Friday, May 24, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

‘যাত্রী-পরিবহন শ্রমিকেরা অসহায়’, ভাড়া নৈরাজ্যের সমাধান যে পথে

এখন মালিকেরা দৈনিক ভিত্তিতে একটা বাস চালক-সুপারভাইজারের কাছে ছেড়ে দিচ্ছেন। মালিককে আড়াই হাজার তিন হাজার টাকা দিতে হয়। শ্রমিকেরা করবে কি?

আপডেট : ০৯ আগস্ট ২০২২, ০৮:২০ পিএম

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পরপরেই পরিবহন সংশ্লিষ্ট নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে বাসের ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। ঢাকার জন্য ২২% ভাড়া বাড়ানো হলেও বিভিন্ন গণপরিবহন এই সিদ্ধান্তের তোয়াক্কা করছে না। তারা বলছে, বাসের মালিক যে ভাড়া নির্ধারণ করে দিয়েছেন সেই ভাড়াই তাদের নিতে হচ্ছে।

এ নিয়ে প্রতিদিনই বাসের কর্মচারীদের সঙ্গে যাত্রীদের বাকবিতণ্ডা হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটছে।

এমন পরিস্থিতির কথা স্বীকার করেছেন পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্লাহ। তিনি বলেছেন, বুধবার (১০ আগস্ট) থেকে তারা মনিটরিং করতে মাঠে নামবেন। তাদের ১১টি দল মাঠপর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেবে।

বাসের ভাড়া নিয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সত্যতা যাচাই করতে রবিবার বাসে চড়েছিলেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্লাহ। তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেছেন, ‘‘মিরপুরের পল্লবী থেকে বনানীর সৈনিক ক্লাব পর্যন্ত আমি বাসে চড়েছি। বাসটির নাম সম্ভবত মক্কা পরিবহন। আগে এই দূরত্বে ২০ টাকা নেওয়া হতো। এদিন আমার কাছে ৩০ টাকা চাওয়া হয়। আমি বাসের সুপারভাইজারকে বললাম, সরকার ২২% ভাড়া বৃদ্ধি করেছে তাতে ভাড়া হওয়ার কথা ২৪ টাকা। কিন্তু কেন ৩০ টাকা চাচ্ছেন? তিনি জবাবে বললেন, মালিকেরা ভাড়া নির্ধারণ করে দিয়েছেন, এই টাকাই দিতে হবে। না দিলে আপনি নেমে যেতে পারেন।” বিষয়টি পরে দলীয় ফোরামে জানিয়েছেন জাফরউল্লাহ।

এই চিত্র শুধু কাজী জাফরউল্লাহর সঙ্গেই ঘটছে এমনটি নয়। অন্য যাত্রীদের কাছ থেকেও একইভাবে ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। এ নিয়ে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন যাত্রীরা।

ঢাকা ট্রিবিউন

আমরা বসে নেই, বলছেন বিআরটিএ কর্মকর্তারা

এসব অভিযোগের প্রসঙ্গে বিআরটিএর পরিচালক (রোড সেফটি) শেখ মোহাম্মদ মাহবুব-ই-রব্বানী ডয়চে ভেলেকে বলেছেন, ‘‘ভাড়া নির্ধারণের পর আমরা বসে আছি, এই কথাটি ঠিক না। প্রতিদিনই আমরা ৮-১০টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছি। যারা অতিরিক্ত ভাড়া নিচ্ছেন তাদের জরিমানা করছি, গাড়ি ডাম্পিং করছি। ইতোমধ্যে ভাড়ার তালিকা সব জায়গায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু তো এনফোর্সমেন্ট দিয়ে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। মানুষকে সচেতন হতে হবে, পরিবহন মালিক-শ্রমিকদেরও আইন মান্য করতে হবে। মোবাইল কোর্ট দিয়ে আমরা কয়টা বাস ধরতে পারব?”

সংকট তৈরি করতে ‘ইচ্ছেকৃত’ রাস্তায় বাস কমাচ্ছেন মালিকেরা

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি কোম্পানির ৮০-৯০টি বাসের মধ্যে একটি বাসকে জরিমানা করলে মালিকদের কী এসে যায়? এভাবে কাজ হবে না। খোদ রাজধানীতেই যদি এমন বিশৃঙ্খলা হয় তাহলে অন্য শহরগুলোর অবস্থা কী? যাত্রীরা কার কাছে বিচার চাইবে, তাও বুঝতে পারছে না। ফলে অধিকাংশ মানুষ বাসের মধ্যে কোনো ঝামেলায় না গিয়ে বাস স্টাফদের দাবি করা অতিরিক্ত টাকা দিয়েই নিরবে চলে যাচ্ছেন। দুই একজন যারা প্রতিবাদ করছেন তাদের বাসের কর্মচারীদের কাছে হেনস্তার শিকারও হতে হচ্ছে। তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর থেকে রাজধানীতে বাস কমিয়ে দিয়েছেন মালিকেরা। ফলে অতিরিক্ত টাকা দিয়েও বাস পাওয়া যাচ্ছে না।

সোমবার রাজধানীর ফার্মগেটে বাসের জন্য অপেক্ষায় থাকা ব্যাংক কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেছেন, ‘‘মালিকেরা ইচ্ছে করেই এখন বাস নামাচ্ছেন না। রাস্তায় বাস কম থাকলে যাত্রীরা অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে খুব বেশি উচ্চবাচ্য করবে না। এই সুযোগে তারা অতিরিক্ত ভাড়াটাকেই নিয়মিত ভাড়া বানিয়ে তারপর রাস্তায় নামাবে বাস। ৯ মাস আগে একবার বাস ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। এখন আবার বাড়ানো হলো। এই সময়ের মধ্যে কী আমাদের বেতন বেড়েছে? এভাবে সাধারণ মানুষ টিকবে কিভাবে?”

ফাইল ছবি মেহেদি হাসান/ঢাকা ট্রিবিউন

পরিবহন শ্রমিকেরা করবে কি?

অবশ্য বাংলাদেশ পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘রাস্তায় বাস কমানো হয়েছে, এটা ঠিক না। ২০১১ সালে বাসের সংখ্যা ছিল ১১ হাজার। আর এখন বাস আছে পাঁচ হাজার। এই ১১ বছরে ব্যাংক তুলে নিছে, নষ্ট হয়ে গেছে সব মিলিয়ে ছয় হাজার বাস নেই। ফলে বাসই কমে গেছে। ব্যবসা হচ্ছে না বলে মালিকেরা এখন আর নতুন বাস নামাতে চাইছেন না। সবাই তো খালি শ্রমিকদের দোষ দেয়, এখন মালিকেরা দৈনিক ভিত্তিতে একটা বাস চালক-সুপারভাইজারের কাছে ছেড়ে দিচ্ছেন। তুমি যাই আয় কর না কেন মালিককে আড়াই হাজার তিন হাজার টাকা দিতে হবে। শ্রমিকেরা করবে কি? টাকা তো তাকে তুলতে হবে। আবার সকালে বাস নিয়ে বের হওয়ার পর রাতে জমা দেওয়ার সময় বলছে আমার চাকরি নেই। চাকরির নিশ্চয়তা কে দেবে? আমরা তো বলছি, নিয়োগপত্র দেন, দৈনিক ভাড়ার চুক্তি বাদ দেন তাহলে দেখবেন দুর্ঘটনাও কমবে, শৃঙ্খলাও ফিরবে।’’

বিআরটিএর নির্ধারণ করা মহানগরীতে সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা। অর্থাৎ বর্ধিত ভাড়া অনুসারেই এই টাকায় চার কিলোমিটার পথ যাওয়ার কথা। মোহাম্মদপুর থেকে বনশ্রী রুটে চলাচল করা স্বাধীন পরিবহনের যাত্রী আমিরুল ইসলাম বললেন, ‘‘মোহাম্মদপুর থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত ৩.৩ কিলোমিটার। এখানে ভাড়া নিচ্ছে ১৫ টাকা। যা এতদিন আদায় করা হতো ১০ টাকা। সরকার নির্ধারিত বর্ধিত হারে এই ভাড়া এখন ১০ টাকাই হওয়ার কথা। কিন্তু বাসের স্টাফরা সেটা মানছেন না।’’

কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে কোম্পানির বিরুদ্ধে

যাত্রীদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘সরকার ভাড়া বাড়িয়েছে কিলোমিটার হিসাবে। রাজধানীর বাসে আগে যে বাড়তি ভাড়া নিত, তার সঙ্গে আবার নতুন করে পাঁচ থেকে ১০ টাকা যোগ করেছে। আমাদের অভিযোগটাও সেই জায়গায়। বিআরটিএর জরিমানায় কাজ হচ্ছে না। একটা পরিবহনের বাস যদি ৮০টি হয়, একটি বাসকে জরিমানা করল, তাহলে বাকি ৭৯টি বাস তো নৈরাজ্য চালাচ্ছেই। অতীতে যে রকম লোক দেখানো অভিযান চালানো হয়েছে, ওই ধরনের অভিযান দিয়ে এই অভিযোগ নিষ্পত্তি করা যাবে না। কোম্পানির প্রধানকে ধরে আনতে হবে। ধরে এনে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নিতে হবে। বাস স্টপেজগুলোতে ডিজিটাল ভাড়ার তালিকা টানাতে হবে। বিআরটিএ যেটা ভাড়ার তালিকা দেয়, এটা তো সাধারণ যাত্রীরা বোঝে না। এই ধরনের গোঁজামিল থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এই গোঁজামিল অতিরিক্ত ভাড়াকে উৎসাহিত করে।’’

About

Popular Links