থাকতে পারে। এখন তো ৫৬ ঘণ্টা আগে আশ্রয় কেন্দ্রে যেতে বলা হয়। নারী আছে, শিশু আছে তারা কি অতটুকু জায়গায় থাকতে পারে? ফলে তারা যায় না। এর ফলাফল অনেকের মৃত্যু হয় ঘূর্ণিঝড়ে।”

তিনি বলেন, “একটি আশ্রয় কেন্দ্রের অর্থ দিয়ে ৪০টি দোতলা বাড়ি করা সম্ভব নীচতলা ফাঁকা রেখে। কিন্তু সেটা করা হয়নি। তাই অবকাঠামো থাকলেও দুর্যোগে কাজে লাগে না।”

বাংলাদেশে কৃষক ও কৃষিকে সামনে রেখে কোনো আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয় না। কখন বৃষ্টি হবে, কখন পানি বাড়বে এগুলো কৃষক জানেন না। ফলে তার ফসল ডুবে যায়, বাড়ি ডুবে যায়, ঢলে সব শেষ হয়ে যায়।

গওহার নাঈম ওয়ারা বলেন, “শুধু যদি এবার কৃষকদের জানানো হতো যে, অমুক তারিখে বৃষ্টি হবে, অমুক তারিখে পানি বাড়বে, তাহলে কৃষকদের ধান নষ্ট হতো না। আমাদের কাছে তথ্য ছিল, আমরা জানাইনি। পশ্চিম বাংলা কৃষকরা ধান রক্ষা করতে পেরেছেন। একই জায়গা থেকে তথ্য পেয়েও আমরা পারিনি।”

বাংলাদেশ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় প্রশংসনীয় সাফল্য অর্জন করলেও আরও অনেক দূর যেতে হবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। বিশ্বের সবচেয়ে দুর্যোগপ্রবণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান নবম। চলতি দশকে বাংলাদেশের ১১ কোটি ২০ লাখেরও বেশি মানুষ দুর্যোগের শিকার হয়েছেন।

গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স বলছে, বাংলাদেশে গত ২০ বছরে ১৮৫টি আবহাওয়াজনিত তীব্র দুর্যোগ সংঘটিত হয়েছে। অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে ৩.৭২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের। আর শুধু জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ বিপদাপন্নতায় পৃথিবীতে বাংলাদেশ সপ্তম অবস্থানে রয়েছে।


বন্যার পানিতে ডুবে যাচ্ছে সিলেটের কোম্পানিগঞ্জের রাধানগর মুজিবনগর আশ্রয় কেন্দ্র/ ফোকাস বাংলা


বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে দুর্যোগ হিসেবে সামনে এসেছে বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যু। এছাড়া ভূমিকম্প ঝুঁকির মধ্যেও রয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশে বছরে এখন প্রায় ৩০০ মানুষ বজ্রপাতে মারা যান। আর এই বজ্রপাত ঠেকাতে সারা দেশে তালগাছ লাগানোর প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। এখন ৩৮ লাখ তালগাছ লাগানোর প্রকল্প বাতিল করে বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপনের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস-এর প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. খোন্দকার মোকাদ্দেম হোসেন বলেন, “আসলে তালগাছ বিষয় নয়, আমাদের দরকার উঁচু গাছ। আমরা নিজেরাই গাছ কেটে ফেলেছি। নিজেরাই নিজেদের বিপর্যয় ডেকে এনেছি। আর তাল গাছ তো সব জায়গায় লাগানো যাবে না। শহরে তালগাছ লাগাবেন কিভাবে?”

তিনি বলেন, “বাংলাদেশ এখন ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা। সাত মাত্রার ভূমিকম্প হলেও ঢাকা শহরের অধিকাংশ ভবন ধ্বসে পড়বে। কারণ, বিল্ডিং কোডে এখন ভূমিকম্প সহনীয় শর্ত রাখা হলেও এর আগে তো অধিকাংশ ভবন তৈরি হয়েছে।”

এখন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কিছু বিষয় আছে, আগে থেকে আঁচ করা যায় না। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কিন্তু এসব মোকাবেলায় বাংলাদেশের প্রস্তুতি পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশে সব মিলিয়ে চার হাজার কিলোমিটারেরও বেশি বাঁধ আছে। কিন্তু এবারের হাওরের বন্যায় বাঁধ টেকেনি। আর ভাদ্র মাসের পানির চাপ নিতে পারে না অধিকাংশ বাঁধ। প্রতি বছরই বাঁধ নির্মাণের পিছনে শত শত কোটি টাকা অপচয় হয়।

খোন্দকার মোকাদ্দেম হোসেন বলেন, “এই বালুর বাঁধগুলো আসলে টেকসই নয়। পানির ঢল এরা ঠেকাতে পারে না। এই বাঁধ নির্মাণে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ নেই। তাদের প্রয়োজনীয়তার কথাও বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।”

উপকূলীয় এলাকায় সবুজ বেষ্টনী প্রকল্পের শতকরা ৫০% গাছের এখন আর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেই গাছগুলো হাওয়া হয়ে গেছে। ফলে ৭৭৫ কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকা লবণাক্ততা ও ঝড় জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

গওহার নাঈম ওয়ারা বলেন, “কী গাছ লাগাতে হয় তা-ও আমরা জানি না। আর গাছ লাগানোর পর আমরা খোঁজও রাখি না।”

কৃষি অর্থনীতির এই দেশে দুর্যোগবার্তা এখনো কৃষি ও কৃষককেন্দ্রিক নয় বলে মনে করেন বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কম্যুনিকেশন (বিএনএনআরনি)-র প্রধান এ এইচ এম বজলুর রহমান।

আবহাওয়ার ৫, ৬, ৭ সতর্কবার্তা যে একই সতর্কতার তা কি আমরা জানি? তাহলে কৃষক জানবে কীভাবে? এটা কৃষকের জন্য নয়, বন্দরের জন্য। আর আবহাওয়ার এই তথ্য কৃষি অধিদপ্তর বা মন্ত্রণালয়ের অধীনে নয়। গত ১০ বছরের বৃষ্টিপাতের তথ্য চাইলে গওহার নাঈম ওয়ারাকে “রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য” বলে দেওয়া হয়নি বলে জানান তিনি। কিন্তু ভারতে এই তথ্য উন্মুক্ত।

বজলুর রহমান বলেন, “এখন দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ আবহাওয়ার সতর্ক বার্তার ব্যাপারে আগের চেয়ে সচেতন হয়েছে। কিন্তু ভারত থেকে যে পানি আসে বা যে ঢল হয়, তা নিয়ে আগাম কিছু জানতে পারে না উত্তরাঞ্চলের মানুষ। আর সংকেত আরও সহজ করার দরকার আছে।”

তার কথা, কখন বৃষ্টি হবে, কখন পানির ঢল আসবে, কখন পানি বাড়বে- এই তথ্যগুলো পাওয়া গেলে কৃষক ও সাধারণ মানুষ অনেক বড় বড় দুর্যোগ থেকে রক্ষা পেতো।


About

Popular Links