Sunday, May 19, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

ভেঙে ফেলা হচ্ছে মুঘল স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন ‘দেওয়ানের পুল’

ইতিহাস বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার বারকোট গ্রামের শেষ সীমানায় মুঘল আমলে সেতুটি নির্মিত হয়

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০২২, ১০:৪২ পিএম

সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার লক্ষীপাশা ইউনিয়নে মুঘল আমলের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন “দেওয়ানের পুল” ভেঙে ফেলা হচ্ছে। রাস্তা সংস্কার ও প্রশস্তকরণের জন্য স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এটি ভেঙে ফেলার কাজ শুরু করে। এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সচেতন মহলে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।

মঙ্গলবার (২৭ ডিসেম্বর) পুল ভেঙে ফেলার বিষয়টি ঢাকা ট্রিবিউনকে নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইনামুল কবির।

ঢাকা ট্রিবিউনকে মো. ইনামুল কবির বলেন, “এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে রাস্তা সংস্কারের জন্য সেতুটি ভাঙা হচ্ছে। এখানে নতুন সেতু নির্মাণের প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন থেকে চলছে। তখন স্থানীয় লোকজন এ বিষয়ে কোনো কিছু বলেননি। সব প্রক্রিয়া শেষে যখন সেতুটি ভাঙা হচ্ছে, তখন এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।”

বিদেশি অর্থায়নে প্রায় ২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নতুন সেতু নির্মিত হবে জানিয়ে তিনি বলেন, “সেতু এলাকা দিয়ে ২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ২৪ ফুট প্রশস্তের রাস্তা নির্মাণ করা হবে। পুরনো সেতুটির মধ্যভাগ উঁচু। সে কারণে এক পাশ থেকে বিপরীত প্রান্ত দেখা যায় না। যে কারণে সেতুটিতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি ছিল।”

সেতুটি না ভেঙে সড়ক প্রশস্ত করা যেত কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “টেন্ডার করার আগে তারা (স্থানীয়রা) বিষয়টি জানালে এ নিয়ে বিকল্প চিন্তা করা যেতো। মানুষের ভালোর জন্যই আমরা ব্রিজটি নির্মাণ করতে চাচ্ছি।”

গোলাপগঞ্জের বাসিন্দা মাহফুজ আহমদ চৌধুরী ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “বিগত কয়েক শতাব্দী থেকে উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের সঙ্গে যোগাযোগের মাইলফলক হিসেবে কাজ করেছে এই দেওয়ানের পুল। রবিবার থেকে বুলডোজার দিয়ে সেতুটি ভাঙার কাজ শুরু হয়। সোমবার ব্রিজের উপরের অংশ ভেঙে ফেলা হয়।”

ইতিহাস বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, উপজেলার বারকোট গ্রামের শেষ সীমানায় প্রায় প্রায় তিনশ বছর আগে ব্রিজটি নির্মাণ করা হয়েছিল।

জানা যায়, মোগল শাসনামলের সম্রাট মুহম্মদ শাহের রাজত্বকালে আনুমানিক ১৭৪০ সালে অল্পকালের জন্য শ্রীহট্ট জেলার (বর্তমান সিলেট) দেওয়ান (রাজস্ব কর্মকর্তা) নিযুক্ত হন গোলাব রাম (মতান্তরে গোলাব রায়)। তখন সিলেট অঞ্চলের ফৌজদার ছিলেন শমসের খান এবং সারাবাংলার শাসনকর্তা ছিলেন সুজা উদ্দিন খান। সনাতন ধর্মাবলম্বী গোলাব রাম খুবই ধর্মপ্রাণ ছিলেন। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই এই ধর্মপ্রাণ দেওয়ান বৈষ্ণব ধর্মের প্রবর্তক শ্রীচৈতন্যের পিতৃভূমি দেখতে শ্রীহট্ট থেকে হেঁটে বাউসী কোনাচরে গিয়ে ঝরংবিল-সংলগ্ন বসন্ডার খালে আটকে যান। পরে পার হন নৌকা দিয়ে। এরপর তিনি শ্রীচৈতন্যের পিতৃভূমি দেখতে যান।

সেখানে যাওয়ার পর মন্দিরের জরাজীর্ণ অবস্থা দেখে সেটিও মেরামত করেন। মন্দির দর্শনে ভক্তদের যাতায়াতে যাতে বিঘ্ন না ঘটে সে জন্য একটি সড়ক ও দেওয়ান নির্মাণ করেন। আজও এ অঞ্চলের লোকের কাছে এ সড়ক ও পুলটি দেওয়ানের নাম বহন করে চলেছে।

ঢাকা-দক্ষিণ সরকারি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিভাগীয় প্রধান নজমুল ইসলাম ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “ঐতিহাসিক এই নিদর্শনটি না ভেঙে যদি সংস্কার করা হতো; তাহলে তা মঙ্গলজনক হতো। কারণ, মুঘল স্থাপত্যের নিদর্শন এখন পাওয়া খুবই দুষ্কর। নতুন প্রজন্মের কাছ থেকে ঐতিহাসিক এই নিদর্শনটি আজ বিলুপ্ত হয়ে গেলো।”

এলজিইডি'র গোলাপগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী মাহমুদুল হাসান বলেন, “দেশের আর কোথাও এটির মতো পুরাতন পুল নেই। ওই সড়কটি দুই থেকে আড়াই বছরের মধ্যে সিলেট-জকিগঞ্জ সড়কের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হবে। প্রাথমিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ সেতুগুলো ভেঙে নতুন করে নির্মাণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি রাস্তা প্রশস্তকরণসহ অন্যান্য কাজ চলবে।”

উপজেলা প্রকৌশলী ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “কারিগরি কমিটি সেতুটি বেশ পর্যবেক্ষণ করে বলেছে, এটা রাখলেও টিকবে না। জায়গায় রেখে বিকল্প চিন্তা করলেও দেখতে বেমানান লাগে। যার জন্য সেতুটি ভেঙে ফেলতে হচ্ছে।”

About

Popular Links