Friday, May 24, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

বাড়িতে প্রসবের কারণে ব্যর্থ হচ্ছে মাতৃমৃত্যু কমানোর প্রচেষ্টা

বিগত দুই দশকে বাংলাদেশে ৭২% মাতৃমৃত্যু কমেছে

আপডেট : ২৮ মে ২০২৩, ০২:০৪ পিএম

সম্প্রতি রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলায় বাড়িতে সন্তান প্রসবের সময় রাহিমা আক্তার নামে এক প্রসূতির মৃত্যু হয়। প্রসববেদনা ওঠার পর গ্রামের ধাত্রীর মাধ্যমে তার প্রসবের চেষ্টা করানো হয়। পরে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি মারা যান। এ পদ্ধতিতে প্রসব করাতে গিয়ে রাহিমার নবজাতক কন্যাও মারা যায়।

দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, এখনও বাংলাদেশ এবং বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় ধাত্রীর মাধ্যমে বাড়িতে প্রসবের চেষ্টা খুবই সাধারণ আর নিয়মিত একটি ঘটনা। মাতৃমৃত্যুর হার কমাতে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাড়িতে প্রসবের কারণে সে পদক্ষেপগুলো বিফলে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অদক্ষ ধাত্রী দিয়ে বাড়িতে প্রসব, প্রসব-পরবর্তী রক্তপাত, উচ্চ রক্তচাপ, গর্ভধারণের সময় সংক্রমণ ও অনিরাপদ গর্ভপাতই হলো মূলত মাতৃমৃত্যুর কারণ। বিগত দুই দশকে বাংলাদেশে ৭২% মাতৃমৃত্যু কমেছে। তবে সরকার এ হার আরও নিচে নামিয়ে আনতে চায়।

হাসপাতালে কোনো খরচ ছাড়াই দক্ষ চিকিৎসক ও নার্সদের সহায়তায় অনেক নরমাল ডেলিভারি করা হচ্ছে এবং সরকারিভাবে তাদের বিভিন্ন উপহারসামগ্রীও দেওয়া হচ্ছে। তবুও অসচেতনভাবে অনেকেই বাড়িতে বাচ্চা প্রসব করানোর চেষ্টা করাতে গিয়ে মাতৃমৃত্যুর মতো দুঃখজনক ঘটনা ঘটছে।

দেশের মাতৃমৃত্যু হারের কারণগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রক্তক্ষরণে ৩১%, একলামশিয়া ২৪%, পরোক্ষ কারণে ২০%, অনির্ধারিত কারণে ৮%, গর্ভপাত জটিলতায় ৭%, অন্যান্য কারণে ৭% এবং অমানুষিক পরিশ্রমে ৩% মৃত্যু হয়। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এ বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে সবাইকে এগিয়ে আসা উচিত।

নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস

রবিবার (২৮ মে) নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস। ১৯৯৭ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৮ মে দিনটিকে নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস ঘোষণা করেন। ১৯৯৮ সাল থেকে দেশব্যাপী দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে বাংলাদেশে ৩০ লাখ ৮৮ হাজার জীবিত শিশুর জন্ম হয়েছিল। অন্যদিকে, সরকারের ২০১৬ সালের মাতৃস্বাস্থ্য জরিপের তথ্যমতে, দেশে এক লাখ শিশুর জন্ম দিতে গিয়ে ১৯৬ জন মায়ের মৃত্যু হয়েছে।

“মাতৃমৃত্যুর প্রবণতা: ২০০০ থেকে ২০২০ সাল” শীর্ষক বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, ইউএনএফপিএ, বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের যৌথ প্রতিবেদনে মাতৃমৃত্যুর প্রতিবেদনে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে বলা হয়, ২০ বছরে দেশে মাতৃমৃত্যু ৭২% কমেছে। এরপরও প্রতিদিন প্রসবকালীন জটিলতায় ১০ মায়ের মৃত্যু হচ্ছে।

প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০২০ সালের হিসাবে এক লাখ শিশু জন্ম দিতে গিয়ে ১২৩ মায়ের মৃত্যু হচ্ছে। দুই দশক আগে, অর্থাৎ ২০০০ সালে এ সংখ্যা ছিল ৪৪১। বছরে বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যু ৬.৫% হারে কমছে।

সরকারের লক্ষ্য

জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও প্রসূতি মায়ের দক্ষ সেবা নিশ্চিতের বিষয়টি অগ্রাধিকার দিয়ে বর্তমান সরকার বেশ কিছু কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি লাখে ৭০ জনে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। বর্তমানে প্রতি লাখে মাতৃমৃত্যু ১৬৫ জন এবং বিগত ১০ বছরে প্রতি লাখে তা ৯৪ জন কমেছে।

বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ

অবস্টেট্রিকাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের (ওজিএসবি) মহাসচিব অধ্যাপক ডা. গুলশান আরা জানান, ৩০% মাতৃমৃত্যুই হয় প্রসব পরবর্তী রক্তক্ষরণের কারণে। গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপের কারণে ২৪% মাতৃমৃত্যু আর বাকিগুলো গর্ভকালীন সংক্রমণ ও বিভিন্ন ইনফেকশনের কারণে হয়ে থাকে।

তিনি বলেন, “আমাদের দেশে এখনও ভালোভাবে গর্ভকালীন পরিচর্যা নেওয়া হয় না। গর্ভাবস্থায় মায়েদের এন্টিনেটাল চেকআপ খুবই জরুরি। কিন্তু আমাদের ৪৭% মায়েরা চারটি এন্টিনেটাল চেকআপ নেয়। বাকিগুলো নিতে যে হবে, সেটিও জানে না। একইসঙ্গে হসপিটাল ডেলিভারি বাড়াতে হবে, ডেলিভারির পর যে কেয়ার নেওয়া হয়, সেটিও বাড়াতে হবে।”

পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের পরিচালক (মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা) ডা. মো. মাহমুদুর রহমান জানান, গত বছরে ৫০% ডেলিভারি বাড়িতে হতো, যেটা এখন ৩৫% হয়েছে।

তিনি বলেন, “আমরা চেষ্টা করছি বাড়িতে যেন প্রসব না হয়। কারণ বাড়িতে প্রসব হলে পরবর্তী সময়ে রক্তপাতসহ বেশ কিছু জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। এ কারণে আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি বাড়িতে যেন কোনো ডেলিভারি না হয়। আর এটা করতে পারলে ২০৩০ সালের মধ্যে এক লাখে মৃত্যু ৭০ এর নিচে নামিয়ে আনতে পারব।”

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক জানান, সরকারি হাসপাতালে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ডেলিভারি করা হয়। আমাদের আরও প্রাতিষ্ঠানিক ডেলিভারি বাড়াতে হবে। তাহলে শিশু ও মাতৃমৃত্যু কমে যাবে।

About

Popular Links