Thursday, May 30, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

ময়মনসিংহের কলসিন্দুরের অজপাড়াগাঁ থেকে ইতিহাসের পাতায়

প্রথমবারের মতো নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জেতা বাংলাদেশ দলের ৮ জনই এসেছেন ময়মনসিংহের কলসিন্দুর এলাকা থেকে

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৭:১২ পিএম

স্বাগতিক নেপালকে ৩-১ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের চ্যাম্পিয়ন হয়ে নতুন ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। শিরোপার পাশাপাশি টুর্নামেন্টের সব ব্যক্তিগত ও দলীয় পুরস্কারও গিয়েছে বাঘিনীদের ঝুলিতেই। পুরো টুর্নামেন্টে প্রতিপক্ষের জালে ২৩ বার বল জড়িয়েছে বাংলাদেশের মেয়েরা।

বাংলাদেশের ফুটবলে ইতিহাস সৃষ্টিকারী এই নারী ফুটবলের ৮ জনের বাড়ি ময়মনসিংহের ধোবাউরা উপজেলা কলসিন্দুর এলাকায়। অজপাড়াগাঁ থেকে উঠে এসে তারকা ফুটবলার হওয়ার পাশাপাশি তারা এখন পুরো দেশের গর্ব। তবে এই যাত্রার পেছনের পথটা মোটেও সহজ ছিল না।

২০১১ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব গোল্ডকাপ টুর্নামেন্টের কথা ঘোষণা করা হয়। খবরটি কানে এসেছিল ময়মনসিংহ জেলার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী উপজেলা ধোবাউরা কলসিন্দুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মফিজউদ্দিনের। এরপরই টুর্নামেন্টে পাঠানোর উদ্দেশ্যে নিজের স্কুলের জন্য দল তৈরির কাজে লেগে পড়েন তিনি।

তখন বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব গোল্ডকাপ টুর্নামেন্টের জন্য স্কুলের বানানো দলে যোগ দেন চতুর্থ শ্রেনীর ছাত্রী সানজিদা আক্তার। এরপর মারিয়া মান্দা আর শিওলি আজিমও দলে নাম লেখায়। এই তিনজনকে দেখে উৎসাহিত হয়ে পরবর্তীতে একে একে মারজিয়া আক্তার, শামছুননাহার, তহুরা, সাজেদা, শামছুননাহার জুনিয়র। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে থেকে যাত্রা শুরু করা এই ৮ খেলোয়াড়ই এখন জাতীয় দলের হয়ে মাঠ মাতাচ্ছেন।

কলসিন্দুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নারী ফুটবলারদের প্রশিক্ষণ ঢাকা ট্রিবিউন

টুর্নামেন্টের জন্য দল তৈরির পর মফিজউদ্দিন নিজেই প্রশিক্ষণের কাজ শুরু করেন। অন্যদিকে, খেলোয়াড়দের দেখভালের দায়িত্ব নেন কলসিন্দুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষক মিনতী রানী শীল। ২০১২ সালে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হওয়া ওই টুর্নামেন্টে অংশ নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে রানাসআপ হয় কলসিন্দুর প্রাথামিক বিদ্যালয়। চ্যাম্পিয়ন হতে না পারলেও হতাশায় ডুবে না গিয়ে নতুন করে প্রস্তুতি শুরু করেন  সানজিদা, মারিয়া, তহুরারা।

গ্রামের অভিভাবকরা রক্ষনশীল হওয়ায় তারা মেয়েদের ফুটবল খেলতে দেয়ার কথা শুনতেই পারতেন না। অভিভাবকদের বুঝিয়ে শুনিয়ে রাজি করার ক্ষেত্রে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। মফিজউদ্দিনের শুরুটা তাই চ্যালেঞ্জিং ছিল। মাঠের বাইরের পাশাপাশি মাঠেও বেশ প্রতিকূলতা ছিল।

মফিজউদ্দিন বলেন, মেয়েদের নিয়ে মাঠে প্রশিক্ষণে নামার পর অনেকেই ঠাট্টা-মশকরা করেছিল। প্র্যাকটিসের সময়ে মাঠের আশেপাশে উৎসুক মানুষের ভিড় লেগে থাকতো। সেখানের অনেকেই আমাকে বিদ্রুপ করত। তবে অনেকে সাহায্য করতেও এগিয়ে এসেছেন। মুখে না, মানুষের তীর্যক মন্তব্যের জবাব মাঠেই দিতে চেয়েছিলাম আমি। মেয়েরা পড়াশোনার পাশাপাশি স্কুল ছুটির পর ও বন্ধের দিনে মাঠে অনুশীলন করতে থাকে। কঠোর পরিশ্রমের পর একপর্যায়ে আসে সফলতা।

মফিজউদ্দিনের পরিশ্রম বৃথা যায়নি। প্রথমবার না পারলেও ২০১৩ সালে আয়োজিত বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব গোল্ডকাপ টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় আসরে চ্যাম্পিয়ন হয় কলসিন্দুর প্রাথমিক বিদ্যালয়। এরপরই সানজিদা, মারিয়ারা স্থানীয় প্রশাসন ও ক্রীড়ামোদি ব্যাক্তিদের নজরে আসেন। অল্প করে হলেও মিলতে থাকে সুযোগ-সুবিধা। 

পরের বছর ২০১৪ সালে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়নশিপে চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ নারী দল। মারিয়া মান্দা আর শামসুননাহার জুনিয়র সেই শিরোপা জয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। এই সফলতা দেখে অন্য ছাত্রীরা এগিয়ে আসায় দিন দিন বাড়তে থাকে কলসিন্দুরের স্কুলের নারী দলের সদস্য সংখ্যা।

কলসিন্দুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিনতী রানী শীল জানান, শুরুতে প্রধান সমস্যা ছিলো লজ্জা। এ সমস্যার কাটিয়ে উঠতে সময় লেগেছে। কিন্তু লোকলজ্জার ভয় দূর করে মেয়েদের খেলার মাঠে নামাতে আমরা সক্ষম হয়েছি। এখন আমাদের গর্ব হয়।  আমি একটি ইতিহাসের সাক্ষী। বর্তমানে এখনও নিয়মিত স্কুলে নারী ফুটবল দলের অনুশীলন চলে।

বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের খেলোয়াড় সানজিদা আক্তারের মা-বাবা/ঢাকা ট্রিবিউন

সানজিদার বাবা লিয়াকত আলী বলেন, মেয়ের আগ্রহ ও শিক্ষকদের কথার কারণে ফুটবল খেলতে দিয়েছি। গ্রামের লোকজন প্রথমে বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি। পরে যখন নারী ফুটবলারদের নামডাক ছড়িয়ে পড়ে, তখন আর সমস্যা হয়নি।

নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে বাংলাদেশের পক্ষে প্রথম গোল করেন বদলি হিসেবে মাঠে নামা শামসুন্নাহার জুনিয়র। শামসুন্নাহারের বাবা নেকবর মিয়া বলন, সোমবার (১৯ সেপ্টেম্বর) টিভির সামনে বসে যখন খেলা দেখছিলাম, তখন মনের মধ্যে একটা টেনশন কাজ করছিলে। মেয়ে যখন ফাইনালে দলের পক্ষে গোল করে, তখন মনটা আনন্দে ভরে উঠে। মেয়ের এমন সাফল্যে আমি গর্বিত।

নারীদের ফুটবল এগিয়ে যাওয়ার কারণে দেশ-বিদেশে ময়মনসিংহের কলসিন্দুর গ্রামের নামডাক ছড়িয়ে পড়ে। ফুটবল কন্যাদের খ্যাতির কারণে গারো পাহাড়ের পাদদেশ সীমান্তবর্তী অবহেলিত এই গ্রামে বিদ্যুৎ আসে। পাকা হয় রাস্তাঘাট। তাদের বদৌলতে কলসিন্দুর স্কুল অ্যান্ড কলেজ সরকারিকরণ হয়েছে। এই মেয়েদের সংবর্ধনাসহ আর্থিক অনুদানও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের একাদশ শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে এই কিশোরীদের গল্প লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। “দ্য আনবিটেন গার্লস” (অপরাজিত মেয়েরা) শিরোনামে পাঠ্যবইয়ে একটি বিশেষ পাঠ রাখা হয়েছে। গারো পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা কিশোরীদের সফলতার গল্প লেখা হয়েছে এই পাঠে। সানজিদা, মারিয়া, তহুরা, শামসুন্নাহার, শিউলি আজিম, নাজমা আক্তার, মাজিয়া আক্তারদের জিবনী লিপিবদ্ধ করা হয়।

এ ব্যাপারে কলসিন্দুর সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী অধ্যাপক মালা রাণী সরকার বলেন, আমাদের মেয়েদের নাম জাতীয় পাঠ্যবইয়ে আসায় আমরা খুবই আনন্দিত এবং গর্বিত।

About

Popular Links