Saturday, May 18, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

হাতিরঝিল ভরাট করে চলছে এক্সপ্রেসওয়ের কাজ

অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, জলাধার সংরক্ষণের কোন আইন মেনে হাতিরঝিল ভরাট করছে সেটা আমার জানা নেই। এভাবে জলাধার ভরাট করতে পারে না

আপডেট : ১০ মে ২০২৩, ০৬:৩৩ পিএম

জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে এখন বিশ্বব্যাপী “প্রাণ-প্রকৃতিকে” রক্ষা করার আহ্বান জানানো হচ্ছে। দেশে দেশে নানা পদক্ষেপও গ্রহণ করা হচ্ছে। বাংলাদেশও প্রাণ-প্রকৃতিকে রক্ষা করার আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা রাখার প্রতিশ্রুতি বারবার ব্যক্ত করেছে।

ঢাকা শহরের বাসযোগ্যতা হুমকির সম্মুখীন। ঢাকা বায়ু দুষণের দিক থেকে বিশ্বের অন্যতম একটি শহর। এর সঙ্গে বেড়েছে তাপমাত্রার পারদ। ফলে ঢাকার বাসযোগ্যতা স্বাভাবিকে ফেরাতে সরব হয়েছেন পরিবেশবাদীরা। ঠিক এই সময়ে জানা যাচ্ছে, হাতিরঝিলের কারওয়ান বাজারের অংশ ভরাট করছে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে কর্তৃপক্ষ। ইতিমধ্যে এ অংশের ইস্কাটনের বিয়াম ফাউন্ডেশন পর্যন্ত ভরাট করা হয়েছে। 

ঢাকায় পানির উৎস দিন দিন কমে যাচ্ছে। সম্প্রতি ঢাকায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এই অভাব আরও বেশি অনুভব করেছেন নগরবাসী। বিশ্লেষকেরা বলছেন, শহরে কমপক্ষে ১৫% প্রাকৃতিক জলাধার থাকা দরকার। কিন্তু বাস্তবে তা ৪-৫%-এরও কম। একসময় ঢাকায় দুই হাজারের বেশি জলাধার থাকলে কমতে কমতে এখন তা ২৯টিতে দাঁড়িয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে, হাতিরঝিল ভরাটের পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছেন সচেতন নাগরিক ও পরিবেশবাদীরা।

ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে কর্তৃপক্ষ বলছে, এ অংশের কাজ নিয়ে আলোচনা ওঠার পরে তারা কাজ বন্ধ রেখেছে। সোমবারের পর থেকে আর ভরাট করা হচ্ছে না। হাতিরঝিলের এ অংশের পিলার তুলতে লেকের একটি অংশ ভরাট করা হবে। কাজ শেষে ভরাট করা বালু সরিয়ে নেওয়া হবে।

পরিবেশবাদী ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক যুগে লেকে মাটি না ফেলেও পিলারের কাজ করা যায়। এভাবে পরিবেশ ধ্বংস করে জলাধার ভরাট করতে পারে না সরকারি সংস্থা। কাজ শেষে খালি করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা মানে না সংস্থাগুলো।

এছাড়া কাঁঠালবাগান, কারওয়ান বাজার, বাংলামোটর, পান্থপথসহ বিভিন্ন এলাকার পানি লেকে এসে জমা হয়; বৃষ্টির সময় এতে বিশৃঙ্খলা ঘটে জলাবদ্ধতার আশঙ্কা রয়েছে।

এক সমরেজমিন প্রতিবেদনে ইংরেজি ভাষার সংবাদমাধ্যম টিবিএস জানায়, হাতিরঝিলের কারওয়ান বাজার অংশের (হোটেল প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও) রেললাইন থেকে বিয়াম ফাউন্ডেশনের গেট পর্যন্ত লেক ভরাট করে বালু সমান করা হচ্ছে কয়েকটি স্কেভেটর দিয়ে। যদিও লেকের পানির মধ্যে সীমানা নির্ধারণ করে দেওয়া আছে কতটুকু ভরাট করবে। তবে দেখা যায় সীমানার থেকেও কয়েকগুণ বেশি অংশ ভরাট করা হচ্ছে বালু দিয়ে।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, চীনা কোম্পানি সিনোহাইড্রো থেকে নিয়োগকৃত এ এলাকার স্টোর অফিসার মাহমুদুল হাসান সংবাদমাধ্যমটিকে বলেছেন, পিলার স্থাপনের কাজের জন্য লেকে বালু দিয়ে ভরাট করা হচ্ছে। পাইলিং শেষে মাটি আবার সরিয়ে নেওয়া হবে।

ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের (ডিএই) প্রকল্প পরিচালক এএইচএমএস আকতার বলেন, “সোমবার হাতিরঝিলের এ অংশের কাজ নিয়ে আলোচনা ওঠার পরে এখন আপাতত কাজ বন্ধ আছে। যা ভরাট করা হয়েছে সোমবার পর্যন্ত। নতুন করে সিদ্ধান্ত আসার পরে কাজ করা হবে।” 

তবে মঙ্গলবারও স্কেভেটর দিয়ে বালু আলগা করে ভরাটের কাজ করতে দেখা গেছে বলে জানিয়েছেন নাট্যকর্মী ও শিক্ষক দীপ্ত আলম শেখ।

তিনি ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “পরিবেশ রক্ষার প্রশ্নটা এখন সর্বাগ্রে। ঢাকা শহরের নানামুখি সমস্যা রয়েছে। এখানকার জলাধারগুলো রক্ষা ও উদ্ধারের দাবি উঠেছে। এই সময় হাতিরঝিল লেক ভরাট করার সিদ্ধান্ত কোনোভাবে যুক্তিসঙ্গত হতে পারে না। বর্ষায় জলাবদ্ধতার বিষয়টিও ভাবতে হবে।”

রাজউকের প্রধান প্রকৌশলী (প্রকল্প ও নকশা) এএসএম রায়হানুল ফেরদৌস বলেন, “হাতিরঝিলের এ অংশ ভরাটের জন্য লিখিত কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি। তাদের কাজের সুবিধার্থে ছয় মাসের মৌখিকভাবে কিছু অংশ ভরাটের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তারা পিলার স্থাপনের কাজ শেষে লেক খালি করে দেবে। সরকারি প্রকল্প চলাকালে এভাবে ভরাট করে কাজ করা যেতে পারে। এটাতো প্রাইভেট কোনো কাজ না। এছাড়া লেকের মধ্যে কোনো পিলার বসবে না।”

তবে, লেক ভরাট কাজের সমালোচনা করেছেন ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান।

তিনি বলেন, “আধুনিক যুগে যখন নানা ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয় পাইলিং করার ক্ষেত্রে, সেখানে হাতিরঝিলের মতো জলাধার ভরাট করে কেন খুঁটি বসাতে হবে? জলাধার সংরক্ষণের কোন আইন মেনে হাতিরঝিল ভরাট করছে সেটা আমার জানা নেই। এভাবে জলাধার ভরাট করতে পারে না।”

তিনি বলেন, “এক্সপ্রেসওয়ের মূল পরিকল্পনায় এ ধরনের ডিজাইন ছিল না যে হাতিরঝিলের ওপর দিয়ে এর লাইন যাবে। এ অংশের কাজের মাধ্যমে যেমন লেক ধ্বংস করবে, তেমনি রাস্তাও নষ্ট করবে। আমরা বিভিন্ন সময় অবৈধভাবে জলাধার ভরাট করতে দেখেছি কিন্তু এভাবে আয়োজন করে জলাধারের এতো বড় একটি অংশ ভরাট দেখিনি। এ অংশ পুনরায় খালি করতে পারবে কিনা আমার সন্দেহ। বাংলাদেশে মেগা প্রকল্পের নামে যে মেগা অত্যাচার চলছে এর শেষ কোথায় জানা নেই।”

ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রায় ৪১টি খুঁটি হাতিরঝিল লেকে পড়বে; এতে লেকের সৌন্দর্য বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে রাজউক একটি প্রতিনিধি দল।

গত সোমবার স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলামের সঙ্গে এক সভায় তারা এই আশঙ্কার কথা জানান।

About

Popular Links