Tuesday, May 28, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

ফল ও সবজির রপ্তানি বাড়াতে ‘জিএপি’ নিশ্চিতকরণের পরামর্শ

তাজা ফল ও শাকসবজির আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিভিন্ন শর্ত মেনে চলতে জিএপির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ

আপডেট : ২২ জানুয়ারি ২০২৩, ০৪:২৭ পিএম

দেশের ফল ও সবজির রপ্তানি বাড়াতে কৃষকদের মধ্যে গুড এগ্রিকালচারাল প্রাকটিসেস (জিএপি) বা গ্যাপ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে সরকারকে আরও উদ্যোগ নিতে হবে বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। শনিবার (২১ জানুয়ারি) রাজধানী ঢাকায় অনুষ্ঠিত একটি গোলটেবিল বৈঠকে এ কথা বলেন তারা।

বৈঠকে সংশ্লিষ্টরা জানান, ফল ও সবজির রপ্তানি বাড়ানোর জন্য সরকার ইতোমধ্যেই বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে, তবে পণ্যের গুণগতমান নিশ্চিত করতে এবং এই খাতের রপ্তানির অন্যান্য শর্ত পূরণে আরও সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।

বৈঠকে বলা হয়, গ্লোবালজিএপি হলো- একটি বৈশ্বিক বেসরকারি উদ্যোগ যা উৎপাদিত কৃষি পণ্য যেন মানুষের স্বাস্থ্য এবং পরিবেশগত অবস্থার জন্য ক্ষতিকারক না হয় সেটি নিশ্চিত করে। কৃষিপণ্যে রাসায়ানিক ব্যবহার হ্রাস, কৃষকের স্বাস্থ্যসুরক্ষা নিশ্চিতকরণসহ প্রাণিসম্পদ উন্নয়নের মতো বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিয়ে জিএপি স্ট্যান্ডার্ড নির্ধারণ করা হয়েছে।

রপ্তানির জন্য কৃষি পণ্যের বাণিজ্যিক উৎপাদনের ক্ষেত্রে জিএপি শর্ত পূরণের মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্যমান নিশ্চিত করা অপরিহার্য। কৃষি পণ্য; বিশেষ করে তাজা ফল ও শাকসবজির আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিভিন্ন শর্ত মেনে চলতে জিএপির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

শনিবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে ঢাকা ট্রিবিউনের সহযোগিতায় “ফল ও সবজির রপ্তানি বাড়াতে গুড এগ্রিকালচারাল প্রাকটিসেস'র (জিএপি) সম্ভাবনা”  শীর্ষক গোল টেবিল বৈঠকটির আয়োজন করে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। বৈঠকটি ইউএসএআইডির অর্থায়নে পরিচালিত “ফিড্‌ দ্য ফিউচার বাংলাদেশ হর্টিকাল্‌চার, ফ্রুট্‌স, এন্ড নন্‌-ফুড ক্রপ্‌স অ্যাক্টিভিটি” প্রকল্পের আওতায় বাস্তাবায়িত হয়।

বৈঠকে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব বলাই কৃষ্ণ হাজরা। অন্যান্যদের মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) সদস্য পরিচালক ড. মো. আব্দুস সালাম, ঢাকা ট্রিবিউনের নির্বাহী সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ আলোচনায় অংশ নেন। 

অধ্যাপক আবু নোমান ফারুক আহমেদ/ মাহমুদ হোসেন অপু/ঢাকা ট্রিবিউন

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আজিজুর রহমানের সঞ্চালনায় বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব ও ফিড্‌ দ্য ফিউচার বাংলাদেশ হর্টিকাল্‌চার, অ্যাক্টিভিটির উপদেষ্টা আনোয়ার ফারুক।

শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান ও স্বীকৃত গ্লোবালজিএপি প্রশিক্ষক অধ্যাপক আবু নোমান ফারুক আহমেদ বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। এ সময় তিনি জিএপি সনদ পেতে দেশে অংশীজনদের নিয়ে এ বিষয়ে প্রশিক্ষণের পরামর্শ দেন।

তিনি বলেন, “অনুমোদিত কৃষকদের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সরকারের ভর্তুকি প্রদান করা উচিত।” তিনি ডিপ্লোমা, স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর স্তরে কৃষি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জিএপি প্রাসঙ্গিক কোর্স অন্তর্ভুক্ত করার ওপর জোর দেন।

বক্তারা বলেন, জিএপি সনদ অর্জনের জন্য উৎপাদিত পণ্যের ক্ষেত্রে অবশ্যই প্রাক-উৎপাদন, উৎপাদন, ফসল কাটা এবং পরবর্তী প্রক্রিয়াজাত পর্যায়ে সেটি নিরাপদ বলে নিশ্চিত করতে হবে। সঠিকভাবে এ প্রক্রিয়াটি অনুসরণ করতে কৃষক ও মাঠকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি সরকারের পরিবহন ও নিরীক্ষণ সুবিধা বৃদ্ধি করা উচিতও বলেও মত দেন তারা।

বলাই কৃষ্ণ হাজরা/ মাহমুদ হোসেন অপু/ঢাকা ট্রিবিউন

দেশের ৪৬০টি উপজেলার কৃষকদের জন্য জিএপি সংক্রান্ত সুবিধাদি নিশ্চিতের ওপরও জোর দেন তারা।এই উদ্যোগের সফল বাস্তবায়নের জন্য সরকারি সংস্থা এবং বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. মো. শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া বলেন, “দেশে কৃষি কার্যক্রম নানাভাবে এগিয়ে চলেছে। কৃষকদের জিএপি'র সঙ্গে যুক্ত করতে সময় লাগবে। ধাপে ধাপে এবং সমবেতভাবে এগিয়ে যেতে হবে। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করতে বেসরকারি খাতের সঙ্গে সমন্বয় করে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।”

বলাই কৃষ্ণ হাজরা বলেন, “আশাহত হওয়ার কিছু নেই। আমরা যদি কাজ চালিয়ে যাই এবং জিএপি সনদ নিশ্চিত করি, তাহলে আগামী ২ বছরের মধ্যে ১০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব হবে। আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে জিএপি পদ্ধতি অনুসরণ না করার অর্থ এই নয় যে খাদ্য নিরাপদ নয়। কিন্তু আমরা যদি আমাদের দেশ থেকে অন্য দেশে রপ্তানি করতে চাই তবে আমাদের অবশ্যই জিএপি অনুসরণ করতে হবে। এতে দেশের বাইরে খাদ্য রপ্তানির সুযোগ বাড়বে।”

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইং এর পরিচালক তাজুল ইসলাম পাটোয়ারী বলেন, “আমাদের শুধু সরকারি দপ্তর নয়, সংশ্লিষ্ট বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও একসঙ্গে কাজ করতে হবে।”

অধ্যাপক ড. মো. শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া/ মাহমুদ হোসেন অপু/ঢাকা ট্রিবিউন

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, “নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব হলেও আমরা পিছিয়ে আছি। কোভিড মহামারি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও খারাপ করেছে।"

তিনি আরও বলেন, “যদিও খাদ্যপণ্য বাজারে সহজলভ্য, তবে এর বেশিরভাগই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এজন্য আমাদের জিএপি নিশ্চিত করা দরকার। কৃষি মন্ত্রণালয় সম্প্রতি এ বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছে।”

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের সাবেক নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. আব্দুর রাজ্জাক জিএপি সনদের জন্য একটি রোডম্যাপ তৈরির ওপর জোর দেন।

তিনি বলেন, “কৃষি উৎপাদনে নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য আমাদের ম্যানুয়াল এবং রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। কী পরিমাণ কীটনাশক ও সার ব্যবহার করা হচ্ছে এবং কোন জমিতে ফসলের গুণাগুণ কেমন তা নির্ধারণ করতে মনিটরিং করা উচিত। এরপর, আমরা রপ্তানির দিকে এগিয়ে যেতে সক্ষম হব।”

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) সদস্য পরিচালক (ফসল) ড. আবদুস সালাম বলেন, “আমরা ইতোমধ্যেই নিরাপদ খাদ্য ও উচ্চমানের ফসল উৎপাদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে ১০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব পাঠিয়েছি। অনুমোদন পেলে প্রকল্পের কাজ শুরু করা হবে। এছাড়া বেশ কিছু প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী ও কৃষিমন্ত্রী কৃষি উৎপাদনে পরিবর্তন আনতে যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন।”

২১ জানুয়ারি রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়/মাহমুদ হোসেন অপু/ঢাকা ট্রিবিউন

বেসরকারি সংস্থা বিকশিত বাংলাদেশের সভাপতি আতাউর রহমান মিটন বলেন, “জিএপি'র মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করা গেলে খাদ্য রপ্তানি বাড়াবে। জিএপি নীতিমালা ইতোমধ্যেই বিশ্বের অনেক দেশে চালু আছে, আমরা বিলম্বে প্রক্রিয়াটি শুরু করছি। এটির সফল বাস্তবায়নে বাংলাদেশের রপ্তানির নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে।”

ম্যাট্রিক্স বাংলাদেশের টিম লিডার রফিক সরকার বলেন, “নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের জন্য প্রতিটি কৃষি অফিসে দক্ষ, প্রশিক্ষিত মাঠকর্মী প্রয়োজন।”

ট্রেনিং বাংলাদেশ সিড অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক আহমেদ আলী চৌধুরী ইকবাল বলেন, "আমরা যদি জিএপি অনুসরণ করে ফসল উৎপাদন করতে পারি, তাহলে বাংলাদেশ মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদনের সেরা কেন্দ্রে পরিণত হবে।"

ঢাকা ট্রিবিউনের নির্বাহী সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ বলেন, "জিএপি বিষয়ে প্রচারের জন্য আরও সচেতনতা কার্যক্রম এবং আলোচনা প্রয়োজন, যাতে সাধারণ কৃষক থেকে নীতিনির্ধারক পর্যন্ত সবাই এ বিষয়ে আরও সক্রিয় হতে পারে।"

About

Popular Links