Saturday, May 18, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

যে কারণে গ্রামের নারীরা হাসপাতালে সন্তান প্রসবে আগ্রহী হচ্ছেন

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, এখনও গ্রামাঞ্চলের ৪৭% নারী বাড়িতে ধাত্রীদের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দিয়ে থাকেন

আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০২২, ০৫:৫৬ পিএম

একটা সময় ছিল যখন গ্রামাঞ্চলে সন্তান প্রসবের প্রধান ভরসা ছিলেন ধাত্রী বা দাইয়েরা। কিন্তু কালের পরিক্রমায় বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের গর্ভবতী নারীরা হাসপাতালে চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে সন্তান জন্মদানকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন। কারণ নারীরা আগের তুলনায় প্রসব সম্পর্কিত ঝুঁকি এবং বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সচেতন হচ্ছেন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গ্রামাঞ্চলের ৪৭% নারী এখনও বাড়িতে ধাত্রীদের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দিয়ে থাকেন। যদিও এসব ধাত্রীদের মাত্র ৩% সঠিকভাবে প্রশিক্ষিত।

গাইনি ও প্রসূতি বিশেষজ্ঞ এবং সার্জন ডা. গুলশান আরা ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “অদক্ষ ধাত্রীদের মাধ্যমে সন্তান জন্মদানের ক্ষেত্রে শিশু এবং মা উভয়ের জন্যই অনেক তাৎক্ষণিক এবং দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি সৃষ্টি হয়। প্রসবকালীন জটিলতার ক্ষেত্রে অনেক সময়ে দেখা যায়, বাচ্চার অবস্থান নির্ধারণ না করেই ডেলিভারি করা হয়। এটি জরায়ু এবং কোলন ছিঁড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এছাড়া, অতিরিক্ত চাপের কারণে মা ও শিশু উভয়েই অন্যান্য জটিলতার সম্মুখীন হতে পারে।

তিনি জানান, জরায়ুর স্থানচ্যুতির সমস্যাটি মূলত অনুপযোগী প্রসব প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে এটি দীর্ঘমেয়াদী সমস্যায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

ধাত্রীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করে বা তাদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রসব সংক্রান্ত ঝুঁকি কমিয়ে আনা যেতে পারে। তবে শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও নারীরা সন্তান প্রসবের ক্ষেত্র হিসেবে হাসপাতালকেই বেছে নিচ্ছেন। আর এর মাধ্যমেই অনুপযুক্ত সন্তান প্রসব বিষয়ক সমস্যা সমাধানের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। কোরিয়া ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির অর্থায়নে ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের জেন্ডার মেইনস্ট্রিমিং ইন ম্যাটারনাল অ্যান্ড চাইল্ড হেলথ অ্যান্ড নিউট্রিশন প্রকল্প এমনই একটি উদ্যোগ।

২০২১ সালের মার্চে এই প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়, যা ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে। হাসপাতালে সন্তান প্রসব সংক্রান্ত সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের পুষ্টি এবং তাদের মধ্যে রোগের প্রাদুর্ভাব কমানোই এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য।

প্রতীকী ছবি পিক্সাবে

প্রকল্প ব্যবস্থাপক জগন্ময় প্রজেশ বিশ্বাসের কথায়, প্রকল্পের আওতায় হাসপাতালে সন্তান প্রসব সংক্রান্ত সচেতনতা তৈরির জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসবের মধ্যে রয়েছে সময়মতো এবং উপযুক্ত কাউন্সেলিং, নিয়মিত প্রসবপূর্ব চেক-আপ, পরিবার পরিকল্পনা এবং কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে গর্ভবতী নারীদের হাসপাতালে স্থানান্তর করা। পাশাপাশি পুরুষদের মধ্যেও প্রকল্পের মাধ্যমে গর্ভবতী সন্তান প্রসব বিষয়ক বিভিন্ন সচেতনতা সৃষ্টি করা হচ্ছে।

যেসব এলাকা এই প্রকল্পের আওতাভুক্ত, তার মধ্যে অন্যতম হলো দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার ডাবর ইউনিয়ন। জগন্ময় বলেন, “গত দেড় বছরে আমরা এই এলাকায় ব্যাপক পরিবর্তন দেখতে পেয়েছি। আমাদের প্রকল্পের শুরুতে হাসপাতালে সন্তান প্রসবের হার ছিল ৫৬.১%। গত বছরের জুলাইয়ে সেটি বেড়ে ৮১% এবং এ বছরের জুনে ৮৪%-এ এসে পৌঁছেছে।”

ডাবরের কামোর কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী পীযূষ কুমার রায় বলেন: “এমনকি পাঁচ বছর আগেও, এখানকার স্থানীয় নারীরা গর্ভবতী হলে নিয়মিত চেকআপের জন্য আসতেন না। এখন তারা নিয়মিত চেকআপের বিষয়ে আগ্রহী এবং সচেতন।”

তিনি আরও জানান, গ্রামের ২১,৯৪১ জনের মধ্যে নারীর সংখ্যা ১০,৮৫২৷ জরায়ুর স্থানচ্যুতির সমস্যায় ভোগা প্রায় ৫% নারীকে জেলা হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

সম্প্রতি ২৩ বছর বয়সী পুত্রবধূর সঙ্গে ক্লিনিকে যাওয়ার সময় ৫৫ বছর বয়সী ঘেয়া রানী এই প্রতিবেদককে বলেন, “আমি দীর্ঘদিন ধরে জরায়ুর স্থানচ্যুতিজনিত সমস্যায় ভুগছি। সম্প্রতি, আমার পুত্রবধূ লিপি আমাকে জানালো যে সেও একই সমস্যায় ভুগছে। তাই আমি তাকে এখানে নিয়ে এসেছি।।”

ক্লিনিকে আসা অধিকাংশ নারীই ছিলেন ২২ থেকে ৩৫ বছর বয়সী। তাদের মধ্যে প্রায় ৩০% ছিলেন প্রথমবারের মতো গর্ভবতী।

সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা সুমিতা রানী রায় জানান, ধাত্রীদের মাধ্যমে প্রসব করাতে গিয়ে তার শাশুড়ি ও বোনকে সন্তান হারাতে হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমরা নারীরা আর ঝুঁকি নিয়ে সন্তান জন্ম দিতে চাই না। তাই হাসপাতালে সন্তান প্রসবের পরিকল্পনা করছি। এখানে অনেক নারীই হাসপাতালে নরমাল ডেলিভারিতে সন্তান প্রসব করছে।”

About

Popular Links