Sunday, May 19, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

প্রত্যক্ষদর্শীদের মুখে ২৫ মার্চ গণহত্যার রোমহর্ষ বর্ণনা

‘দেখলাম একটা ময়লার ড্রেনে পড়ে আছে আমাদের ক্যান্টিনবয়। বয়স ১৪ বছরের মতো। আর্মিরা তাকে সেখান থেকে উঠিয়ে পিচঢালা রাস্তায় এনে আছড়ায়’

আপডেট : ২৫ মার্চ ২০২৩, ০৫:০৩ পিএম

ফিরে এলো ২৫ মার্চ। ১৯৭১ সালে এই রাতেই নিরীহ বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী৷ “অপারেশন সার্চলাইট” নামের অভিযানের মাধ্যমে শুরু করেছিল গণহত্যা। সেই রাতের কথা জানিয়েছেন কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী মুক্তিযোদ্ধা।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ, মুক্তিযুদ্ধ শুরুর মুহূর্ত। রাতেই পৃথিবীর ইতিহাসের ভয়াবহতম গণহত্যার শিকার হয় স্বাধীনতাকামী বাঙালি৷ ট্যাঙ্ক ও সাঁজোয়া বহর নিয়ে রাজপথে নামে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী।

রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স, পিলখানার ইপিআর ব্যারাক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস, শিক্ষকদের আবাসিক এলাকা ও পুরান ঢাকার শাঁখারি বাজারসহ ঢাকার বিভিন্ন স্থানে তারা হত্যাযজ্ঞ চালায়।

সিডনি মর্নিং হেরাল্ড পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকায় ২৫ থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত পাঁচ দিনে পাকিস্তানি বাহিনী হত্যা করেছিল এক লাখ বাঙালিকে।

২৫ মার্চ রাত নিয়ে কথা হয় রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে তখন অস্ত্রাগারের দায়িত্বে থাকা কনস্টেবল মো. আবু শামার সঙ্গে। তার মুখে ভয়াবহ সেই রাতের বর্ণনা উঠে এসেছে এভাবে, “রাজারবাগে আক্রমণটা হবে গোয়েন্দাদের মাধ্যমে সে সম্পর্কে ২৩ ও ২৪ মার্চেই ক্লিয়ার হয়ে যাই। পাকিস্তানের আইএসআই গোয়েন্দা সংস্থা রাজারবাগকে সিরিয়াসভাবে টার্গেট করে রেখেছিল। কারণ, ইস্ট পাকিস্তানের বৃহত্তম পুলিশ লাইন্স ছিল রাজারবাগ। সেখানে বাঙালি সদস্য ছিল সবচেয়ে বেশি।”

“রাত আনুমানিক সাড়ে ১০টা। একটা ওয়্যারলেস মেসেজ আসে তেজগাঁও এলাকায় পেট্রোলে থাকা ওয়্যারলেস অপারেটর আমিরুলের কাছ থেকে। মেসেজে বলা হয়, ক্যান্টনমেন্ট থেকে ৩৭ ট্রাক সশস্ত্র সেনা ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছে। খবরটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সেন্ট্রিও তখন পাগলা ঘণ্টি পিটায়।”

১৯৭১ সালের ১৬ এপ্রিল, চুয়াডাঙ্গায় পাকিস্তানি বাহিনীর বোমা হামলায় আহত একজন মুক্তিযোদ্ধাকে চিকিৎসা দিতে নিয়ে যাচ্ছেন বেসামরিক মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধারা/ ডয়চে ভেলে

“অস্ত্রাগারে গিয়ে দেখলাম তালা মারা। সেন্ট্রি বলে, ‘হাশেম স্যার (সুবেদার আবুল হাশেম) তালা মাইরা চাবি নিয়া গেছে মফিজ স্যারের বাসায়।' দৌড়াইয়া গেলাম সেখানে। তার কাছে অস্ত্রাগারের চাবি চাই। প্রথম দিতে চায়নি। চাপের মুখে তিনি একটা অস্ত্রাগারের চাবি দেন। ওই চাবি নিয়ে একটা অস্ত্রাগারের দরজা খুলে দেই। এরপর শাবল দিয়ে আরেকটির তালা ভেঙে ফেললে ভেতরের অস্ত্রগুলো যে যার মতো নিয়ে যায়। অবাঙালি সদস্যরা আগেই পালিয়ে যায় পুলিশ লাইন্স থেকে। শুধু সুবেদার বদরুদ্দিন খান অবাঙালি হয়েও আমাদের পক্ষে ছিলেন।”

“শান্তিনগরে ডন স্কুলের ছাদের ওপরে আর মালিবাগ এসবি ব্যারাকের ছাদে আমাদের দুইটা গ্রুপ চলে যায়। প্যারেড গ্রাউন্ডে একটা গ্রুপ, এক নম্বর ও দুই নম্বর গেট, মূল ভবনের ছাদ ও বিভিন্ন স্থানে পজিশন নিয়ে অপেক্ষায় থাকি আমরা। রাত আনুমানিক ১১টা। পাকিস্তানি কনভয়ের ওপর শান্তিনগরে ডন স্কুলের ছাদের ওপর থেকে পুলিশ প্রথম গুলি চালায়। আমরাও শব্দ পাই। পাকিস্তানি আর্মিদের ওপর ওটাই ছিল প্রথম আক্রমণ।”

“শাহজাহান, আব্দুল হালিম, ওয়্যারলেস অপারেটর মনির, গিয়াস উদ্দিনসহ পজিশনে থাকি মূল ভবনের ছাদে। রাত সাড়ে ১১টার দিকে রাজারবাগের দিকে ওরা আক্রমণ করে। আমাদের ১০টা গুলির বিপরীতে ওরা জবাব দিয়েছে প্রায় কয়েক হাজার গুলির মাধ্যমে। ওরা ট্যাংক, মর্টার ও হেভি মেশিনগান ব্যবহার করে। অল্প সময়ের ভেতর টিনশেডের ব্যারাকগুলোতে আগুন লেগে যায়। জীবন বাঁচাতে ভেতর থেকে পুলিশ সদস্যরা দৌড়ে বের হওয়ার চেষ্টা করে। পাকিস্তানি সেনারা তখন ব্রাশফায়ার করে নির্মমভাবে তাদের হত্যা করে।”

“ফজরের আজানের পর আর্মিরা রাজারবাগের এক ও দুই নম্বর গেট দুটি ট্যাংকের সাহায্যে ভেঙে ভেতরে ঢোকে। আসে ১০টি খালি ট্রাকও। এক থেকে দেড়শ পুলিশের লাশ পড়ে ছিল। ওগুলো ট্রাকে করে ওরা সরিয়ে ফেলে। ভেতরে ঢুকে ছাদে উঠে টেনে হিঁচড়ে নামায় আমাদের। বেয়োনেট দিয়েও খুঁচিয়েছে, অস্ত্র কেড়ে নিয়ে হাত ওপর দিকে তুলে মারতে মারতে নিচে নামিয়েছে। তারপর রাস্তায় ফেলে ক্রলিং করায় আর নির্দয়ভাবে পেটায়।”

“দেখলাম একটা ময়লার ড্রেনে পড়ে আছে আমাদের ক্যান্টিনবয়। বয়স চৌদ্দ বছরের মতো। আর্মিরা তাকে সেখান থেকে উঠিয়ে পিচঢালা রাস্তায় এনে আছড়ায়। তার মুখ ফেটে রক্ত বের হতে থাকে। ছেলেটা কাঁপতে কাঁপতে বলছিল ‘পানি, পানি৷'। এক পাকিস্তানি আর্মি পাশে নিয়ে প্যান্টের জিপার খুলে তার মুখে প্রস্রাব করে দেয়। ওই মুহূর্তটা খুবই খারাপ লাগছিল। মানবতা প্রতি মুহূর্তে পদদলিত হয়েছে রাজারবাগে।”

১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ বাংলাদেশে গণহত্যা চালায় পাকিস্তানি বাহিনী/ফাইল ছবি/ সংগৃহীত

“তিন দিন আটকে রেখে আমাদের ওপর নির্মমভাবে টর্চার করে ওরা। রাইফেলের বাঁটের আঘাত, বুটের নীচে ছিল লোহার পাত, সেটা দিয়ে দেয় লাথি, শরীরের প্রতিটি জায়গা ছিলে যায়, রক্তাক্ত হই। মুখেও আঘাত করেছে। সবগুলো দাঁতের গোঁড়া ভেঙে যায়। ফলে সব দাঁতই পড়ে গেছে। এক ফোঁটা পানিও খেতে দেয়নি। শরীরের রক্ত মুখে চলে এলে লবণ-কাঁটা লাগতো। ভাবিওনি বেঁচে থাকবো। বেঁচে আছি এটাই আল্লাহর রহমত।”

পুলিশ লাইন্সের প্রতিরোধযোদ্ধারা কেউ-ই বঙ্গবন্ধুর দেওয়া বীরউত্তম বা বীরপ্রতীক খেতাব পাননি। স্বাধীনতা লাভের এত বছর পরও রাজারবাগের প্রতিরোধযুদ্ধে অংশ নেওয়া কোনো পুলিশ সদস্যকেই স্বাধীনতা পুরস্কার বা অন্য কোনো রাষ্ট্রীয় সম্মান দেওয়া হয়নি। পুলিশের প্রথম প্রতিরোধ ও আত্মত্যাগের ইতিহাসটিও যুক্ত হয়নি কোনো পাঠ্যপুস্তকে। এমন নানা কষ্ট বুকে পুষেই বেঁচে আছেন রাজারবাগের প্রতিরোধযুদ্ধে অংশ নেওয়া পুলিশ যোদ্ধারা।

ওই রাতে পাকিস্তানি সেনারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, ইকবাল হল ও রোকেয়া হলেও গণহত্যা চালায়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ১৯৫ জন শহিদের তালিকা করলেও বিভিন্ন তথ্য বলছে ওই রাতে সেখানে ২৫০ থেকে ৩০০ জনকে হত্যা করা হয়েছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ওয়্যারলেসের সংলাপেও হত্যার এমন সংখ্যার উল্লেখ পাওয়া যায়।

জগন্নাথ হলে হত্যার শিকার হন চারজন শিক্ষক, ৩৬ ছাত্র এবং ২১ কর্মচারী ও অতিথি। ছয় ছাত্রকে পাকিস্তানি সেনারা কবর খোঁড়ার কাজে লাগায়। এরপরও তারা বাঁচতে পারেনি। ইকবাল হলে ওরা ১১ ছাত্রকে লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে গুলি করে। এরপর রোকেয়া হলে আগুন ধরিয়ে দিলে ছাত্রীরা হল থেকে দৌড়ে বের হয়ে আসে। তাদের তখন মেশিনগান দিয়ে অবিরাম গুলি করা হয়। অনেককে হত্যা করা হয় বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে।

রশীদ হায়দার সম্পাদিত “১৯৭১: ভয়াবহ অভিজ্ঞতা”, অধ্যাপক রতন লাল চক্রবর্তীর সম্পাদনায় “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণহত্যা: ১৯৭১ জগন্নাথ হল”, রঙ্গ লাল সেন সম্পাদিত “বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান” নামের গ্রন্থ এবং মেজর সিদ্দিক সালিক (ঢাকার সে সময়ের মার্কিন কনসাল জেনারেল) কর্তৃক মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে পাঠানো “উইটনেস টু সারেন্ডার” শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্যের উল্লেখ রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে ছিলেন মোহাম্মদ রিয়াজউদ্দিন। ২৫ মার্চে রাতে কী কী দেখেছিলেন তিনি?

তার ভাষায়, “২৫ মার্চ সকাল থেকেই হল ছাড়তে থাকেন ছাত্ররা। শেষে ছিলাম মাত্র ৪১ জনের মতো। ডাইনিং বন্ধ। রাতের খাবারের জন্য চলে যাই সচিবালয়ের পেছনে, চিটাগাং রেস্টুরেন্টে। হঠাৎ সাঁজোয়া যানের শব্দ। দেখলাম আর্মির কনভয় যাচ্ছে। ওদের চোখেমুখে হিংস্রতার ছাপ। দ্রুত হলের উত্তর গেটে আসতেই শুরু হয় কামানের গর্জন। গোলাগুলিরও শব্দ পাই অবিরত।”

“আমরা চার বন্ধু হলের ছাদে অবস্থান নেই। নানা শঙ্কায় কাটে গোটা রাত। ওরা আগে আলোর মতো একটা গুলি ছোঁড়ে। এরপরই ফায়ার করতে থাকে। রাত দুইটার পর দেখি পুরান ঢাকার দিকে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। চারপাশে শুধু গুলি, চিৎকার আর মানুষের কান্নার শব্দ। ফজরের আজান পড়েছে তখন। কিন্তু আজানের সময়ও পাকিস্তানি সেনারা গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছিল। কেন জানি ওরা ফজলুল হক হলে আসেনি। ফলে দৈবক্রমে বেঁচে যাই আমরা।”

“২৬ মার্চ ভোরবেলায়, শহিদুল হক হলে অ্যাটাক হয়। ছয়জনের লাশও পড়ে ছিল। আর্মিরা আমাদের হলে আসে। আমরা যে যার মতো লুকিয়ে থাকি। আমি চলে যাই তিনতলায়, ৩৫২ নম্বর রুমের বারান্দায়।”

“ওরা এলে দারোয়ান বলে, ‘এই হলে ভাল ছাত্ররা থাকে। ছুটির কারণে সবাই বাড়ি চলে গেছে। এখন কেউ নাই, স্যার'। কিন্তু বাংলাদেশের একটি পতাকা তখনও হলের সামনে পতপত করে উড়ছিল। তা দেখে আর্মিরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে, অশ্লীল একটা গালি দিয়ে দারোয়ানের ওপরই চড়াও হয়। এরপর পতাকাটি নামিয়ে বুটের তলায় কিছুক্ষণ মাড়িয়ে তাতে তারা আগুন ধরিয়ে দেয়। রাগে চারদিকে কয়েক রাউন্ড গুলিও ছোঁড়ে। একটি গুলি এসে পড়ে আমার ঠিক সামনেই। কোনো প্রত্যুত্তর না পেয়ে আর্মিরা তখন অন্যত্র চলে যায়। ফলে মৃত্যুর খুব কাছাকাছি থেকেই ফিরে আসি।”

একাত্তরে তৌফিকুর রহমানরা থাকতেন সরকারি কোয়ার্টারে, চাঙ্খারপুলের রশিদ বিল্ডিংয়ে। ২৫ মার্চের রাতের কথা স্মরণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, “সারা রাত গোলাগুলির শব্দ। ওরা যে গণহত্যা চালিয়েছে এটা ক্লিয়ার হই ভোরের দিকে। গেটের বাইরে গিয়েই থ বনে যাই। রাস্তা সুনসান। হঠাৎ কার্জন হলের দিক থেকে একটা আর্মিদের জিপ আসে। জিপে এলএমজি ফিট করা। ওরা ফায়ার করতে করতে আসছে। স্যান্ডেল ফেলে দৌড়ে দেয়াল টপকে কোনোরকমে বাসায় চলে আসি। বাসার সামনে টং দোকানে একটা ছেলে সিগারেট বিক্রি করতো, বরিশাল বাড়ি তার। দোকানের ভেতর থেকে সে বের হতে গেলে তাকেও গুলি করে হত্যা করে ওরা।”

/সংগৃহীত

“পরে ভয়ে ভয়ে জগন্নাথ হলের দিকে যাই আমি। রাতে ওদিকেই গুলির শব্দ হচ্ছিল। দূর থেকে দেখলাম অনেক মানুষের গুলিবিদ্ধ ডেডবডি পড়ে আছে। কারো মাথায়, কারো বুকে, কারো পেটে গুলি লেগেছে। কয়েকজনকে বেওনেট দিয়ে খুঁচিয়েও মারা হয়েছে। রক্তের গন্ধ তখনো ছড়াচ্ছিল। এক রাতে ওরা ফুলবাড়িয়া রেললাইনের দুই পাশের বস্তিগুলোও পুড়িয়ে দেয়। মানুষের আর্তচিৎকারে ভারি হয়ে ওঠে ঢাকার বাতাস।”

বজলুল মাহমুদ বাবলুর বাড়ি ঢাকার সেন্ট্রালরোডে। তিনি বলেন, “সারা রাত শুনেছি মানুষের আর্তচিৎকার ও গুলির শব্দ। পরেরদিন কয়েক ঘণ্টার জন্য কারফিউ ওঠে। মানুষ তখন ঢাকা থেকে পালাতে থাকে। মোড়ে মোড়ে বন্দুক তাক করে দাঁড়িয়ে পাকিস্তানি আর্মি। নিউ মার্কেটের দিকে এগোতেই দেখি লাশের স্তূপ। পলাশী হয়ে ইকবাল হলের দিকে যেতেই চোখে পড়ে শত শত লাশ। ওইদিন ঢাকার রাজপথে ছিল পচা লাশের গন্ধ।”

কামরুল আমানরা থাকতেন নারায়ণগঞ্জে। ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাদের গণহত্যার কথা তিনি তুলে ধরেন এভাবে, “কারফিউ চলছিল। তা শিথিল হতেই রওনা হই ঢাকার দিকে। মাতুয়াইলে এসে দেখি রাস্তার ঢালে পড়ে আছে সাত থেকে আটজনের গলাকাটা লাশ। তাদের কখন মারা হয়েছে কেউ জানেন না। দেহ তখনও কই মাছের মতো নড়ছিল। এ যেন জিন্দা লাশ! বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় গিয়ে দেখি একজনের হাতের কব্জি বেরিয়ে এসেছে মাটির ওপরে। তারপরে ছুটে যাই শাঁখারি পট্টিতে। কী নির্মমভাবে ওরা মানুষ পুড়িয়েছে! কোর্ট বিল্ডিংয়ের পাশেই শাঁখারি পট্টির প্রবেশমুখ। সেটি বন্ধ করে আগুন দিয়ে দেয় পাকিস্তানি সেনারা। সবাই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কয়েকটি বাড়িতে তখনও আগুন জ্বলছিল। একটি বাড়িতে পা রাখতেই গা শিউরে ওঠে। মানুষ পুড়ে তার চর্বি গলে মেঝেতে পড়ে আছে। তাতে পড়েছে আমার পা। এর চেয়ে ভয়াবহ আর মর্মান্তিক দৃশ্য আর কী হতে পারে!”

২৫ মার্চে ঢাকার গণহত্যায় শহিদদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা এখনও প্রণয়ন করা হয়নি, সংরক্ষণ করা হয়নি গণহত্যার স্থানগুলোও। বরং নিশ্চিহ্ন ও দখল হয়ে গেছে একাত্তরের অনেক স্মৃতিস্থান। সবই রক্ষার দায়িত্ব ছিল রাষ্ট্রের।

এ ছাড়া ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে পাকিস্তানি সেনারা এ দেশে যে সীমাহীন গণহত্যা চালিয়েছে, তার জন্য এত বছরেও ক্ষমা চাওয়া তো দূরের কথা ন্যূনতম দুঃখ প্রকাশও করেনি পাকিস্তানের কোনো সরকার, বিচার করেনি তৎকালীন একজন জেনারেলেরও। ওই সময়ে পাকিস্তানি সেনাদের বর্বরতাকে গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে আন্তর্জাতিক সংস্থা “জেনোসাইড ওয়াচ” ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান “লেমকিন ইনস্টিটিউট ফর জেনোসাইড প্রিভেনশন”।

গত অক্টোবর মাসে “১৯৭১ সালে বাংলাদেশে গণহত্যার স্বীকৃতি” শীর্ষক ৮ পৃষ্ঠার একটি প্রস্তাবও তোলা হয় যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে। তা বাংলাদেশের পক্ষে গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে সহায়ক হবে বলে মনে করেন অনেকেই। কিন্তু এ বিষয়ে প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় বিশেষ উদ্যোগ। একাত্তরে পাকিস্তানি সেনাদের গণহত্যার অপরাধ প্রমাণের তথ্য-উপাত্ত ও প্রামাণ্য সংগ্রহের উদ্যোগ গ্রহণ এবং তা তুলে ধরার মাধ্যমে বিশ্ব জনমত গড়ার কার্যকরী কর্মসূচি নিতে হবে সরকারকেই। কিন্তু সে উদ্যোগ কবে প্রকাশ্য হবে?

About

Popular Links