Monday, May 27, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

ঢাকা-গুয়াংজু রুট: প্রথম ফ্লাইটের টিকিট বিক্রিতে নিয়ম লঙ্ঘন

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের আগে স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্স এবং দুটি চীনা এয়ারলাইন্স ওই রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করত

আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০২২, ১২:৫৩ পিএম

শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীদের সুবিধার্থে গত ১৮ আগস্ট ঢাকা থেকে চীনের গুয়াংজু রুটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট চলাচল শুরু হয়। তবে নিজেদের প্রিয় ট্রাভেল এজেন্সিকে টিকিট বিক্রিতে সহায়তা করার মাধ্যমে নিয়ম লঙ্ঘন করে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থাটি।

বিতর্ক সৃষ্টির পাশাপাশি এটি টিকিট মূল্যের কারসাজিতে জড়িত একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটকেও সামনে এনেছে। এ কারণে “টেকঅফ ট্রাভেলস” থেকে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার জন্য বিমানের কর্মকর্তাদের বহিষ্কার ও গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে ট্রাভেল এজেন্ট এবং রিক্রুটিংএজেন্সির নেতারা।

তাদের অভিযোগ, গত বছর মধ্যপ্রাচ্যগামী ফ্লাইটের টিকিটের দাম ৩৫ হাজার টাকা থাকলেও একই সিন্ডিকেট সেটিকে  বাড়িয়ে ১ লাখ টাকা করেছে। কিন্তু তাদের কোনো জবাবদিহি করতে হয়নি।

৩০০ আসন বিশিষ্ট বোয়িং-৭৭৭ ফ্লাইটটি ১৭৭ জন যাত্রী নিয়ে  গত বৃহস্পতিবার ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে যাত্রা করে। তবে টেকঅফ ট্রাভেলসের মাধ্যমে সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধ করে ২২৯ জন যাত্রী টিকিট কেটেছিল।

বিক্রিত ১৭৫টি টিকিট থেকে অর্জিত অর্থ বুঝিয়ে দেওয়ার আগে এজেন্ট নিজের ভাগের ৭% কমিশন কেটে রাখে। এরপর বিমানের কর্মকর্তারা যাত্রীদের টিকিট নিয়ে কনফার্মেশন দেন। তবে ২০টি টিকিট অবিক্রিত ছিল।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মুখপাত্র তাহেরা খন্দকার বলেন, তারা নিজেরাই ছেড়ে যাওয়া ফ্লাইটের সব টিকিট দিয়েছে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের আগে স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্স এবং দুটি চীনা এয়ারলাইন্স ওই রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করত। ইউএস বাংলা ইতোমধ্যে ৬ মাসের অগ্রিম টিকিট বুক করে নিয়েছে।

অন্যদিকে, ইউএস বাংলা গ্রুপ অনুমোাদিত সংস্থা গত ৮ আগস্ট ওয়েচ্যাটে এবং ১০ আগস্ট ফেসবুক পেজে ওই রুটের জন্য বিমানের টিকিটের সঙ্গে প্রচারমূলক অফার দেয়।

গত ১৬ আগস্ট একটি বিবৃতিতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স জানায়, যাত্রীরা বিমানের যেকোনো বিক্রয়কেন্দ্র থেকে টিকিট কিনতে পারবেন। ফিরতি যাত্রীরাও www.biman-airlines.com ওয়েবসাইট বা বিমান-অনুমোদিত ট্রাভেল এজেন্সিতে ফ্লাইট বুক করতে পারবেন। অ্যাসোসিয়েশনের ভাষ্যমতে, এই ধরনের টিকিটিং এজেন্টের সংখ্যা ৫০০টিরও বেশি।

বিমানের টিকিট বুকিং এবং ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন (আইএটিএ) নীতিমালা অনুযায়ী, বিমান কোনো একক এজেন্টকে তার টিকিট বিক্রি করার অনুমতি দিতে পারে না, বিশেষ করে প্রথম ফ্লাইটের ক্ষেত্রে এটি একদমই নিষিদ্ধ। তাছাড়া, কোনো এজেন্সিকে একতরফা ও অনানুষ্ঠানিকভাবে টিকিট বিক্রির অনুমতি দেওয়া রীতিমত কালোবাজারে টিকিট বিক্রির সমতুল্য।

বিমানের বিপণন ও বিক্রয় অধিদপ্তরের (এমএসডি) বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, প্রতি টিকিটের জন্য ৭% কমিশনের ভাগের শর্তে বিভাগের কিছু শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে মৌখিক চুক্তির মাধ্যমে টেকঅফ ট্রাভেলস  অবৈধভাবে কাজটি পেয়েছে। এর অর্ধেক টাকা গিয়েছে সিন্ডিকেটের বিমানের কর্মকর্তাদের পকেটে।

ফ্লাইটের ইকোনমি ক্লাসের বিভিন্ন টিকিটের দাম ১,৬০০, ১,৮০০ এবং ২,০০০ ডলার এবং বিজনেস ক্লাসের বিভিন্ন টিকিটের মূল্য ৩,৫০০ আর ৩,৮০০ ডলার নির্ধারণ করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। দেশফেরত ফ্লাইটের জন্য ইকোনমি আর বিজনেস ক্লাসের টিকিটের মূল্য ৪২,৫২১ টাকা এবং বিজনেস ক্লাসের জন্য ১,১১,৩২৪ টাকা নির্ধারিত হয়েছে।

ইউএস বাংলা গ্রুপের সঙ্গে সংযুক্ত অন্যতম টিকিটিং এজেন্সি হিসেবে ২০১৬ সালে নিজেদের কার্যক্রম শুরু করে টেকঅফ ট্রাভেলস। টেকঅফ ট্রাভেলসের ম্যানেজার আতাহারুল ইসলাম জানান, অন্য দুটি টিকিটিং এজেন্সি হলো ট্রিপলোভার এবং ট্রাভেল জেম।

তবে টেকঅফ ট্রাভেলসের সঙ্গে ঢাকা ট্রিবিউনের যোগাযোগ হলে গ্রুপের মুখপাত্র কামরুল ইসলাম দাবি করেন, “টেকঅফ ট্রাভেলস ইউএস বাংলা গ্রুপের মালিকানাধীন নয়। কিন্তু এজেন্সির কাছে আমাদের এয়ারলাইন টিকিট বিক্রির অনুমতি আছে।”

যোগসাজশের ইস্যু

বিমান এবং টেকঅফ ট্রাভেলসের অসাধু কর্মকর্তাদের নিয়মকানুন ভঙ্গের জন্য সবাই নিন্দা করলেও অভিযুক্ত ব্যক্তিরা সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নিতে নারাজ।

আতাহারুল ইসলাম ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সঙ্গে আমাদের চুক্তি হয়েছে। আমরা ঢাকা-গুয়াংজু রুটের ৩০০ টিকিটের মধ্যে ২০০টির কাছাকাছি টিকিট বিক্রি করার অনুমতি পেয়েছি। আমাদের কাছ থেকে ১৬৫ জন চীনা নাগরিক এবং ১০ জন বাংলাদেশি তাদের একমুখী টিকিট নিয়েছেন। এই রুটে বিমানের কোনো যাত্রী ছিল না।”

তবে টেকঅফ ট্রাভেলসকে প্রথম ফ্লাইটের টিকিট বিক্রির অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বিমানের এমএসডির জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন বলেন, “শুধু টেকঅফ ট্রাভেলস নয়, আরও কিছু এজেন্সিও আমাদের হাতে নগদ অর্থ দিয়ে বিমানের টিকিট বিক্রি করেছে। এর জন্য আমাদের মতিঝিল জেলা কার্যালয় দায়ী।”

গত সপ্তাহে তিনি ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “যাত্রীর টিকিটে এজেন্সির নাম লেখা থাকবে না। তাই কোন এজেন্সি আমাদের টিকিট বিক্রি করছে সেটি নিয়ে আমরা মাথা ঘামাইনি। আমাদের কাজ হল টিকিট বিক্রি করা।” 

পক্ষপাতিত্বের বিরুদ্ধে ক্ষোভ

অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশের (আটব) মহাসচিব আবদুস সালাম আরেফ ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “কালোবাজারি প্রচারে বিমান কোনো অসম বা বেআইনি চুক্তি করতে পারবে না। বিমান কর্তৃপক্ষ এবার কোনো কঠোর ব্যবস্থা না নিলে দেশের টিকিট সংস্থাগুলো সব রুটে টিকিট বিক্রি বন্ধ করে দেবে।"

তিনি আরও বলেন, “এটা একদমই মেনে নেওয়া যায় না। কোভিড সংক্রান্ত সমস্যার কারণে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করার পর বিমান কোনো এজেন্সির মাধ্যমে টিকিট বিক্রি করতে পারবে না। এটা তদন্ত করা উচিত।”

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আটাবের আরেক নেতা বলেন, টিকিট সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে আছেন জিএম সালাহউদ্দিন। তিনি ৭ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিমানের এমএসডির প্রধান ছিলেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিমানের এমএসডি-এর একাধিক কর্মকর্তা ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, পুরো প্রক্রিয়াটি মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটির তদন্ত করা উচিত।

এই ধরনের অনিয়ম সম্পর্কে জানার পর মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিষয়টিকে অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক বলে অভিহিত করেন। কারণ নতুন সিইওর নেতৃত্বে বিমানের অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের বাজার পুনরুজ্জীবিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকার।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই কর্মকর্তা জানান, কিছু ট্রাভেল এজেন্সির যোগসাজশে টিকেট কালোবাজারির সঙ্গে জড়িত বিমানের কর্মীরা ব্যক্তিগত লাভের জন্য রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থাটিকে বিপুল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করছে।

তদন্তের পর মন্ত্রণালয় কঠোর ব্যবস্থা নেবে বলে আশা প্রকাশ করে এ কর্মকর্তা জানান, একই সিন্ডিকেট গত বছর মধ্যপ্রাচ্যগামী বিমানের টিকিটের জন্য কারসাজি ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের সাথে জড়িত ছিল।

বিমানের বিপণন প্রধানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে অত্যন্ত গুরুতর প্রকৃতির বলে অভিহিত করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ডক্টর ইফতেখারুজ্জামান ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “এগুলো ব্যক্তিগত লাভের জন্য ক্ষমতার অপব্যবহার, জালিয়াতি এবং সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ এবং জাতীয় পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক সম্ভাবনার ক্ষতির পাশাপাশি বিমানের গ্রাহকদের কাঙ্খিত সেবা থেকে বঞ্চিত ও হয়রানি করার নিদর্শন।”

কর্তৃপক্ষ সতর্ক

বিমানের নতুন সিইও ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর জাহিদ হোসেন ঢাকা ট্রিবিউনকে জানান, ঢাকা থেকে যাত্রার ক্ষেত্রে চীনের সিভিল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (সিএএসি) কর্তৃক জারি করা কোভিড ট্রাভেল অ্যাডভাইজরির কারণে কোনো ট্রাভেল এজেন্সিকে প্রথম ফ্লাইটের টিকিট বিক্রির অনুমতি দেওয়া হয়নি।

বিমানের সিইও দাবি করেন, নিয়ম লঙ্ঘন করে টেকঅফ ট্রাভেলসের টিকিট বিক্রির বিষয়টি নিয়ে তিনি অবগত নন। সেই সঙ্গে টিকিট সমস্যার জন্য বিপণন বিভাগকে অবশ্যই বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন হতে হবে বলেও জানান তিনি।

বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে জানিয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী গত সপ্তাহে তিনি ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “বিমানের টিকিট বিক্রির জন্য কোনো এজেন্সিকে  অনুমতি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

About

Popular Links