Monday, May 27, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা: যেদিন মৃত্যুখাদ থেকে ফিরে এসেছে গণতন্ত্র

২১শে আগস্টের হামলা ছিল শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে শেষ করে বাংলাদেশকে একদলীয় রাষ্ট্রে পরিণত করার চক্রান্ত

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০২২, ০৪:১০ পিএম

২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট ঢাকায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার এক সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় প্রাণ হারিয়েছিলো ২৪ জন। ঘটনাটি একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলা হিসেবে পরিচিত।

ওই হামলায় আশেপাশের এলাকাই শুধু কেঁপে ওঠেনি বরং এটি নাড়িয়ে দিয়েছিল পুরো দেশকে।

তৎকালীন বিএনপি-জামাত সরকারকে হামলার জন্যে প্ল্যান-বি তে যেতে হয়েছিল। তবে সেই সময় বিরোধীদলীয় নেত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা অল্পের জন্য মৃত থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন। যদিও আজও তিনি সেই হামলার পরিণতি বহন করছেন নিজের শরীরে।

ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে বিএনপি-জামাত সরকার কোনো প্রচেষ্টা বাদ রাখেনি। ক্ষতিগ্রস্তদের দোষারোপ করা, দ্রুত সমস্ত প্রমাণ নষ্ট করা, মামলা নথিভুক্ত না করা ও অভিযানের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে জজ মিয়ার নাটক উত্থাপন করে।

একদিকে যখন সরকার নিজেদের অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, অপরদিকে তারা দায়ীদের দায়মুক্তি দিতে বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করছিল। যেন ভবিষ্যতেও ন্যায় বিচার করা সম্ভব না হয়।

আরেক ১৫ আগস্টের ফিরে আসা

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তার পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যকে হত্যার প্রায় ৩০ বছর পর শেখ হাসিনাকে হত্যার চক্রান্ত যে তার পরিবার ও দলকে নিশ্চিহ্ন করার অপচেষ্টা সেটি জনগণ ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিল।

বঙ্গবন্ধুর অকাল মৃত্যু দেশে একটি পাকিস্তানপন্থী, ভারত-বিরোধী ও ধর্মভিত্তিক সরকারকে ক্ষমতায় এনেছিল। যাদের নেপথ্যে সমর্থনে ছিলেন সেনাবাহিনীর সেকেন্ড-ইন-কমান্ড মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। অভ্যুত্থানের এক সপ্তাহের মধ্যে জিয়া সেনাপ্রধান হন ও ইনডেমনিটি আইন পাস করে ঘাতকদের রক্ষা করেন এবং বিদেশে পাঠিয়ে দেন।

পঁচাত্তরের গণহত্যা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠন ও জামাত-ই-ইসলাম এর পুনর্বাসন ঘটিয়েছিল। স্বাধীনতার পরে জাতির পিতার নিষিদ্ধ করা দলটি ফের রাজনীতিতে ফিরতে পেরেছিল।

২১শে আগস্টের হামলা ছিল রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে সমমনা সশস্ত্র জঙ্গি গোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্ষমতা দখলে বিএনপি-জামাতের মাস্টার প্ল্যানের একটি অংশ।

শেখ হাসিনা যেখান থেকে সমাবেশে বক্তব্য রাখছিলেন, সেই ট্রাক ও আশপাশের এলাকায় গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। হাসিনাকে তার দলীয় সহকর্মী এবং নিরাপত্তা কর্মীদের দ্বারা গঠিত একটি মানব ঢাল দ্বারা রক্ষা করা হলেও বিস্ফোরণের কারণে তিনি শ্রবণ প্রতিবন্ধী হয়ে পড়েন।

এতে মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী আইভি রহমানসহ অন্তত ২৪ জন নিহত এবং কয়েক শতাধিক গুরুতর আহত হন।

হুজি ও হাওয়া ভবন

আলামত নষ্ট করা ছাড়াও মাস্টারমাইন্ডরা ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে আহতদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে বাধা দেয়।

এছাড়া আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা মামলা করতে চাইলে পুলিশ সেই মামলা নেয়নি।

তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ওই ঘটনার জন্যে পাকিস্তান-ভিত্তিক জঙ্গি গোষ্ঠী হরকাত-উল-জিহাদ আল-ইসলামির (হুজি) বাংলাদেশ শাখার উপর দোষ চাপাতে চেয়েছিলেন।

তিনি বলেন, জঙ্গিরা নিজেদের স্বার্থে আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করতে চায় এবং বিএনপি এতে জড়িত নয়।

কিন্তু আদালতের রায়ের উপসংহারে বলা হয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ, ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কিছু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সহযোগিতায় হরকাতুল জিহাদ (হুজি) বাংলাদেশ ঘটনাটি ঘটিয়েছিল।

এমনকি গোয়েন্দা কর্মকর্তারা হুজি-বি নেতা মাওলানা তাজউদ্দিনকে পাকিস্তানে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছিল।

এই অপরাধীরা জেনারেল জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানের বিকল্প ক্ষমতাকেন্দ্র হাওয়া ভবনের সঙ্গেও যুক্ত ছিল। তারাই ২০০৪ সালের ৪ এপ্রিল জব্দ করা দশ ট্রাক অস্ত্র ও গোলাবারুদ চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত ছিল।

সরকারি সাহায্যে ছড়ানো হয় অস্ত্র

৯০-এর দশকে আল-কায়েদা প্রধান ওসামা বিন লাদেনের সঙ্গে দেখা করা আফগান যুদ্ধের অভিজ্ঞ সৈনিকদের নিয়ে গঠিত হুজি-বি ১৯৯২ সালে দেশে প্রকাশ্যে কার্যক্রম শুরু করে। তখন জেনারেল জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপি প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসে।

সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার জন্য কুখ্যাত জঙ্গি গোষ্ঠীটি দ্রুতই বিভিন্ন উপায়ে সারাদেশে শিকড় বিস্তার করে। এছাড়া তারা রোহিঙ্গা সংহতি সংস্থাসহ (আরএসও) বিভিন্ন আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে।

১৯৯৯ সালে হুজি-বি সশস্ত্র আক্রমণ শুরু করে। তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগ নেতা, বামপন্থী, সাংস্কৃতিক কর্মী, অমুসলিম এবং অ-সুন্নি জনগণ।

পরের বছর তারা গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় শেখ লুৎফর রহমান আইডিয়াল কলেজের মাঠে ৭৬ কেজি ওজনের বোমা পুঁতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করে। যেখানে ২০০২ সালের ২২ জুলাই এক সমাবেশে তার বক্তৃতা রাখার কথা ছিল। সেই সভার একদিন আগে ৭৬ কেজির বোমাটি এবং পরে একই স্থান থেকে ৪০ কেজি ওজনের আরেকটি বোমা উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

একই সময়ে হাওয়া ভবনের সহায়তায় দেশে আল-কায়েদা-সমর্থিত জঙ্গি গোষ্ঠী জামাআতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশের (জেএমবি) উত্থান হয়। এই সংগঠনের প্রধান নেতা আবদুর রহমান জামালপুরের জামাতের সাবেক নেতা। কিন্তু আদর্শগত পার্থক্যের কারণে তিনি হুজির সঙ্গে একীভূত হননি।

২০০৪ সালের ২১শে আগস্টের মধ্যেই আওয়ামী লীগ, বামপন্থী, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী, অমুসলিম এবং অ-সুন্নি জনগোষ্ঠীর জন্য একটি মারাত্মক হুমকি হয়ে ওঠে জেএমবি। কারণ এরইমধ্যে তারা স্থানীয় সংসদ সদস্য, সরকারি কর্মকর্তাদের সমর্থনে সারাদেশে নিজেদের লক্ষ্যবস্তুতে মারাত্মক হামলা চালিয়েছিল।

তারেক রহমানের হাওয়া ভবন জেএমবি এবং হুজিকে সর্বাত্মক সমর্থন দিয়েছিলেন।

ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তাদের মতে, তারেকের সহযোগী বাবর ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব কামালউদ্দিন সিদ্দিকীর সঙ্গে এ নিয়ে নানা আলোচনা হয়।

অপরাধকে আড়াল করেছে সরকার

২১শে আগস্টের নৃশংসতার ধারাবাহিকতায় পাঁচ মাস পর আবারও হামলা চালানো হয়।

২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জের বৈদ্যের বাজারে এক সমাবেশে হামলায় সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়াসহ আওয়ামী লীগের পাঁচ নেতা-কর্মী নিহত হন। এতে ৭০ জনেরও বেশি আহত হন।

হামলার দুই দিন আগে ঢাকায় তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত হ্যারি কে থমাস ওয়াশিংটনকে লিখেছিলেন, এই ধরনের ঘটনাগুলো সমাধানে সরকারের অক্ষমতা বা অনিচ্ছার কারণে এই জল্পনা তৈরি হচ্ছে যে, অপরাধীরা রাজনৈতিক সুরক্ষা পাচ্ছে।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনার তদন্তের জন্য ইউএস ব্যুরো অব অ্যালকোহল, টোব্যাকো, ফায়ারআর্মস অ্যান্ড এক্সপ্লোসিভসকে (এটিএফ) ডাকার পর এই কূটনীতিক ওই মন্তব্য করেন।

হামলার তদন্তে ২৭শে জানুয়ারি মার্কিন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সহায়তা চেয়ে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিজা রাইসের সঙ্গেও কথা বলেন খালেদা জিয়া।

থমাস ৭ ফেব্রুয়ারি খালেদার সঙ্গে দেখা করেন। খালেদা তাকে বলেন, “এই হামলায় আমরা খুবই উদ্বিগ্ন”।

তিনি থমাসকে এই দুঃখজনক অপরাধের ঘটনা উদঘাটনে একটি উন্মুক্ত তদন্তের জন্য নিজের আগ্রহের কথা ব্যক্ত করেন। এছাড়া দেশে স্বচ্ছ ইমেজ থাকায় এফবিআই পাঠানোর কথা বলেন।

হামলার ঘটনায় মার্কিন সরকারের নিন্দা ও অপরাধ বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেন থমাস।

তিনি খালেদা জিয়াকে বলেন, “আমরা গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতাকে সমর্থন করতে ও চরমপন্থীদের উপকার করে এমন কাজ বন্ধ করতে বাংলাদেশ সরকারের সাথে কাজ করতে চাই”।

২১ আগস্টের হামলার পরে তৎকালীন সরকারের ওপর ভরসা করায় রাষ্ট্রদূত থমাস এক ধরনের বিভ্রান্তির মধ্যেই ছিলেন।

বৈঠকের বিষয়ে একটি বার্তায় রাষ্ট্রদূত লিখেছেন, “২১শে আগস্টের হামলার পর আমাদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আমরা গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করছি। কারণ, বাংলাদেশ সরকার প্রধান সাক্ষীদের প্রকাশ্যে আনেনি। এমনকি অপরাধের ঘটনাকে আড়াল করেছে।”

২১ শে আগস্টের ঘটনা মোকাবিলায় ওয়াশিংটনের অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে থমাস কিবরিয়া হত্যার তদন্তে মার্কিন আইন প্রয়োগকারী পরামর্শদাতাদের সম্পৃক্ত করতে আগ্রহী হয়েছিলেন।

তিনি খালেদাকে বলেন, “আমরা সরকারের স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি চাই যে, ওই ঘটনায় মার্কিন তদন্তকারীদের পুরোপুরি স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া হবে।”

তদন্তে মার্কিন কর্মকর্তাদের কাজের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনায় তাগিদ দিয়েছিলেন।

কর্মকর্তাদের বাধা দিলে তারা তদন্ত ছেড়ে চলে যাবেন ও সেসব প্রকাশ্যে ব্যাখ্যা করা হবে বলেও হুশিয়ারি দেন রাষ্ট্রদূত।

থমাস বলেন, স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের ২১শে আগস্ট ঢাকায় হামলা ও ২০০৪ সালের ২১মে সিলেটে যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর হামলার তদন্তের তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছিল।

About

Popular Links