Monday, May 27, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

নারায়ণগঞ্জের ৩০০ পরিবারের সংসার চলছে পরিত্যক্ত প্লাস্টিকে!

মাসে প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা থেকে আয় করতে পারছেন তারা

আপডেট : ০৪ জুন ২০২২, ০৬:১১ পিএম

পরিত্যক্ত পলিথিন, চিপসের প্যাকেট, বোতলে থাকা লেবেল এখন নারায়ণগঞ্জের ৩০০ পরিবারের আয়ের অন্যতম উৎস। একবার ব্যবহারযোগ্য এ সকল প্লাস্টিক জমা দিলেই মিলছে অর্থ বা চা।

মূলত নারায়ণগঞ্জকে প্লাস্টিক শূন্য রাখতে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন ও ইউনিলিভার বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে তিনবছর ব্যাপী “প্লাস্টিক ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট বিল্ডিং সার্কুলার সিটিজি” নামে এই বর্জ্য সংগ্রহ প্রকল্প চালু করা হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জের পরিবেশ দূষণের অন্যতম উপাদান একবার ব্যবহৃত এ সকল প্লাস্টিক। ইউএনডিপি’র তথ্যানুসারে, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ব্যবহৃত প্লাস্টিকের ৪০% থেকে ৫০% এএসইউপি অর্থাৎ একবার ব্যবহৃত বর্জ্য। এ সকল প্লাস্টিক জমে থেকে নদী, খাল, ড্রেন ভরাট করে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। অন্যদিকে, হ্রাস পাচ্ছে পানের যোগ্য বিশুদ্ধ পানির উৎসও। ফলে দিন দিন সৃষ্টি হচ্ছে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি।

তাই এ প্রকল্পের মাধ্যমে ফ্লেক্সিবল ও একবার ব্যবহারযোগ্য পরিত্যক্ত প্লাস্টিক  পুনঃব্যবহার ব্যবস্থা করা হবে। বর্তমানে নারায়ণগঞ্জের মোট ৫টি স্থানে প্রতিদিন প্রায় দেড় টনেরও বেশি প্লাস্টিক সংগ্রহ করা হচ্ছে।

শনিবার (৪ জুন) সকালে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার আলামীন নগর ডাম্পিং এলাকা সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, একবার ব্যবহৃত পলিথিন, চিপসের প্যাকেট রোদে শুকানো হচ্ছে।

বিভিন্ন বাসা থেকে ময়লা সংগ্রহকারী মামুন জানান, ময়লা সংগ্রহের পর ময়লা থেকে পরিত্যক্ত প্লাস্টিক আলাদা করে মাসে প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা থেকে আয় করতে পারছেন।

বাসা-বাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে ঢাকা ট্রিবিউন

ঢাকা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে মামুন বলেন, “বাসা-বাড়ি থেকে ময়লা তুলে যে বেতন পাই তা দিয়ে সংসার চালানো অনেক কষ্ট। বাসাভাড়া দেওয়ার পর মাসে দুই বেলা খাওয়ার টাকাও থাকে না। গত বছর সিটি কর্পোরেশনের মাধ্যমে জানতে পারি, বোতল, চিপসের প্যাকেট, বোতলের লেবেল তারা কিনে নেয়। তাই ময়লা নেওয়ার পর সেখান থেকে মাসে ২০-২৫ কেজি প্লাস্টিক আলাদা করে বিক্রি করা শুরু করি। বেতনের পাশাপাশি এখান থেকে কোনো মাসে ৪ হাজার আবার কোনো মাসে ৫ হাজার টাকা পাই।”

এদিকে প্লাস্টিক থেকে সর্বোচ্চ আয় করেছেন এমন সুনাম মিলেছে আব্দুর রউফ নামে এক ব্যক্তির। প্লাস্টিক বিক্রি করে প্রতিমাসে ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা আয় করেন তিনি।

আব্দুর রউফ জানান, প্রতিমাসেই ৩৫ থেকে ৪০ কেজি প্লাস্টিক বিক্রি করতে পারেন। ময়লার কাজ করার পাশাপাশি এই বাড়তি আয় তাকে পরিবার নিয়ে জীবনযাপনে কিছুটা অনেক সাহায্য করছে।

সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মী চামেলী বলেন, “গত বছরের নভেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত প্লাস্টিক কুড়িয়ে প্রায় ২০ হাজার টাকা পেয়েছি। কোনো মাসে তিন হাজার টাকা আবার কোনো মাসে চার হাজার টাকাও দেয়। সন্তানদের স্কুলের বই-খাতা কিনে দিতে পারি। কিছু টাকা সঞ্চয়ও করতে পারি।”

আলামীন নগর এলাকার প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহকারীদের সমন্বয়ক মিজানুর রহমান ঢাকা ট্রিবিউনকে জানান, এখানে ১২ থেকে ১৮ নম্বর ওয়ার্ড পর্যন্ত বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়। ১০৪ জনের মত বর্জ্য সংগ্রহকারী এখানে রয়েছেন। যাদের মধ্যে কেউ  বাসাবাড়ি থেকে গৃহস্থালী বর্জ্য সংগ্রহ করেন আবার কেউ পরিচ্ছন্নতাকর্মী। প্রতিদিন বিভিন্ন পরিমানে প্লাস্টিক সংগ্রহ করা হয়। কখনও ৩০০ কেজি কখনও আবার ৫০০ কেজিও পাওয়া যায়। মৌসুমের ওপর নির্ভর করে। এখন লিচু, আমসহ বিভিন্ন ফলের  মৌসুম। তাই কম প্লাস্টিক সংগ্রহ করা হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, এ সকল প্লাস্টিক সংগ্রহের পর আমরা ড্রাই করি। এরপর ঢাকার কামরাঙ্গীচর, ইসলামবাগ,বন্দরের ইস্পাহানীসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করা হয়।

বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক আলাদা করা হচ্ছে ঢাকা ট্রিবিউন

ডন চেম্বার এলাকার প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহকারী সমন্বয়ক তাহেরা জানান, যে কেউই চাইলে এখানে প্লাস্টিক বর্জ্য জমা দিতে পারবে। কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। যে যতটুকু প্লাস্টিক দেয় সে অনুযায়ী টাকা দিয়ে দেওয়া হয়।

এছাড়া জালুকড়ি, সিদ্ধিরগঞ্জে ১ নম্বর ওয়ার্ড ও ২ নম্বর ওয়ার্ড মিলিয়ে তিনটি বর্জ্য সংগ্রহ সেন্টার রয়েছে। এর সঙ্গে, যুক্ত রয়েছে সিটি কর্পোরেশন এলাকার আওয়াতভুক্ত ২২৮ জন গৃহস্থালী বর্জ্য সংগ্রহকারী, ১৫ জন পরিচ্ছন্নকর্মী ও ৬০ জন ডাম্পিং থেকে সংগ্রহকারীর মত ৩০০টিরও বেশি পরিবার।

জানা যায়, এ প্রকল্পে বর্জ্য সংগ্রহাকারী মডেল, পরিচ্ছন্নতাকর্মী মডেল ও ফেরিওয়ালা মডেলের মতো তিনটি মডেলের মাধ্যমে বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়। মানভেদে প্রতি কেজি সর্বোচ্চ ১৮ টাকা থেকে সর্বনিম্ন ১০ টাকা দরে এ সকল প্লাস্টিক কেনা হয়।

২০২১ সালের ২১ অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ২৭টি ওয়ার্ড থেকে প্রায় ১০০ টন প্লাস্টিক সংগ্রহ করা হয়েছে। ইতোমধ্যেই, ১১৩ জন বর্জ্য সংগ্রহকারী কর্মীকে প্লাস্টিক সংগ্রহের সময় প্লাস্টিকের ধরণ অনুযায়ী সেগুলো আলাদা করার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে।

প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৫০০ কেজি প্লাস্টিক সংগ্রহ করা হয় ঢাকা ট্রিবিউন

একই সঙ্গে, বর্জ্য থেকে প্লাস্টিক সংগ্রহকারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ১১৫ জনকে চিকিৎসা বীমার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

পযার্য়ক্রমে প্রত্যেক বর্জ্য সংগ্রহকারীকে এ বীমার আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছেন ইকো সোশ্যাল ডেভলপমেন্ট র্অগানাইজেশন (ইএসডিও) নারায়ণগঞ্জের প্রজেক্ট ম্যানেজার মাসুদ রানা।

তিনি আরও জানান, প্রতিদিন ৫টি জায়গা থেকে দেড় টন করে প্লাস্টিক সংগ্রহ করা হচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ২৯৬ জন প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহকারী রয়েছেন। যারা অর্থের বিনিময়ে প্লাস্টিক বিক্রি করেন। এর বাইরেও ৫টি বা ৬টি প্লাস্টিক জমা দিলে এক কাপ চা দেওয়া হয় কিংবা বর্জ্য ফেলার ক্ষেত্রে সচেতনতামুলক কর্মশালা আয়োজন করা হয়।

ইউএনডিপি বাংলাদেশ আবাসিক প্রতিনিধি সুদিপ্ত মুখার্জি জানান, “সারাবিশ্বে প্লাস্টিক দূষণ এখন একটি আশংকাজনক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। প্লাস্টিকের ব্যবহার নিয়ে আমাদের দ্বিতীয়বার ভাবতে হবে। অভ্যাস ও আচরণগত পরিবর্তন আনার জন্য এক্ষেত্রে একটি বড় আকারের প্রচারণা চালাতে হবে এবং প্লাস্টিক সংগ্রহ ও পুনঃচক্রায়ণ মাথায় রেখে টেকসই ব্যবসায়িক মডেল তৈরি করতে হবে। যার জন্য প্রয়োজন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মাঝে পারস্পরিক সহযোগিতা।

নারায়ণগঞ্জে ইউনিলিভার, ইউএনডিপি, এনসিসি এবং অন্যান্য অংশীদাররা একটি টেকসই ব্যবসায়িক মডেল তৈরির জন্য কাজ করছে বলে তিনি জানান।

প্রকল্প প্রসঙ্গে ইউনিলিভার বাংলাদেশের ম্যানেজার (পার্টনারশীপ এবং কমিউনিকেশনস) তৌহিদ আহমেদ জানান, প্লাস্টিক পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর । প্লাস্টিক অপচনশীল হওয়ায় হাজার বছর পরও মাটির সঙ্গে মিশে যায় না। বিশেষ করে একবার ব্যবহৃত প্লাস্টিক। এর পুনঃব্যবহার না থাকায় প্লাস্টিকগুলো নদী, নালা, খালের তলদেশ ভরাট করে ফেলছে। সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতার।

এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিভাগের প্রধান আলমগীর হিরণ জানান, নগরীকে দূষণ ও বর্জ্যমুক্ত রাখতে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন এ কার্যক্রম চলমান রেখেছে।

About

Popular Links