Monday, May 20, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

স্কুলটিতে গেলে শিক্ষার্থীরা আর বাড়ি ফিরতে চায় না

অথচ এক সময় স্কুলটির ছিল শোচনীয় দশা। খারাপ ফলাফলের কারণে বন্ধ হয়ে যায় শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধি

আপডেট : ০২ ডিসেম্বর ২০২২, ০২:০১ পিএম

নৈতিকতা, পড়াশোনা, শিক্ষাদান, উপস্থিতিসহ শিশু শিক্ষায় অনন্য দৃষ্টান্ত বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার জিলবুনিয়া কামলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টিকে ঘিরে বদলে গেছে স্থানীয় জনপদ। এখানকার শিশু শিক্ষার্থীরা বাড়ি ফিরে নয়, আনন্দ আয়োজনে পড়াশোনা করে শ্রেণিকক্ষেই।

শিশুবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা প্রত্যন্ত গ্রামের এই বিদ্যালয়টি শিক্ষা বিস্তারে অন্যন্য অবদান রাখছে বলে অভিমত সংশ্লিষ্টদের।

শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, কামলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো শিক্ষা ব্যবস্থা সারাদেশে চালু হলে প্রাথমিক শিক্ষার মান বদলে যাবে।

জিলবুনিয়া কামলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫২ সালে। কিন্তু ২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির অবস্থা ছিল শোচনীয়। উপজেলার মধ্যে ফলাফল বিপর্যয়ে শীর্ষে থাকায় দুই বছর ধরে বন্ধ ছিল শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধি।  

২০০৯ সালে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন মো. মনিরুজ্জামান। এরপর ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে বিদ্যালয়ের পরিবেশ, ও নিয়মনীতি। পরিবর্তন আসতে শুরু করে ফলাফলে। কর্তৃপক্ষের নেওয়া বেশকিছু উদ্যোগে ধীরে ধীরে বদলে যেতে শুরু করে বিদ্যালয়ের সার্বিক চিত্র।

সরকারি অর্থের পাশাপাশি স্থানীয়রাও সহায়তা করেছেন বিদ্যালয়ের এ পরিবর্তনের যাত্রায়। 

আনন্দে পাঠদান

স্কুল যাতে শিশুদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে সেজন্য রয়েছে দোলনা, ঢেঁকি কল, প্রাণী যাদুঘর, বাগান, ফোয়ারাসহ বিভিন্ন খেলার সামগ্রী। 

রয়েছে বিদ্যালয়ের নাম অংকিত পাথরের ফলক, শহীদ মিনার, বিভিন্ন মানচিত্র, সুসজ্জিত শ্রেণিকক্ষ, কার্যকরি একটি মহানুভবতার দেয়াল, শিক্ষামূলক বিভিন্ন তালিকা, বিদ্যালয়জুড়ে মনীষীদের ছবি আর দেয়ালজুড়ে শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন শিক্ষনীয় বাণী। আছে ডিজিটাল কম্পিউটার ল্যাব, বিদ্যালয়ের ছাদে ফলের গাছ, মাছের অ্যাকুরিয়াম। সার্বিক নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে বসানো হয়েছে ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা।

শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন পরিষ্কার করে তাদের ক্যাম্পাস ও বাগান।

প্রতিদিন ক্লাস শুরুর আগে জাতীয় সঙ্গীত ও শপথ পাঠের পর ‘‘প্রতিদিন কিছু শিখি'' নামের বোর্ডের কাছে চলে যায় শিক্ষার্থীরা। আগে থেকেই বোর্ডে লিখে রাখা বাক্যটি পাঠ করে তারা চলে যায় শ্রেণিকক্ষে।

নিশ্চিত করা হয় শতভাগ উপস্থিতি

শ্রেণিকক্ষের সামনে রয়েছে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর ছবিসহ পরিচিতি, অভিভাবকের নাম ও মোবাইল নম্বর। অনুপস্থিত শিক্ষার্থীর অভিভাবককে তাৎক্ষণিক ফোন করেন শ্রেণি শিক্ষক। 

পুরো বিদ্যালয়ের কার্যক্রম নিজ কক্ষে বসে পর্যবেক্ষণ করতে পারেন প্রধান শিক্ষক মনিরুজ্জামান। 

চিত্ত বিনোদনের জন্য বিদ্যালয়ে আছে ফোয়ারা ঢাকা ট্রিবিউন

শিক্ষকরা জানান, শিক্ষা উপকরণের মাধ্যমে শিশুদের পড়ানো হয়, যাতে তারা আগ্রহী হয়ে ওঠে। শিশু শ্রেণির শিক্ষার্থীদের শেখানো হয় বিনোদনের মাধ্যমে। সে কারণে তারা বাড়ির চেয়ে স্কুলে থাকতেই বেশি পছন্দ করে। 

শিক্ষার্থী খাদিজা আক্তার মিতুর ভাষ্য, “বিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি অনেক খেলার সামগ্রী আছে। শিক্ষকরা আমাদের ‘মা' বলে ডাকেন। তাই প্রতিদিনই আমি স্কুলে আসি।”

শিক্ষার্থী ইসমাইল হোসেন মিরাজের কথায়, “স্কুল আমাদের কাছ কতখানি আনন্দের তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। প্রতিদিনই বিদ্যালয়ে না এলে ভালো লাগে না। পড়াশোনার পাশাপাশি সহপাঠ কার্যক্রমের মাধ্যমে নৈতিকতার বোধ জাগ্রত করেন শিক্ষকরা।”

ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতি খাতুন জানায়, সে আগে ঢাকার একটি বিদ্যালয়ে পড়তো। বাবা-মা তাকে গ্রামে এনে স্কুলে ভর্তি করবেন শুনে প্রথমে তার মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এই বিদ্যালয়ে এসে ধারণা পাল্টে যায়। শহরের স্কুলের চেয়ে এখানকার পড়াশোনা ও পরিবেশ তার ভালো লাগে।

আনন্দের স্কুল, স্বাচ্ছন্দ্যের কর্মস্থল

শুধু খাদিজা বা মিরাজ নয়, শিশু থেকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত প্রতিটি শিক্ষার্থীর পছন্দের স্কুল জিলবুনিয়া কামলা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়।

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক উম্মে কুলছুম বলেন, “আমি আগে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছি। এছাড়া, অনেক বিদ্যালয় দেখার সুযোগ হয়েছে। কিন্তু জিলবুনিয়া কামলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো এমন সুন্দর পরিবেশ আমি আগে দেখিনি। স্কুলের বাহ্যিক পরিবেশ, শিক্ষা উপকরণ, প্রধান শিক্ষকের স্কুল পরিচালনার কৌশল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম।”

বায়োস্কোপের মতো স্কুলের নেশা তাদের ছাড়ে না /ঢাকা ট্রিবিউন

অভিভাবক বিপ্লব শিকদার বলেন, “এটি যেন বিদ্যালয় না, অফুরন্ত মজার কোনো জায়গা। আমার ছেলে বাড়িতেই থাকতে চায় না। এমন কি শুক্র-শনিবারেও স্কুলে আসতে চায়।”

জিলবুনিয়া কামলা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মনিরুজ্জামান ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে এলাকাবাসীকে সম্পৃক্ত করে ব্যতিক্রমী কিছু করার চেষ্টা করা হয়েছে। ভালো কাজে মানুষ অবশ্যই সহায়তা করে। আমাদের বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের নিজের সন্তানের মতো শিক্ষা দেওয়া হয়।”

জনপ্রতিনিধি, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ- সবার সুনজর

স্থানীয় রামচন্দ্রপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আলিম হাওলাদার বলেন, “প্রত্যন্ত গ্রামে অবস্থিত এই বিদ্যালয়ের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে দক্ষিণাঞ্চল জুড়ে। আমার ইউনিয়নে এমন একটি বিদ্যালয় আছে, বিষয়টি গর্বের।”

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিকে প্রয়োজনে সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দেন এই জনপ্রতিনিধি।

বাগেরহাট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মু. শাহ আলম মনে করেন, একজন প্রধান শিক্ষকের সদিচ্ছা থাকলে কেবল বিদ্যালয় নয়, গোটা এলাকায় পরিবর্তন আসতে পারে। এর জ্বলন্ত উদাহরণ জিলবুনিয়া কামলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। জেলার অন্যান্য বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এই বিদ্যালয় পরিদর্শনে এনে অনুকরণের জন্য বলা হবে।”

এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আদলে সারা দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবস্থা চালু হলে পাল্টে যাবে শিক্ষার পরিবেশ। শিশুরা নৈতিক শিক্ষায় বড় হয়ে প্রকৃত দেশপ্রেমিক হিসেবে গড়ে উঠবে, এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।

About

Popular Links