Saturday, June 15, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

চিকিৎসকের ভুলে সেন্ট্রাল হাসপাতালে নবজাতকের মৃত্যু, মরণাপন্ন মা

এ ঘটনায় চিকিৎসক ও নার্স মিলিয়ে ১১ জনকে বরখাস্ত করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ

আপডেট : ১৫ জুন ২০২৩, ১২:৫৫ পিএম

মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে ডেলিভারি এবং পরবর্তী জটিলতায় জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে প্রসূতি। চিকিৎসকদের অবহেলায় জন্মের পরপরই মৃত্যু হয় নবজাতকের। এসব অভিযোগ চিকিৎসক, নার্স, আয়াসহ ১১ জনকে তাৎক্ষণিক বরখাস্ত করেছে রাজধানীর গ্রিনরোড এলাকার সেন্ট্রাল হসপিটাল কর্তৃপক্ষ।

হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. আফসানা বিনতে গাউস গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। 

ভুক্তভোগী প্রসূতির নাম মাহবুবা রহমান আঁখি। তিনি ইডেন কলেজ থেকে সম্প্রতি স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। জানা গেছে, গত তিন মাস ধরে সেন্ট্রাল হাসপাতালের গাইনি ও প্রসূতি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সংযুক্তা সাহার পর্যবেক্ষণে ছিলেন সন্তানসম্ভবা আঁখি। স্বাভাবিকভাবেই সন্তান প্রসব সম্ভব বলে তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন ওই চিকিৎসক।

স্বজনদের অভিযোগ, গত ৯ জুন আঁখির সন্তান প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ ছিল। সেন্ট্রাল হাসপাতালে গেলে বলা হয়, ডা. সংযুক্তাই তার ডেলিভারির কাজটি করবেন।

কিন্তু ডেলিভারির সময় ওই চিকিৎসক হাসপাতালে ছিলেন না। স্বজনরা বলছেন, ডা. সংযুক্তার সঙ্গে যে দলটি লেবার ওয়ার্ডে কাজ করে তারাই মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে আঁখিকে অস্ত্রোপচারের টেবিলে নিয়ে যান।

সূত্র জানায়, ডা. সংযুক্তা সাহা শুক্রবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টায় হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যান। রাত দেড়টায় তিনি বিদেশের ফ্লাইট ধরেন। 

আঁখির স্বামী মো. ইয়াকুব আলী সুমন বলেন, “ডা. সংযুক্তা সাহা উপস্থিত আছেন কি-না, একাধিকবার তাদের কাছে জানতে চেয়েছি। কিন্তু তারা কোনো সদুত্তর না দিয়ে অভিভাবকদের অনুমতি ছাড়াই আমার স্ত্রীকে লেবার রুমে নিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর এসে ভর্তি বাবদ ১০ হাজার টাকা জমা দিতে বলে হাসপাতালের কর্মীরা। রাত ৩টার দিকে জানানো হয়, আমার স্ত্রী ছেলে সন্তান প্রসব করেছেন। শারীরিক অবস্থা ভালো না হওয়ায় নবজাতককে আইসিইউতে রাখা হয়েছে। এদিকে, লেবার রুমে গিয়ে দেখি আমার স্ত্রীর হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আছে। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হলে আমি পুলিশে জানাই।”

“এরপর প্রশাসনের সহযোগিতায় স্ত্রীকে দ্রুত ল্যাবএইড হাসপাতালে নিয়ে যাই।”

ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরে আঁখির বান্ধবী উম্মে মায়া বৃষ্টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট করেছেন। বিষয়টি নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে সেন্ট্রাল হাসপাতালের সার্বিক ব্যবস্থাপনা এবং ডা.সংযুক্তা সাহার বিরুদ্ধে।   

উম্মে মায়া বৃষ্টি লিখেছেন, “...গত শুক্রবার রাতে সেন্সলেস হয়েছে। এখন পর্যন্ত সে অবস্থায় আছে। ডাক্তার বলেছে ইমপ্রুভমেন্ট  হওয়ার চান্স নেই। তার কিডনি, লিভার, হার্ট  কিছুই কাজ করছে না। ব্রেন স্টোক করেছে, রক্তক্ষরণও বন্ধ হচ্ছে না। রক্তক্ষরণ বন্ধ না হওয়ায় শরীরের অন্য অংশগুলো কাজ করতে ব্যর্থ, গত চার দিন ধরে প্রচুর পরিমাণে রক্ত দিতে হচ্ছে এবং যতক্ষণ নিঃশ্বাস চলবে ততক্ষণ রক্ত দিতে হবে।”

শঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “রক্তক্ষরণ বন্ধ হওয়ার কোনো উপায় নেই, তাই ডাক্তার বলেছে এভাবে কতক্ষণ তাকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে তা বলার উপায় নেই। ল্যাবএইড চিকিৎসকরা মেডিকেল টিম বসিয়ে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তারা ব্যর্থ, কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছেন না।”

তার অভিযোগ, “সেন্ট্রাল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সিসিটিভি ফুটেজ এবং যারা সেদিন ডেলিভারির সময় উপস্থিত ছিল তাদের আড়াল করে রেখেছে। তারা বাচ্চাটাকে মেরে ফেলছে। আমার বান্ধবীকেও জীবিত লাশ বানিয়ে দিয়েছে।”

হাসপাতালের দিকে অভিযোগের তীর ছুড়ে তিনি বলেন, “চিকিৎসকের অবহেলায় আমার বান্ধবী মৃত্যুপথযাত্রী। ডেলিভারি ইস্যুত গ্রিনরোডের সেন্ট্রাল হাসপাতালে গেলে চেকআপ ছাড়াই তাকে কাটাছেঁড়া করে।”

বৃষ্টির অভিযোগ, “লেবার টিমের লোকজন কোনোরকম চেক-আপ ছাড়াই ডেলিভারির কাজ শুরু করে দেন। ডেলিভারির সময় উপস্থিত ডা. মিলি আমার বান্ধবীকে প্রেশার দিতে বলেন। একপর্যায়ে অনেকক্ষণ চেষ্টা করার পর তারা সাইড কাটেন। তাদের অদক্ষতায় আঁখির মূত্রনালী ও মলদ্বার কেটে যায়। প্রচণ্ড রক্তক্ষরণে আমার বান্ধবী জ্ঞান হারায়। ওই অবস্থায় তারা আমার বান্ধবীকে আবার সিজার করে বাচ্চাটাকে বের করেন এবং কাটা জায়গা সেলাই করে দেন । সেন্সলেস হওয়ায় বাচ্চার হার্টবিট কমে যায়। তাই ডেলিভারির সাথে সাথেই তাকে আইসিইউতে নিতে হয়।”

এদিকে, আঁখির শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকলে হাসপাতাল থেকে তার স্বামীকে বলা হয়, “আপনার বাচ্চার অবস্থা খুবই খারাপ আমরা আপনার বাচ্চাকে আইসিউতে ভর্তি করে দিয়েছি। আঁখির তখন বার বার ডা. সংযুক্তা কোথায় জানতে চাইলে জবাব আসে, ‘ডাক্তার দেশের বাইরে আছেন'।” 

তখন প্রশ্ন ওঠে, “তাহলে অপারেশন করল কে?” এ পরিস্থিতিতে আঁখির স্বামী জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করেন। পুলিশ এলে সেন্ট্রাল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, তাদের এখানে সিসিইউ কিংবা এনআইসিইউ নেই, প্রসূতিকে অন্য কোথাও নিতে হবে। এরপর আঁখিকে ল্যাবএইডের লাইফ সাপোর্টে ভর্তি করা হয়। 

ল্যাবএইডে স্থানান্তরের পর সেন্ট্রাল হাসপাতাল জানায় নবজাতক মারা গেছে।

এ বিষয়ে সেন্ট্রাল হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. আফসানা বিনতে গাউস বলেন, “এ ঘটনায় আমরা একটা তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। সেদিন অপারেশন থিয়েটারে উপস্থিত ১১ চিকিৎসক-নার্সের সবাইকে বরখাস্ত করা হয়েছে। বুধবার থেকেই তদন্ত কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। তদন্ত প্রতিবেদন পেলে সেদিন কী ঘটেছিল জানতে পারব।”

About

Popular Links