Monday, May 27, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

প্রধানমন্ত্রী: জনগণের ভোট কেড়ে নিয়ে ক্ষমতায় থাকতে চাই না

‘মিলিটারি ডিকটেটররা যা করেছে তার বিরুদ্ধে আমিই সংগ্রাম করেছি, আন্দোলন করেছি। জেল-জুলুম, গ্রেনেড-বোমা-গুলির সম্মুখীন আমিই হয়েছি। কিন্তু গণতন্ত্রটা করতে পেরেছি বলেই, ধারাবাহিকতা আছে’

আপডেট : ২২ জুন ২০২২, ০৫:৪৫ পিএম

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জনগণের ভোট কেড়ে নিয়ে ক্ষমতায় থাকতে চাই না। সেটা থাকবো না। মিলিটারি ডিকটেটররা যা করেছে তার বিরুদ্ধে আমিই সংগ্রাম করেছি, আন্দোলন করেছি। জেল-জুলুম, গ্রেনেড-বোমা-গুলির সম্মুখীন আমিই হয়েছি। কিন্তু গণতন্ত্রটা করতে পেরেছি বলেই, ধারাবাহিকতা আছে বলেই আজকের এ উন্নতি।

বুধবার (২২ জুন) সকাল ১১টায় নিজ কার্যালয়ের শাপলা হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।

শেখ হাসিনা বলেন, “আওয়ামী লীগ এ উপমহাদেশে প্রাচীন দলের মধ্যে অন্যতম। দলটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল একেবারে গণমানুষের মাধ্যমে। সেই সময় পাকিস্তানি সরকারের বিরুদ্ধে তাদের বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে কিন্তু আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা লাভ করে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন। আমাদের প্রতিপক্ষ যে দলগুলো আছে, তাদের জন্মস্থানটা কোথায়? মূল একটি দল আছে বিএনপি। বিএনপি প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে একজন মিলিটারি ডিকটেটরের হাতে, যে ১৫ আগস্ট জাতির পিতার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। খুনী মোশতাকের সঙ্গে যার হাত মেলানো ছিল। মোশতাক যাকে সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল ১৫ আগস্টে জাতির জনককে হত্যার পর। সে যখন নিজেকেই নিজে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা দিয়ে ক্ষমতা দখল করে তখনকার প্রেসিডেন্ট সায়েম সাহেব তাকে সরিয়ে দিয়ে নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে দিয়ে ক্ষমতা দখল করে। সংবিধান লঙ্ঘন করে, মার্শাল ল জারি করে।”

তিনি আরও বলেন, “সংবিধান লঙ্ঘন করে, মার্শাল ল জারি করে যে ক্ষমতা দখল করে প্রথমে তো তার মিলিটারি উর্দি পরেই একাধারে সেনা প্রধান, একাধারে রাষ্ট্রপতি। ঠিক আইয়ুব খান যা করেছিল, সেই পদাঙ্ক অনুসরণ করল। বাংলাদেশে ১৯টি ক্যু হয়। প্রতি রাতে কারফিউ। কিন্তু আমাদের অনেকেই ঝাঁপিয়ে পড়ল তিনি গণতন্ত্র দিয়েছেন। আমি বলতাম এটা কারফিউ গণতন্ত্র। তার হাতে তৈরি করা হলো বিএনপি। অর্থাৎ ক্ষমতায় থেকে প্রথমে হ্যাঁ-না ভোট, সেই ভোট কেমন হয়েছিল? না ভোটের পাত্তাও ছিল না, সব হ্যাঁ। এরপর এলো রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। সেটাও একটা নির্বাচনের খেলা। তারপর এলো ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচন। সেখনেও দল ভাঙা-গড়া, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীর থেকে একে ওকে নিয়ে মানে এ-গাছের ছাল, ও-গাছের বাকল সব দিয়ে জোড়া দেওয়া। মানে ক্ষমতায় বসে একটা দল তৈরি করা। সেই দলটাই পরবর্তীতে হয়ে গেছে মূল দল।”

আরেক রাজনৈতিক দল জাতীয় পার্টিকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “পরবর্তীতে আরেকটা দল জাতীয় পার্টি ওইভাবেই তৈরি। আরেক মিলিটারি ডিকটেটর ক্ষমতায় বসে জাতীয় পার্টি করেছে। যে দলগুলো তৃণমূল থেকে উঠে আসেনি, সেই দলগুলোর কাছে আপনারা কী আশা করেন? তারপর আবার দলের নেতৃত্বটা কার হাতে? কে নেতা? এতিমের অর্থ আত্মসাৎ এবং দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত একজন আসামি, আরেকজন ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলা, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলাসহ দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি। একজন তো ফিউজিটিভ, আরেকজনকে অবশ্য আমি আমার এক্সিকিউটিভ অথরিটিতে তার সাজা স্থগিত করে বাসায় থাকার সুযোগটা দিয়েছি বয়সের কথা বিবেচনা করে।”

২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কথা স্মৃতিচারণা করে শেখ হাসিনা বলেন, “আপনারা কীভাবে বলেন নির্বাচনে কোনো দল অংশগ্রহণ করেনি! ২০১৮ সালের নির্বাচনে আসেন, বিএনপি একেকটা সিটে কয়জনকে নমিনেশন (মনোনয়ন) দিয়েছিল? এক আসনে সকালে একজনকে দেয়, দুপুরে সেটা পরিবর্তন হয়ে আরেকজন হয়। তারপর তৃতীয় দফায় আরেকজনের নাম দেয়। অর্থাৎ যে যত বেশি টাকা দিচ্ছে তাকে নমিনেশন দিয়ে দিচ্ছে। এই অবস্থায় একটা দল নির্বাচনে যখন তাদের প্রার্থী দেয়; ঢাকা থেকে এক নেতা তাদের একজনকে দিচ্ছে তো লন্ডন থেকে আরেকজন দিচ্ছে। দিনে যদি তিনবার আপনার নমিনেশন বদলান, তারপর দেখা গেল মাঝখানে নির্বাচন ছেড়ে চলে গেল। এটা কি অস্বীকার করতে পারবে বিএনপি? তাহলে এটা পার্টিশিপেটরি ইলেকশন হয়নি এ কথা কীভাবে বলে? আর যখন আপনি নির্বাচনের মাঠ ছেড়ে মধ্য পথে চলে যান তখন তো মাঠ ফাঁকা। তখন পাবলিকের যা খুশি তাই করতে পারে। সে দোষটা কাকে দেবেন? এটা তো আওয়ামী লীগকে দিতে পারেন না।”

তিনি আরও বলেন, “এ বাস্তবতা সবাই ভুলে যায়। একটা মিথ্যা আপনি বারবার বলতে পারেন, সত্যের শক্তিটা একবার। সত্যটা একবারই বলতে পারেন। আমাদের এখানে অনেকেই আছে বা বিদেশেও তাদের কাছে অপপ্রচার করা হয় যে পার্টিশিপেটরি না। একটা দল অংশগ্রহণ করবে নির্বাচনে তখনই, মানুষের আস্থা-বিশ্বাস অর্জন তখনই তাকে দেখাতে হবে সেই দল নির্বাচন করে জয়ী হলে কে হবে সরকার প্রধান। এটা তো মানুষ আগে বিবেচনা করে। এটা শুধু আমাদের দেশে না, পৃথিবীর সব দেশেই। তারা যে নির্বাচন করবে কাকে দেখাবে, সাজাপ্রাপ্ত ফিউজিটিভকে? আর সে তো এ দেশের নাগরিকত্ব বাতিল করে দিয়ে এখন যুক্তরাজ্যের নাগরিক হয়ে বসে আছে। কত টাকা বিনিয়োগ করলে সহজে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব পাওয়া যায়। একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামি হয়েও কীভাবে যুক্তরাজ্যের নাগরিক হলো সেটা একটু খোঁজ করবেন? সেটা আপনারা করেন না। এই নিয়ে তারা কী নির্বাচন করবে সেটাই তো বড় কথা। এখানে গণতন্ত্রের দোষটা কোথায়? আরেকটা দলেরও সেই তথৈবচ অবস্থা। তাদেরও তো ঠিক সাংগঠনিক তৎপরতা নেই।”

বাম দল প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বাকি ছিল বাম দলগুলো। তারা তো ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র হতে হতে দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলন-দাঁড়ি বসবে না কমা বসবে, কমা বসবে না সেমিকোলন- এই করতে করতে ভাঙতে ভাঙতে তাদের ওই অবস্থা। তারা এখন বাম হয়ে কখনও ডানে কাত হয়-কখনও বামে কাত হয়। তাদের তো এই অবস্থা। আছে কে আমাকে সেটা বলেন না? একটা ভালো শক্তিশালী দল করে দেন, মাঠে দেখা হবে। মাঠে আমরা দেখবো প্রতিযোগিতায় জনগণ যাকে চায়।”

তিনি আরও বলেন, “আমার কথা একটাই স্পষ্ট- একটা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ অনেক থাকে। কিন্তু ও রকম সুযোগ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তো আমি হইনি কখনও! ১৯৯১ সালেও হতে পারতাম। যখন জাস্টিস (বিচারপতি) সাহাবুদ্দিন সাহেব আমাদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান। তিনি যখন আমাকে ডেকে বলেছিলেন, জামায়াত এবং জাতীয় পার্টি, আওয়ামী লীগ মেজরিটি আপনি সরকার গঠন করেন, আমি মাফ চেয়ে চলে এসেছিলাম। না, আমি এভাবে ক্ষমতায় যাব না। আমি যখন আসন পাইনি তখন যাব না। আমি যাব তখনই যখন আমার কাছে অ্যাবসুলেট পাওয়ার থাকবে। অর্থাৎ আমার ক্ষমতার ইচ্ছা হলো আমার দেশের উন্নতি করা। আর সেটা কি আমি প্রমাণ করিনি? আপনারা বলেন। বাংলাদেশের ১৩ বছর আগের চেহারাটা চিন্তা করেন। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত যেটুকু করেছি সেটা তো ভিত্তি তৈরি করে দিয়ে গিয়েছিলাম। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত দুর্নীতিতে বাংলাদেশ ৫ বার চ্যাম্পিয়ন। লুটপাট-দুর্নীতি-সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ-বাংলা ভাই কী না হয়েছে তখন। তারপর এলো ইমার্জেন্সি (জরুরি অবস্থা)। এই ৮টা বছর তো নষ্ট হলো জাতির জীবন থেকে। আমাকে আসতে দেওয়া হলো না।”

শেখ হাসিনা বলেন, “আমি আসতে পারতাম ক্ষমতায়, সেটা আপনাদের মনে রাখা উচিত। আমাকে যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন বলেছিল, আমেরিকায় এনার্জি মিনিস্টার এসেছিল এখানে। আমাকে প্রস্তাব দিয়েছিল এবং ভারতেরও প্রস্তাব ছিল, আমাদের যে গ্যাস এক্সপ্লোরেশন হচ্ছে...বিভিন্ন মার্কিন প্রতিষ্ঠান...আমাদের সময় বেশি এসেছে তখন- তাদের প্রস্তাব ছিল গ্যাস বিক্রি করতে হবে। আমেরিকান কোম্পানি গ্যাস উত্তোলন করবে আর ভারতের কাছে গ্যাস বিক্রি করতে হবে। আমার কথা ছিল স্পষ্ট, গ্যাসের মালিক দেশের জনগণ। আমার দেশের চাহিদা পূরণ হওয়ার পর ৫০ বছরের রিজার্ভ থাকবে। তারপর যদি অতিরিক্ত হয় আমি বিক্রি করব। এটাই তো আমার অপরাধ ছিল, দেশের সম্পদ আমি রক্ষা করতে চেয়েছিলাম? আর সেই কারণে ২০০১ সালে আমাকে ক্ষমতায় আসতে দেওয়া হয়নি। কারণ এই দুই দেশের সম্মিলিত শক্তি আর আমাদের দেশের মানুষ তো বিদেশি দেখলে এমনি হুমড়ি খেয়ে পড়ে। তাদের পদতলেই যেন বেহেশত। এ রকম একটা মানসিকতা।”

২০০১ সালের সেই সময়ের কথা মনে করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “তখন লতিফুর রহমান ছিলেন আমাদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান। ব্যারিস্টার ইশতিয়াক সাহেব থেকে শুরু করে ড. কামাল হোসেন, সাহাবুদ্দিন সাহেবসহ সবাই মিলেই তখন লেগে গেলেন পেছনে। কিছুতেই শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় আসতে দেওয়া যাবে না। কারণ আমি এত বড় একটা দেশে এত বড় একটা বেয়াদবি করে ফেলেছি; আমার দেশের গ্যাস আমি বিক্রি করব না বলে দিয়েছি। আমাকে যুক্তরাষ্ট্র দাওয়াত দিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। সেখানেও এই প্রস্তাব, আমি একই কথা বলেছি। যেনতেনভাবে প্রধানমন্ত্রী হওয়া আমার লক্ষ্য না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় যখন আমাকে গ্রেপ্তার করা হলো, তখন আমাকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল আপনি নির্বাচন করবেন না, আপনাকে প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদা দেওয়া হবে। আমি বলেছিলাম, এ মর্যাদা তো আমি চাই না। যে ব্রিগেডিয়ার আমার কাছে গিয়েছিলেন তাকে আমি বলেছিলাম, আপনার সেনাপ্রধানকে বলে দিয়েন ১৯৫৪ সালে তার জন্ম, আমার বাবা সেই সময়ে মন্ত্রী ছিল। আমরা মন্ত্রীর মেয়ে ছিলাম। কাজে ক্ষমতার লোভ আমাকে দেখিয়ে লাভ নেই।”

বিশ্বব্যাংক বিষয়ক এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, “প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বব্যাংকের ক্ষেত্রে একটা কথা বলবো- নিজের ভাড় ভালো না তো গোয়ালার ঘিয়ের দোষ দিয়ে লাভ কী! তারা বন্ধ করল কাদের প্ররোচনায়? সেটা তো আমার দেশেরই কিছু মানুষের প্ররোচনায়।”

তিনি বলেন, “বিশ্বব্যাংকের আমরা কিন্তু অংশীদার। তারা কিন্তু কোনো অনুদান দেয় না। আমরা ঋণ নিই। যে টাকাটা বাংলাদেশের অনুকূলে বরাদ্দ হবে সেটা টাকাটা নষ্ট করার কোনো অধিকার তাদের নেই। হয়তো পদ্মা সেতু থেকে তারা টাকা বন্ধ করেছে, টাকা কিন্তু আমরা উদ্ধার করতে পেরেছি। এই টাকা অন্যান্য প্রকল্পে ব্যবহার করতে পেরেছি। এটা কিন্তু করা যায়। আমাদের অনেকে জানে না, আমি জানি না কেন জানে না। এরা কোনো দাতা না, আমি তাদের কাছে ভিক্ষা নিই না। ব্যাংকের একটা অংশীদার হিসেবে আমরা ঋণ নিই এবং সুদসহ আমরা সেই ঋণ পরিশোধ করি। ওইটুকু সুবিধা স্বল্প সুদে। আমরা কারো করুণা ভিক্ষা নিই না।”

About

Popular Links