Wednesday, May 22, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

দাম্পত্য কলহে দুই সন্তানকে হত্যা, মাকে মরদেহ দেখতে দেয়নি গ্রামবাসী

প্রতিবেশীরা বলছেন, এ ঘটনায় বাবার পাশাপাশি মায়ের অপরাধ রয়েছে। বাবা-মায়ের ঝগড়ার কারণে এমন ঘটনা ঘটেছে। এ জন্য দুজনেরই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত

আপডেট : ২৬ নভেম্বর ২০২২, ০৭:৪৯ পিএম

বাবা-মায়ের দাম্পত্য কলহের জেরে দিনাজপুরের বিরলে বাবার হাতে বিষপানে হত্যার শিকার দুই শিশুসন্তানের মুখ শেষবারের মতো মাকে দেখতে দেয়নি গ্রামবাসী। স্থানীয়দের বাধার মুখে সন্তানদের খাটিয়ার কাছেও যেতে পারেননি ওই মা।

শনিবার (২৬ নভেম্বর) বেলা ২টায় জানাজা শেষে উপজেলার কেন্দ্রীয় কবরস্থানে দুই শিশুকে দাফন করা হয়। 

উপজেলার শংকরপুর ঘোড়ানী গ্রামের শরিফুল ইসলাম-কুলসুম দম্পতির ছেলে রিমন (৭) ও ইমরানকে (৩) গত বৃহস্পতিবার রাতে বিষপানে হত্যা করেন বাবা শরিফুল। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। ওই মামলায় শরিফুলকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রের বরাতে অনলাইন সংবাদমাধ্যম বাংলা ট্রিবিউন এক প্রতিবেদনে জানায়, শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে দুই শিশুর মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে দাদার বাড়ি শংকরপুর ঘোড়ানী গ্রামে নেওয়া হয়। সেখানে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। কান্নায় ভেঙে পড়েন দাদি আছিয়া খাতুন ও বাকরুদ্ধ হন দাদা রফিকুল ইসলাম। তাদের কান্না দেখে প্রতিবেশীরাও কাঁদেন। সেইসঙ্গে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা। 

প্রতিবেশীরা বলছেন, এ ঘটনায় বাবার পাশাপাশি মায়ের অপরাধ রয়েছে। বাবা-মায়ের ঝগড়ার কারণে এমন ঘটনা ঘটেছে। এ জন্য দুজনেরই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।

এদিকে, জানাজার আগে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে দুই শিশুর মা কুলসুম বানু মরদেহ দেখতে এলে প্রতিবেশীরা বাধা দেন। শেষবারের মতো সন্তানদের মুখ দেখতে চাইলেও সুযোগ দেননি তারা। বারবার অনুরোধ করলে প্রতিবেশীরা তার দিকে তেড়ে যান। এ সময় কুলসুমকে ঘরের ভেতরে নিয়ে যান প্রতিবেশী সাইফুল ইসলাম। পরে ঘরের দরজা-জানালা লাগিয়ে দেন তিনি।

এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলে কুলসুম বানু সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলবেন না বলেও জানান সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, “কথা বলার পরিস্থিতি নেই। কুলসুম সন্তানদের বাবার কাছে রেখে ঢাকায় চলে যাওয়ার পর তালাকের নোটিশ দেওয়ায় এ ঘটনা ঘটেছে। এ জন্য স্থানীয়রা তার ওপর ক্ষুব্ধ।” 

দীর্ঘদিন ধরে শরিফুল ও কুলসুমের পারিবারিক কলহ চলছে। একপর্যায়ে কুলসুম ঢাকায় গিয়ে তালাকনামা পাঠিয়ে দেন। শরিফুল সন্তানদের নিয়ে ঢাকায় গিয়েছিলেন স্ত্রীকে বোঝাতে। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। বরং সেখানে “নির্যাতনের শিকার” হন তিনি। পরে সন্তানদের নিয়ে বাড়ি ফিরে আসেন। এরই পরিণতি দুই সন্তানের মৃত্যু।

দুই শিশুর চাচা রাশেদুল ইসলাম আশিক বলেন, “ছোটবেলা থেকেই দুই ভাতিজাকে সন্তানের মতো দেখতাম। এ ঘটনায় আমার ভাই যেমন দায়ী, ভাইয়ের স্ত্রীও দায়ী। পুলিশ আমার ভাইকে গ্রেপ্তার করেছে, তার সাজা হোক। একইসঙ্গে কুলসুমেরও সাজা হোক- এটাই আমাদের চাওয়া।” 

প্রতিবেশী মো. ফিরোজ বলেন, “স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া-বিবাদের কথা শুনেছি আমরা। কিন্তু বিষয়টি এতদূর গড়াবে বুঝতে পারিনি। দুজনের ঝগড়ার কারণে দুই শিশুর প্রাণ গেলো। এ ঘটনায় দুজনের শাস্তি চাই।”

স্থানীয় বাসিন্দা আজাহার আলী বলেন, “এমন ঘটনার জন্য দুজনের শাস্তি হওয়া দরকার। তাদের যেন ফাঁসি হয়। এ ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে।”

দিনাজপুর সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শেখ মোহাম্মদ জিন্নাহ আল মামুন বলেন, “দুই শিশুকে হত্যার ঘটনায় মা কুলসুম বানু মামলা করেছেন। মামলায় শরিফুল ইসলামকে আসামি করা হয়েছে। তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মামলার তদন্তে যদি কুলসুমের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায় তাহলে তাকেও আইনের আওতায় আনা হবে।”

প্রসঙ্গত, দীর্ঘদিন ধরে শংকরপুর ঘোড়ানী গ্রামের শরিফুল ইসলামের সঙ্গে স্ত্রী কুলসুমের পারিবারিক কলহ চলছিল। বিষয়টি সমাধানের জন্য একাধিকবার সালিশ-বৈঠক হয়েছে। কিন্তু কোনো সমাধান হয়নি। কয়েকমাস আগে কুলসুম ঢাকায় পোশাক কারখানার কাজে যোগ দেন। দুই সন্তানকে স্বামীর কাছে রেখে যান। এরই মধ্যে স্বামীকে তালাক নোটিশ দেন কুলসুম। কয়েকদিন আগে তালাকের নোটিশ আসে শরিফুলের কাছে। এ নিয়ে মোবাইলে তাদের বাগবিতণ্ডা হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার রাতে শীতের পোশাক কিনে দেওয়ার কথা বলে দুই সন্তানকে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন শরিফুল। যাওয়ার সময় তাদের দাদি আছিয়া খাতুনকে বিষয়টি বলে যান। ওই সময় দাদি নিষেধ করলেও শোনেননি শরিফুল। ওই দিন রাত থেকে তাদের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। পরদিন সকালে দুই শিশু ভবানীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আছে বলে তাদের দাদিকে জানান শরিফুল। সেখানে গিয়ে দুই শিশুর মরদেহ দেখতে পান দাদি। বিষয়টি পুলিশকে জানালে বিদ্যালয়ের পরিত্যক্ত ঘর থেকে দুই শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

About

Popular Links