Tuesday, May 21, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে দ্রুত বাড়ছে সৌর বিদ্যুতের ভূমিকা

সরকার ২০২১ সালে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে মোট বিদ্যুতের ১০% উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও এখন পর্যন্ত মোট বিদ্যুতের ৩.৫% উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২২, ০১:০৯ পিএম

সারাদেশে ছোট ছোট ইউনিটে সোলার হোম সিস্টেম চালু করার মাধ্যমে ১৯৯৬ সাল থেকে সৌরশক্তিতে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। কার্যকরী এ উদ্যোগের জন্য সরকার ও বেসরকারি উভয় খাতই কৃতিত্বের দাবিদার। বর্তমানে সারাদেশে সোলার হোম সিস্টেম ইউনিটের সংখ্যা ৬ কোটি ৩৭ হাজার ৬০১টি।

টেকসই এবং নবায়নযোগ্য শক্তি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুসারে, সোলার হোম সিস্টেম, সেচ এবং রুফটপ ইউনিট, রাস্তার বাতি আর সৌরবিদ্যুৎ চালিত টেলিকম বিটিএস থেকে অফ গ্রিডে উৎপাদিত বিদ্যুতের পরিমাণ ৩৫১ মেগাওয়াট।

দেশের ২ হাজার ৫৯২টি সৌর সেচ ইউনিট থেকে ৪৮.১৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। সেই সঙ্গে রাস্তার ২ লাখ ৯৬ হাজার ৮৬১টি বাতি থেকে উৎপাদন হয় ১৭.০৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এছাড়া, নেট মিটারিং ব্যতীত ১১৫টি রুফটপ ইউনিট এবং ১ হাজার ৯৩৩টি সৌরবিদ্যুৎ চালিত টেলিকম বিটিএস থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের পরিমাণ যথাক্রমে ১৪.২০ এবং ৮.০৬ মেগাওয়াট।

বিগত কয়েক বছরে দেশি-বিদেশি অনেক বিনিয়োগকারীই বড় আকারের সোলার প্ল্যান্ট স্থাপনে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এ সময়ে ৮টি সোলার পার্ক স্থাপন করা হয়েছে, বর্তমানে যেগুলো থেকে প্রতিদিন জাতীয় গ্রিডে প্রায় ১৮০-২৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত করছে।

দেশ-বিদেশে বিভিন্ন পক্ষ প্রতিনিয়ত নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকতে আহ্বান করলেও সেদিকে বাংলাদেশের আগ্রহ তুলনামূলক কম।

এর আগে, ২০২১ সালে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে মোট বিদ্যুতের ১০% উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল সরকার। তবে এখন পর্যন্ত মোট বিদ্যুতের ৩.৫% উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। নতুন করে ২০৪০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে মোট বিদ্যুতের ৪০% উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

টেকসই এবং নবায়নযোগ্য শক্তি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, গত ১০ বছরে সরকার প্রায় ৫০টি গ্রিড-সংযুক্ত বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প হাতে নিলেও তাতে সাফল্যের হার প্রায় ১৫%।

২০২০ সালে সৌর বিদ্যুতের মাধ্যমে ৩৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়, ২০২২ সালে যা কি-না ২৩০ মেগাওয়াট।

অন্যদিকে, জাতীয় গ্রিডে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে সৌর বিদ্যুতের মাধ্যমে ৩৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। তিনটি বায়ুচালিত কেন্দ্র থেকে মাত্র ২.৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়।

এছাড়া, বায়োগ্যাস- এবং বায়োমাস থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের পরিমাণ মাত্র ১ মেগাওয়াটের সামান্য বেশি, যা মোটেই আশাব্যঞ্জক নয়।

বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (বিপিডিবি), টেকসই এবং নবায়নযোগ্য শক্তি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানিসহ (আইডকল) সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো প্রাকৃতিক জ্বালানিতে বিনিয়োগের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে।  

প্রধান বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনা

ওরিয়ন গ্রুপের এনারগন রিনিউয়েবলের মাধ্যমে দেশের বৃহত্তম সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালিত হয়। সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি গত বছরের ডিসেম্বরে জাতীয় গ্রিডে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করে। বিপিডিবি প্ল্যান্ট থেকে ইউনিটপ্রতি ১২ টাকা ২৭ পয়সা দরে বিদ্যুৎ কিনছে।

১,৮৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩৫০ একর জমির ওপর নির্মিত বিশালাকার সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি সুন্দরবনের কাছাকাছি অবস্থিত। প্রতিষ্ঠানটি এর আগে সেখানে ৬৬০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিল।

সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনাকারী অন্যান্য প্রধান প্রতিষ্ঠান হলো হেতাত-ডিট্রোলিক এবং আইএফডিসি সোলার (ময়মনসিংহে ৫০ মেগাওয়াট), স্পেক্ট্রা ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড এবং শানফেং ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড  (মানিকগঞ্জে ৩৫ মেগাওয়াট) জুলস পাওয়ার লিমিটেড (কক্সবাজারে ২০ মেগাওয়াট), এবং প্যারাসল এনার্জি লিমিটেড (পঞ্চগড়ে ৮ মেগাওয়াট)।

২০১৭ সালে জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে বাণিজ্যিকভাবে চালু হওয়া ৩.২৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি দেশের প্রথম গ্রিড-যুক্ত সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র।

এদিকে, গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর খুলনার তেরখাদায় ৫০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব অনুমোদন দেয় সরকার। হিরো ফিউচার এনার্জি এশিয়া পিটিই লিমিটেড, সিঙ্গাপুর এবং বিজনেস রিসার্চ ইন্টারন্যাশনাল কর্পোরেশন ইনক (ব্রিক), পানামার যৌথ উদ্যোগে প্রায় ১৩৮০.৯০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে, যার ট্যারিফ হবে প্রায় ৮ টাকা ২০ পয়সা।

টেকসই শক্তির দিকে এগিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষার লক্ষ্যে বেশ কিছু স্থানীয় ব্যবসায়িক গোষ্ঠী একাধিক ছোট সোলার ইউনিট স্থাপনের মাধ্যমে প্রতিযোগিতায় যোগ দিয়েছে।

নিজেদের ৭টি সহযোগী সংস্থার অব্যবহৃত জমি এবং কারখানার ছাদে কাজী ফার্মস লিমিটেড সোলার প্ল্যান্ট স্থাপন করেছে, যা প্রায় ৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। নেট মিটারের মাধ্যমে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডে বিতরণ করা হয়।

বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প নিয়ে ভাবনা

সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে আপাতত সাফল্য না এলেও বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ভবিষ্যত খারাপ না।

গত কয়েক বছরে সরকার নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস থেকে আরও বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বিলিয়ন ডলারের চুক্তির বিষয়ে আলোচনা করছে। সেই সঙ্গে কয়েকটি মেগা প্রকল্পের কাজ চলছে।

প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বাংলাদেশকে জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি করতে হয়। গত কয়েক বছর ধরে বিশ্ববাজারে জীবাশ্ম জ্বালানির দাম বেডেছে। তাই অনেক বেসরকারি সংস্থাই নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে মেগা প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে আসছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবাশ্ম জ্বালানি দ্বারা পরিচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় প্রাকৃতিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্পগুলো সাশ্রয়ী এবং ঝামেলাবিহীন। প্রাকৃতিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য জ্বালানির প্রয়োজন হয় না এবং কোনো ক্ষতিকারক গ্যাস নির্গত হয় না।

তবে নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কিছু সমস্যাও রয়েছে। বায়ু টারবাইনের কারণে শব্দ দূষণের সৃষ্টি হয় এবং বেগ অনুয়ায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে না। অন্যদিকে, বড় সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য চরের জমির মতো বিস্তীর্ণ এলাকাও প্রয়োজন।

About

Popular Links