Thursday, May 30, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

সমিতির অভাব নেই, নির্যাতিত শিক্ষকরা পাশে পান না কাউকেই

‘অনেক সমিতিই আছে যারা দলীয় স্লোগান দিয়ে ব্যক্তি এবং গোষ্ঠীর স্বার্থে কাজ করে। শিক্ষক নেতারা যদি রাজনীতি করেন, দলীয় স্লোগান দেন, দালালি করেন, তাহলে তো তাদের নৈতিক অবস্থান এমনিতেই দুর্বল হয়ে যায়’

আপডেট : ০২ জুলাই ২০২২, ০১:১৪ পিএম

দেশে বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের ২০০-এর বেশি সমিতি আছে। শিক্ষকদের ওপর হামলা-নির্যাতনের প্রতিবাদ, দোষীদের আইনের আওতায় আনার বিষয়ে তারা কতটা তৎপর?

সব পর্যায়ের শিক্ষক নেতাদের সঙ্গে কথা বলে যে বিষয়গুলো স্পষ্ট হয়েছে, তা হলো- এই সমিতিগুলো দলীয় রাজনীতির কারণে বিভক্ত। নেতারা নানা স্বার্থ নিয়ে ঘোরেন। পদ,পদবি, পদোন্নতিসহ নানা বিষয় নিয়ে তারা ব্যস্ত থাকেন। তাই শিক্ষক সমিতিগুলো শিক্ষকদের বিষয় নিয়ে কাজ করার তেমন সময় পায় না।

আরেকটি বিষয় হলো, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক নির্যাতনের শিকার হলে অন্য পর্যায়ের শিক্ষক নেতারা প্রতিবাদের ভারও প্রাথমিক শিক্ষকদের ওপরই ছেড়ে দেন। মাধ্যমিকের ক্ষেত্রেও অন্যরা একই রকম চিন্তা করেন। কোনো মাদ্রাসা শিক্ষক নির্যাতনের শিকার হলে বাকিদের তা নিয়ে তেমন আগ্রহই দেখা যায় না।

তবে সবার কথা হলো, “শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ম্যানেজিং কমিটি ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের হাতে জিম্মি। তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গেলে চাকরিই তো থাকে না। তারপর প্রতিবাদী হলে তো আরও বিপদ।”

প্রাথমিক শিক্ষকদের সবচেয়ে বড় সংগঠন বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি। সমিতির সভাপতি মো. আবুল কাশেম বলেন, “শিক্ষকদের ওপর কোনো অন্যায় হলে প্রতিবাদ হয়। কিন্তু সেই প্রতিবাদটা জোরালো নয়। এর কারণ শিক্ষকদের সব সংগঠন প্রতিবাদ করে না। শিক্ষক সে প্রাইমারি, হাইস্কুল বা মাদ্রাসা যে প্রতিষ্ঠানেরই শিক্ষক হোক না কেন, সে শিক্ষক। সেটাই তার পরিচয়। কিন্তু দেখা যায়, প্রাইমারির কোনো শিক্ষক নির্যাতনের শিকার হলে অন্যরা সেটা নিয়ে কথা বলে না। মাদ্রাসা শিক্ষক লাঞ্ছিত হলে অন্যরা মনে করেন, সে তো মাদ্রাসা শিক্ষক। আমাদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের কোনো সময় প্রতিবাদ করতে দেখি না। সবাই মিলে প্রতিবাদ করলে এই পরিস্থিতি হতো না।”

তিনি মনে করেন, এখন শিক্ষকদের যে ২০০-এর বেশি সংগঠন আছে, সেগুলোর মধ্যে অনেকগুলো ব্যক্তি ও গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক স্বার্থে কাজ করে।

মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষকদের সংগঠন স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ শাহজাহান আলম সাজু বলেন, “শিক্ষকরা যে কার্যকর প্রতিবাদ করছেন না, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা এখন ম্যানেজিং কমিটির হাতে জিম্মি।”

তিনি আরও বলেন, “কমিটিগুলো দলীয় নেতা এবং এমন লোকের হাতে চলে গেছে, যাদের সুশিক্ষিত বলা যাবে না। তাদের পেশি শক্তি, রাজনৈতিক শক্তি সবই আছে। ফলে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে শিক্ষক বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানরা যেতে পারেন না। নড়াইলে পুলিশ ও প্রশাসনের সামনেই শিক্ষকের গলায় জুতার মালা পরানো হলো। তারা কোনো ব্যবস্থা নিলেন না। তাদের ছত্রছায়ায়ই ঘটনা ঘটলো। এতেই বোঝা যায়, প্রশাসন ও পুলিশের কর্মকর্তারা শিক্ষকদের কী চোখে দেখেন।”

তার কথা, “রাষ্ট্রীয়ভাবেও শিক্ষকরা অবহেলিত ও বৈষম্যের শিকার। তারই প্রতিফলন এখন আমরা স্থানীয় পর্যায়ে দেখতে পাচ্ছি।”

তিনি আরেক প্রশ্নের জবাবে বলেন, “আশুলিয়ায় শিক্ষক হত্যার পর আমরা সেখানে গিয়েছি। প্রতিবাদ সমাবেশ করেছি। নারায়ণগঞ্জে শ্যামল কান্তিকে কান ধরে উঠবসের ঘটনার পরও আমরা সেখানে গিয়েছি। নড়াইলে জুতার মালা পরানোর পরও আমরা গিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছি।”

বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সভাপতি মো. নজরুল ইসলাম রনি বলেন, “ম্যানেজিং কমিটির কারণে আমি নিজেও ক্ষতিগ্রস্ত। আমাকে আমার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ম্যানেজিং কমিটি খড়গের মতো। শিক্ষক শ্যামল কান্তিকে কান ধরে উঠবস করানো হয়েছে একজন প্রভাবশালী সংসদ সদস্যের সামনে। ভয়ে শিক্ষকরা প্রতিবাদ করতে পারেনি। আশুলিয়ায় নিহত শিক্ষককে হত্যার উদ্দেশ্যে যখন পিটানো হয়, তখন আরেকজন শিক্ষক ওই ছাত্রকে জাপটে ধরেছিল। কিন্তু ম্যানেজিং কমিটির সভাপতিসহ আরও অনেকে তার আত্মীয় হওয়ায় তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।”

তবে শিক্ষকের মর্যাদাহানির ঘটনায় সমিতিগুলোর খুব বেশি প্রতিবাদমুখর না হওয়ার কারণ হিসেবে রাজনীতিকেও দুষেছেন তিনি। তিনি বলেন, “শিক্ষকরাও এখন দলীয়ভাবে বিভক্ত। অনেক সমিতিই আছে যারা দলীয় স্লোগান দিয়ে ব্যক্তি এবং গোষ্ঠীর স্বার্থে কাজ করে। শিক্ষক নেতারা যদি রাজনীতি করেন, দলীয় স্লোগান দেন, দালালি করেন, তাহলে তো তাদের নৈতিক অবস্থান এমনিতেই দুর্বল হয়ে যায়।”

আশুলিয়ায়  শিক্ষক নিহত হওয়ার পর এই সংগঠনের নেতারা কেউ সেখানে যাননি বা নিহত শিক্ষক উৎপল সরকারের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেননি। তারা নড়াইলেও যাননি। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সভাপতি মো. নজরুল ইসলাম রনি বলেন, “শ্যামল কান্তিসহ অন্য শিক্ষক নির্যাতনের ঘটনায় আমরা গিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছি। তবে পুলিশ বা প্রশাসন আমাদের প্রতিবাদকে তেমন গুরুত্ব দেয় না, আমলে নেয় না। তারা প্রভাবশালীদের কথায় কাজ করে।”

মাদ্রাসা শিক্ষকদের সংগঠন বাংলাদেশ জামিয়াতুল মোদারেসিনের মহাসচিব অধ্যক্ষ মাওলানা সাব্বির আহমেদ মমতাজি মনে করেন, “শিক্ষকদের মূল কাজ ছাত্রদের পড়াশোনা করানো। সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কেউ কেউ এই মূল কাজ বাদ দিয়ে ব্যক্তি স্বার্থে নানা সমিতি করে, রাজনীতি করে। এটা ঠিক না। শিক্ষক নির্যাতনের প্রতিবাদ যে হয়না তা নয়। তবে যত সমিতি তত প্রতিবাদ দেখি না।”

শিক্ষকদের সবচেয়ে প্রভাবশালী সংগঠন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ফেডারেশনের মহাসচিব ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক নিজামুল হক ভুঁইয়ার কাছে প্রশ্ন ছিল, “আশুলিয়ায় শিক্ষক নিহত হওয়ার পর আপনারা কী করেছেন?” জবাবে তিনি বলেছেন, “আমরা একটি স্টেটমেন্ট দিয়েছি।”

শিক্ষক সংগঠনগুলো বাস্তবে এখন বিবৃতি এবং ফেসবুক প্রতিবাদেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। শিক্ষক নেতারা এজন্য সামাজিক অবক্ষয় এবং রাষ্ট্রের উদাসীনতাকে দায়ী করেন।

অধ্যাপক নিজামুল হক ভুঁইয়া বলেন, “শিক্ষক শ্যামল কান্তিকে কান ধরে উঠবস করিয়েছেন একজন সংসদ সদস্য। তার কোনো বিচার হয়নি। ফলে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। একজন শিক্ষককে লাঞ্ছনাকারী যতই প্রভাবশালী হোক, রাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে না?”

About

Popular Links