Saturday, May 25, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

ভবন তো নয়, যেন একেকটি ‘টাইম বোমা’

ফায়ার সার্ভিসের সাবেক মহাপরিচালক বলেন, আমার অভিজ্ঞতা বলছে এ ধরনের ঘটনা আরও ঘটবে। কারণ অনেক ভবনেই অনিয়ন্ত্রিত গ্যাস লাইন আছে

আপডেট : ০৯ মার্চ ২০২৩, ০১:১৩ পিএম

ঢাকার গুলিস্তানে (সিদ্দিক বাজার) ভবন বিস্ফোরণের তীব্রতা এবং হতাহতের সংখ্যায় বিস্মিত-হতভম্ব করেছে বিশ্লেষকদের। তারা বলছেন, পর পর দুটি একই ধরনের ভবন বিস্ফোরণের ঘটনা রাজধানীতে নতুন দুর্যোগের আভাস দিচ্ছে।

তারা বলছেন, ঢাকা শহরের  শহরের ভবনগুলো যেন এখন টাইম বোমায় রূপান্তরিত হয়েছে। সব অনিয়ম পুঞ্জীভূত হয়ে একের পর এক বিপর্যয় ঘটাচ্ছে। সামনে আসতে শুরু করেছে গ্যাস, স্যুয়ারেজ এমনকি ওয়াসার পানির লাইন বিস্ফোরণ ইস্যু। এ ধরনের ঘটনা আরও ঘটতে পারে বলে তাদের আশঙ্কা।

সিদ্দিক বাজারে মঙ্গলবারের ঘটনায় এ পর্যন্ত ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ।

ইতোমধ্যে সেনাবাহিনীসহ সরকারি সংস্থাগুলোর বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। ঘটনাস্থল থেকে কোনো নাশকতার আলামত মেলেনি। তবে ধারণা করা হচ্ছে, লাইনের লিকেজ থেকে বেজমেন্টে গ্যাস জমে এই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। 

ফায়ার সার্ভিসের সাবেক মহাপরিচালক আলি আহমদ খান বুধবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেন, “সবকিছু দেখে-শুনে মনে হয়েছে এটা গ্যাসেরই বিস্ফোরণ। ওখানে অনেকগুলো গ্যাসলাইন আছে। একটি লাইন থেকে আরও লাইন নেওয়া হয়েছে অবৈধভাবে। লাইনগুলো অনেক পুরাতন। ওখান থেকে বের হওয়া গ্যাস জমে এই বিস্ফোরণ হয়েছে। সামান্য কোনো স্পার্ক বা দাহ্য আগুন এই বিস্ফোরণ ঘটাতে সহায়তা করেছে হয়তো।”

তিনি আরও বলেন, “নারায়ণগঞ্জে মসজিদে এবং মগবাজারের একটি ভবনে একইভাবে বিস্ফোরণ ঘটেছিল। বাতাসে ৫-১৭% গ্যাস থাকলেই বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। আর এর তীব্রতা নির্ভর করে যেখানে বিস্ফোরণ হয় সেই জায়গাটি কতটা বদ্ধ তার ওপর। সিদ্দিকবাজারে বেজমেন্টে বিস্ফোরণ তীব্রতা বাড়িয়েছে। খোলা থাকলে গ্যাস জমতে পারতো না। বেরিয়ে যেত।”

ফায়ার সার্ভিসের সাবেক মহাপরিচালক বলেন,“আমার অভিজ্ঞতা বলছে এ ধরনের ঘটনা আরও ঘটবে। কারণ অনেক ভবনেই অনিয়ন্ত্রিত গ্যাস লাইন আছে।”

ভয়াবহ বিস্ফোরণে বিস্মিত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. এম নুরুল আমিন বলেন, “স্যুয়ারেজের লাইন থেকে মিথেন গ্যাস জমেও এ ধরনের বিস্ফোণের ঘটনা ঘটতে পারে। তবে সিদ্দিক বাজারের ঘটনায় সেটা হয়নি। কারণ যেখানে বিস্ফোরণ ঘটেছে সেখানে স্যুয়ারেজের লাইন থেকে গ্যাস আসার সুযোগ নেই। সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকার ভবনে হয়ত হতে পারে। তবে দুটি ঘটনায়ই বিস্ফোরণের ভয়াবহতা আমাকে অবাক করেছে। তাই গভীর তদন্ত হওয়া প্রয়োজন যে আরও কোনো ইস্যু এইসব ঘটনায় আছে কি-না।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা সীতকুণ্ডে দেখেছি, ওখানে আরও সিলিন্ডার ছিল। ফলে ওগুলোও বিস্ফোরিত হয়ে বিস্ফোরণের তীব্রতা বাড়িয়েছে। এখানে বিস্ফোরণের তীব্রতায় আমি বিস্মিত হয়েছি। তাই দেখা প্রয়োজন তীব্রতা বাড়াতে আর কোনো উপাদান কাজ করেছে কি-না।”

এত তীব্র বিস্ফোরণের কারণ কী

বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর)-পরিচালক ড. রেজাউল করিম বলেন, “তীব্রতার কারণ হলো বিস্ফোরণটি বদ্ধ জায়গায় ঘটেছে। খোলামেলা জায়গায় হলে এতটা তীব্র হতো না। আমাদের অনেক মার্কেট এবং ভবন আছে যেগুলো বদ্ধ। ঠিকমতো আলো-বাতাস যায় না, ঘিঞ্জি। ফলে আতঙ্কের কারণ আছে।”

ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ডুয়েট) কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. হাসান মোহাম্মদ মোস্তফা আফরোজ বলেন, “তিন কারণে সেখানে বিস্ফোরণ হতে পারে। প্রথমত স্যুয়ারেজ লাইন লিক করে গ্যাস ভবনের মধ্যে বদ্ধ জায়গায় জমতে থাকলে সেখান থেকে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। স্যুয়ারেজের গ্যাসে মিথেন ও হাইড্রোজেন সালফায়েড উভয়ই থাকে। এই দুটো গ্যাসে আগুন ধরে যায়। বাসার ওয়াশরুমের কমোড বা বেসিন অনেক দিন ধরে ব্যবহৃত না হলে তখন ফ্ল্যাশ না করায় পাইপের মধ্যে পানি যায় না। ফলে গ্যাস জমতে পারে। এভাবে কোনো ফ্লোর বা কক্ষে অনেক দিন ধরে গ্যাস জমতে থাকলে বিস্ফোরণ হতে পারে। আর গ্যাসের লাইনে লিকেজ থাকলেও গ্যাস জমে আগুন ধরে যেতে পারে বা গ্যাসের পরিমাণ বেশি জমলে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। মোট বাতাসের ৫% গ্যাস হলেই বিস্ফোরণ ঘটবে বা আগুন জ্বলবে। আমার মনে হয় সিদ্দিক বাজারের ভবনটির বেজমেন্টে অনেক বেশি গ্যাস জমেছিল। তাই এত ভয়াবহ আকারে বিস্ফোরণ হয়েছে। সাধারণভাবে গ্যাস লিকেজের কারণে যেসব দুর্ঘটনা ঘটে এতে ভয়বহতা বেশি। আর এসি থেকেও বিস্ফোরণ হয়। তবে সাধারণ কোনো কারণে এসি বিস্ফোরণ ঘটে না। মেকানিক যখন এসি মেরামত করে তখন অনেক সময় লিকেজ থেকে যায়। ওই লিকেজ থেকে এসির বিস্ফোরণ ঘটে থাকে।”

সায়েন্স ল্যাবের ধসে পড়া ভবনে উদ্ধার কাজ পরিচালনা করছে ফায়ার সার্ভিস/ মেহেদি হাসান/ঢাকা ট্রিবিউন

শহরে নতুন আতঙ্ক

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, “এখন শহরে এই প্ল্যাম্বার্স বিস্ফোরণ নতুন আতঙ্ক তৈরি করেছে। ঢাকার ৫৫% ভবনই ঝুঁকির মধ্যে আছে। সেখানে না আছে অগ্নি নিরাপত্তা, না আছে এই ধরনের বিস্ফোরণ ঠেকানোর ব্যবস্থা। শুধু তিতাসের লাইন কেন, ওয়াসার লাইনেও গ্যাস জমে তা লিকেজ হয়ে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। এজন্য রাজউক, তিতাস বা ওয়াসার কোনো দায়িত্ব আছে বলে মনে হয় না। আর নগারিকেরাও উদাসীন। একটি অ্যাপার্টমেন্টের ইলেট্রিক সিস্টেম যা তাতে হয়তো একটি এসি চালানো সম্ভব। কিন্তু চালানো হচ্ছে পাঁচটি। চাপ না নিতে পেরে বিদ্যুতের লাইন জ্বলে যায়, এসি বিস্ফোরণ ঘটে।”

বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, “ঢাকার ভবনগুলো যেন এখন টাইম বোমায় পরিণত হয়েছে। যেকোনো ধরনের অপঘাত যেকোনো সময় হতে পারে। মাত্র ১০০ ভবনের অকুপেন্সি সার্টিফিকেট আছে। এটা বিশ্বাস করা যায়! সব ধরনের ব্যবস্থা সঠিক থাকলে এই সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। আর পাঁচ বছর পর পর তা আবার চেক করে নতুন করে নিতে হয়। আসলে ভবনগুলো যাদের দেখার কথা তারা দেখছেন না। আমার মনে হয় বেসরকারি খাতকে এই দায়িত্ব দেওয়া যায়।”

About

Popular Links