Tuesday, May 28, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

আসামি ধরতে গিয়ে থানা পুলিশের বিরুদ্ধে ভাঙচুরের অভিযোগ

ফরিদপুর গ্রামের কমপক্ষে ২০ বাড়ির পুরুষরা এখন পুলিশের ভয়ে বাড়িছাড়া বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা

আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০২২, ১২:২৩ এএম

আসামি ধরতে গিয়ে গাজীপুরের শ্রীপুর থানা পুলিশের বিরুদ্ধে বাড়িঘর ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। এ সময় নারী ও শিশুসহ বাড়ির বেশ কয়েকজনকে পুলিশ সদস্যরা মারধর করেন বলেও দাবি ভুক্তভোগীদের।

উপজেলার গাজীপুর ইউনিয়নের ফরিদপুর গ্রামের একাধিক পরিবারের অভিযোগ, শনিবার (২৩ এপ্রিল) দিবাগত রাতে শ্রীপুর থানার কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাদের বাড়িতে গিয়ে এ ধরনের হয়রানি করেন।

তারা বলছেন, এ ঘটনার পর পুলিশের ভয়ে তাদের বাড়ির পুরুষরা আপাতত এলাকাছাড়া।  রবিবার দুপুরে ফরিদপুর গ্রামে গিয়ে পরিবারগুলোর এ দাবির সত্যতা মিলেছে।

গ্রামের বাসিন্দা আলমগীর হোসেনের মেয়ে ফারজানা ও আফছানার ভাষ্য, “শনিবার দিবাগত রাত আনুমানিক ১টার দিকে পুলিশের পোশাক পরা বেশ কয়েকজন দুটি গেট ভেঙে আমাদের বাড়িতে ঢোকে। ঘরে ঢুকেই তারা আমাদের বাবাকে গালিগালাজ ও মারধর করে। বাধা দিলে আমাদের মাকে অশ্লীল গালি দিয়ে চুল ধরে টেনে লাঠি দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করে। পরে তারা বাবাকে খালি গায়েই ধরে নিয়ে যায়।”

গ্রামের আরেক বাসিন্দা মনির হোসেনের স্ত্রী হালিমা খাতুন বলেন, “গভীর রাতে লোকজনের আওয়াজ শুনে বাইরে বেরোলে পুলিশ ধমক দিয়ে ঘরে যেতে বলে।রাত ১১টা থেকে ২টা পর্যন্ত চারবার বাড়িতে পুলিশের সদস্যরা আসেন। তারা একাধিক ঘরে ঢুকে বিছানাপত্র, আলনা, ফ্রিজসহ অন্যান্য আসবাবপত্র ভাঙচুর করে।”

এই নারীর অভিযোগ, এক পর্যায়ে তার অসুস্থ (চিকেন পক্সে আক্রান্ত) ছেলে জুবায়ের হোসেনকে (১২) বিছানা থেকে টেনে হিঁচড়ে নামায় পুলিশ সদস্যরা। তারা রান্নাঘরের চারটি চুলা, পানির পাইপ ও কল ভেঙে ফেলে। এসময় “পুলিশের গায়ে হাত দেওয়ার মজা বুঝে নে” বলে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজও করা হয়।

তিনি বলেন, “পানির কল, ফ্রিজ, রান্নার চুলা ভাঙচুর ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নের পর বাড়িতে এখন রান্না বন্ধ। তারা বাড়ির নারীদেরও ধরে নিয়ে যাওয়ার হুমকি দিয়ে গেছে। সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) শাহীনুর ইসলাম এবং উপ-পরিদর্শক (এসআই) নাজমুল হকসহ বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য এবং তাদের সোর্স মাসুদ ও মামুন আমার বাড়িতে এসেছিলেন। আমরা এ হয়রানির বিচার চাই।”

স্থানীয় লাইছুদ্দিনের বাড়িতে বেড়াতে আসা শামসুন্নাহার জানান, পুলিশ পরিচয়ে কয়েকজন রাত আনুমানিক ১২টার দিকে গেট ভেঙে ঘরে ইসাহাক নামে স্থানীয় শ্রমিককে বেদম মারধরের পর ধরে নিয়ে যায়।

আব্দুল খালেকের ছেলে আমিনুল জানান, রাত ১২টার পর পুলিশ সদস্যরান তাদের বাড়িতে ভাঙচুর চালায়। এ সময় তাদের সঙ্গে স্থানীয় তরুণ মাসুদ এবং মামুনও ছিল। বাড়িতে কোনো পুরুষ সদস্যকে না পেয়ে তার মা অমিনা খাতুনকে হাতকড়া লাগিয়ে কিছুদূর নেওয়ার পর ছেড়ে দেয় পুলিশ।

এ বিষয়ে শ্রীপুর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) নাজমুল হক জানান, ঘটনার রাতে তিনি ওই এলাকায় দায়িত্বরত ছিলেন। পুলিশের একাধিক টিম সেদিন ফরিদপুর গ্রামে আসামি ধরতে গিয়েছিল। 

তিনি এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে রাজি হননি। এরপর এ বিষয়ে জানতে থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আবু রায়হানের সঙ্গে কথা বলতে বলেন এসআই।

জানতে চাইলে এএসআই আবু রায়হান বলেন, “বাড়িতে হামলা বা ভাঙচুরের যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে সেগুলো মিথ্যা এবং সাজানো। যারা পুলিশের ওপর হাত তুলতে পারে তারা এমন ঘটনাও সাজাতে পারে। আমরা আসামি ধরতে গিয়েছিলাম। আলমগীর হোসেন, সিরাজুল ইসলাম ও ইসাহাক নামে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে রবিবার আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে।”

এ অভিযোগের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে কালিয়াকৈর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) আজমীর হোসেন বলেন, “বাড়িঘরে ভাঙচুরের ঘটনা জানা নেই। তবে পুলিশের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ পেলে তদন্ত করা হবে।”


কেন সেদিন গ্রামে গিয়েছিল পুলিশ

সম্প্রতি কাপাসিয়া উপজেলার বাসিন্দা মাহমুদা জমির বায়না হিসেবে ফরিদপুরের রমজান আলী মুন্সিকে ৫ লাখ ১০ হাজার টাকা দেন। পরে উভয়পক্ষের মতের মিল না হওয়ায় পুলিশকে বিষয়টি মৌখিকভাবে জানায় একপক্ষ। যার পরিপ্রেক্ষিতে শুক্রবার সন্ধ্যায় রমজান আলী মুন্সির বাড়িতে এএসআই শাহীনুর ইসলামের আহ্বানে সালিশ বৈঠক বসে।

বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, রমজান আলী ওই নারীকে ৪ লাখ টাকা ফেরত দেবেন। এ সময় বাকি ১ লাখ ১০ হাজার টাকা নিয়ে বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয় বিবাদমান পক্ষ দুটির মধ্যে। 

এদিকে, চার লাখ টাকা স্ট্যাম্পের মাধ্যমে ফেরত দেওয়ার প্রস্তাব করেন রমজান আলী মুন্সীর ভাতিজা লাইছুদ্দিন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে এএসআই শাহীনুর ইসলাম উপস্থিত ব্যক্তিদের সামনে লাইছুদ্দিনকে মারধর করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। 

এরপর সালিশে উপস্থিত কয়েকজন ওই এএসআইয়ের ওপর চড়াও হন বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে এএসআই মো. শাহিনুর ইসলাম বলেন, “থানায় অভিযোগ করা মাহমুদা নামের এক নারীর জমি বায়নার টাকা দেওয়ার কথা থাকলে ঘটনাস্থলে যাই। সেখানে গেলে অভিযুক্ত লাইছুদ্দিন সম্পূর্ণ টাকা না দিয়ে টালবাহানা করে। এ সময় চার লাখ টাকা দিয়ে বায়না করা স্ট্যাম্প জোর করে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। আমি স্ট্যাম্প রক্ষা করতে গেলে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এতে অভিযুক্ত লাইছুদ্দিনের নাক থেকে সামান্য রক্ত বের হয়। পরবর্তীতে তিনি উপস্থিত জনতাকে উসকানিমূলক কথা বলে খেপিয়ে তোলেন। এরপর কয়েকজন আমার শরীরের সরকারি পোশাক ধরে টানাহেঁচড়া করে মারধর শুরু করেন। এ সময় আমার সঙ্গে থাকা পুলিশ সদস্যরা থানায় অবহিত করলে অতিরিক্ত পুলিশ গিয়ে আমাকে উদ্ধার করে।”

এ ঘটনায় পরবর্তীতে এএসআই মো. শাহিনুর আটজনের নামে মামলা দায়ের করেন। ওই মামলার আসামিদের ধরতেই শনিবার রাতে ফরিদপুর গ্রামে অভিযান চালায় পুলিশ।

About

Popular Links