Friday, May 24, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

মশা মারার ওষুধের প্রতিক্রিয়ায় বাড়ছে মানুষের রোগ

বিশেষজ্ঞদের মতে, মশার ওষুধের ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়ায় হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, ক্যান্সার, ফুসফুস, কিডনির রোগসহ নানা রোগের ঝুঁকি বাড়ছে

আপডেট : ৩১ মে ২০২৩, ০৬:৩৪ পিএম

দেশে প্রতি বছর লাখো মানুষ মশাবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়। গ্রীষ্ম-বর্ষার সময়ে নিয়মিত এটির প্রকোপ দেখা দিচ্ছে। বাংলাদেশে ২০২৩ সালের  ১৫ মে সকাল পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১২৬১ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসেব বলছে, ২০২৩ সালে ১৫ মে পর্যন্ত ঢাকায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন ৭৩৬ জন রোগী। ঢাকার বাইরে ভর্তি হয়েছেন ৫২৫ জন। এর মধ্যে  মারা গেছেন ১২ জন।

অন্যদিকে ২০২২ সালের ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ২৮১ জন, ২০২১ সালে ১০১ জন, ২০২০ সালে ১৬৪ ও ২০১৯ সালে ১৭৯ জনের মৃত্যু হয়।

মশা একটা বড় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। এ ঝুঁকি কমাতে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনসহ সারাদেশেই  মশার প্রজনন রোধে চলছে ফগার মেশিনে স্প্রেসহ নানা কার্যক্রম।  তবে একদিকে স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে গিয়ে অন্যদিকে বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মশার ওষুধের ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়ায় হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, ক্যান্সার, ফুসফুস, কিডনির রোগসহ নানা রোগের বিপদ বাড়ছে। ঢাকার বাতাস কতটা দূষিত তা এমনিতেই অনুমেয়। উপরন্তু অতিরিক্ত এই বিষবাষ্প দিয়ে মশা নিধন অভিযান মানবদেহের কতটা ক্ষতি হচ্ছে তার কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও ফগিংয়ে পারমেখ্রিন, টেট্রামিন, ডল্টামেক্সনিয়ের মতো রাসায়নিক ব্যবহার করার ফলে শ্বাসতন্ত্রের ক্ষতিসহ তৈরি হতে পারে ক্যান্সার ও কিডনি রোগ। মশার ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ও পণ্যের হার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলোর মান ও প্রয়োগ নিয়েও রয়েছে সংশয়।

তাই এডিস মশার জৈবিক নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দেয়া উচিত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এডিস মশা নিধনে জনসচেতনতা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বংশবৃদ্ধির জায়গাগুলো পরিষ্কার রাখা সর্বোপরি পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি এই ওষুধ যত্রতত্র না ছিটিয়ে এডিসের প্রজননক্ষেত্রগুলােতে সঠিক ডোজে ছেটানো উচিত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

একই সঙ্গে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের জন্য একদল দক্ষ কর্মী দরকার, যারা এডিস মশার প্রজননস্থল সম্পর্কে নূন্যতম জ্ঞান রাখবে। কারণ এডিস মশার প্রজননস্থল ছােট জায়গায়, এই কিউলেক্স মশা দমনের ওষুধ যত্রতত্র ছেটানো হলে এডিস দমন সম্ভব নয়।

সম্প্রতি খুলনা বিভাগ থেকে আমাদের প্রতিনিধির পাঠানো এক প্রতিবেদনে উঠে আসে, মশা নিধনে ফগার মেশিনে ঔষধ ছেটানোর মধ্য দিয়ে স্বাস্থ্য ঝুঁকির চিত্র।

মশা নিধনে খুলনা সিটি কর্পোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডেই এখন ফগার মেশিনে ওষুধ ছেটানো হচ্ছে। এর ফলে এলাকা ধোঁয়াচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে। এর মধ্যেই শিশুরা দৌড়াদৌড়ি করছে। এতে শিশু স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তবে ঘরে থেকেও কতটুকু নিরাপদ এ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

মশার ওষুধের ধোঁয়া শুধু শিশু স্বাস্থ্যের জন্য নয়, সবার জন্যই ক্ষতিকর। এ বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি জরুরি বলে মনে সিটি কর্পোরেশনগুলোর স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা।

ঢাকার কলাবাগান লেক সার্কাস রোডের বাসিন্দা রুনা বেগম। দুই সন্তান ও স্বামী নিয়ে ৪ তলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় বসবাস। প্রায় ৬ মাস ধরে এ বাসায় থাকছেন তিনি। রুনা বেগম জানান, দুই দিন মশার স্প্রে না করলেই মশার যন্ত্রণায় ঘরে থাকা যায় না। পাশের ভবনটি কাউন্সিলরের বাসা হওয়ায় প্রতি সপ্তাহে  ২-৩ বার করে ফগার দিয়ে স্প্রে করা হয়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে স্প্রে করলে মশা থেকে বাঁচলেও স্প্রের যে ধোঁয়া, গন্ধ তাতে খুব অসুবিধা হয়। মাথা ঝিম ঝিম, গলায়, চোখেমুখে জ্বালা পোড়া হয় ভীষণ। বিশেষ করে বাচ্চারা বেশি ভুক্তভোগী।

একই কথা জানালেন শুক্রাবাদ এলাকার বাসিন্দা শারমিন আক্তার। তিনি বলেন, “স্প্রে করছে ঠিকই, মশাও কমছে, কিন্তু স্প্রে করার জন্য আগাম কোনো সতর্কতা দেয়া হয় না। দেখা যায়, তখন আমরা কেউ ঘরে খাচ্ছি, ঘুমাচ্ছি। দরজা, জানালা খোলা অবস্থা, রাস্তায় মানুষ চলাচলরত অবস্থাতেই স্প্রে করে দিয়ে যাচ্ছে। এতে ধোঁয়াটা সরাসরি দেহে প্রবেশ করছে। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি কমার বদলে বাড়ছে।”

একটি বেসরকারি হাসপাতালের চাকরিরত মোহাম্মদপুর শিয়া মসজিদ এলাকার বাসিন্দা মামুন মৃধা জানান, প্রায়ই দেখি মশার ওষুধ দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু যে স্প্রে করছে তার কোনো সুরক্ষা ব্যবস্থা নেই একটি মাস্ক ছাড়া।

এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. ফজলে শামসুল কবির দাবি করেন, “ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন যে কীটনাশক স্প্রে করছে তা মশা ছাড়া সকল ধরনের প্রাণীর জন্য সম্পূর্ণ ঝুঁকিমু্ক্ত। এ কীটনাশক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রাপ্ত দুটি ল্যাব থেকে পরীক্ষা করে টেস্টের রেজাল্ট পজিটিভ আসার পরেই আমরা ব্যবহার  করি। পরিবেশ মন্ত্রণালয় থেকেও আমাদের কাছে জানতে চেয়েছিল, আমরা তাদের জানিয়েছি, ফগার মেশিনের ধোঁয়ায় কিছুটা সমস্যা হলেও  অন্য কোনো ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা নেই। তিন মাসের বাচ্চারাও নিরাপদ।”

“আমরা এখন দুই ভাগে কাজ করছি। এক ফগার দিয়ে কীটনাশক স্প্রে করছি আরেকটি সকালের দিকে এডিস মশার লার্ভা নিধনে পানিতে কীটনাশক ছেটানো হচ্ছে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে।

এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বিগ্রেডিয়ার জেনারেল জোবায়দুর রহমান বলেন, “ফগারের মাধ্যমে যে কীটনাশক মেশানো পানি স্প্রে করা হচ্ছে তার কিছু ক্ষতিকর দিক রয়েছে তা তো অবশ্যই। যেমন অ্যাজমা রোগী, শিশুদের জন্যও এটি ক্ষতিকর। তবে আমরা এ কীটনাশক  একটি নিদিষ্ট পরিমাণ বা মাত্রায় ব্যবহার করি যাতে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি না হয়।”

এদিকে খুলনা শহরের টুটপাড়ার বাসিন্দা আকাশ শাহ বলেন, “প্রতি সপ্তাহেই কেসিসির লোকেরা এসে ফিগার মেশিনে কীটনাশক প্রয়োগে পুরো এলাকা ধোঁয়াচ্ছন্ন করে তোলে। বড়রা সতর্ক থাকলেও শিশুরা ওই ধোঁয়ার মধ্যেই ছোটাছুটি করে থাকে যা তাদের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।”

গোবরচাকার জব্বার মোল্লা বলেন, “ফিগার মেশিনের শব্দ পেলেই শিশুরা ঘর থেকে বেরিয়ে ছুটে সেখানে চলে যায়। আর ওই ধোঁয়ার কুণ্ডলীর মধ্যেই খেলায় মেতে ওঠে। যা ওষুধ ছেটানো লোকেরা কোনো আমলেই নেন না।”

বাগানবাড়ির জাহেদা বেগম বলেন, “বিকেল হলেই মশা মারার ধোঁয়া দেওয়া হয়। ওই ধোঁয়ার মধ্যে শিশুরা ছুটে বেড়ায়। যা ওদের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু এটা কেউ দেখছে না।”

কেসিসির কনজারভেন্সি বিভাগের প্রধান আব্দুল আজিজ বলেন, “মশা তাড়াতে ফিগার মেশিনে ব্যবহার করা ওষুধ তেমন জটিল কোনো প্রভাব না ফেললেও কিছুটা ক্ষতিকর প্রভাব আছে। তাই আগামীতে সংশ্লিষ্টদের এ বিষয়ে সতর্কতা পালন করতে নির্দেশ দেয়া হবে।”

কেসিসির স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. স্বপন হালদার বলেন, “মশার ওষুধের ধোঁয়া শিশু স্বাস্থ্যের জন্যই কেবল নয়, সবার জন্যই ক্ষতিকর। এ বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি করাও জরুরি।”

কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?

খুলনা বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মো. ইকবাল হোসেন বলেন, “মশার ওষুধ মানুষের জন্য ক্ষতিকর। শিশুদের জন্য তো বটেই। তাই ফগার মেশিনে ওষুধ ছেটানোর সময় আমাদেরই সতর্ক হতে হবে। পাশাপাশি সিটি কর্পোরেশনকেও বিষয়টিতে নজরদারি বাড়াতে হবে।”

খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউআরপি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোস্তফা সারোয়ার বলেন, “ফগার মেশিন দিয়ে ওষুধ ছেটানোর ক্ষেত্রে একটা নিয়ম আছে। সেটা অনুসরণ করলে ওষুধটা মূল জায়গাতেই যাবে। প্রথমত এটা অনুসরণ করা জরুরি দ্বিতীয়ত এই ধোঁয়ার সংস্পর্শে ১-২ বার গেলে হয়তো মাথা ঝিমঝিম করতে পারে। কিন্তু প্রতিনিয়ত এই ধোঁয়ার সংস্পর্শে গেলে শারীরিক ক্ষতির সম্ভাবনা বেশি। সেটা ওষুধ ছেটানোর সময় কাছে গিয়েও হতে পারে বা ছেটানোর পর জানালা দিয়ে ওই ধোঁয়া ঘরে গিয়েও হতে পারে। এক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, “মশার প্রজনন প্রতিরোধের জন্য ফগার মেশিনের মাধ্যমে যে কীটনাশক ছেটানো হয় তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এছাড়া বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত কয়েল, বিভিন্ন স্প্রেও অত্যন্ত ক্ষতিকর। বিশেষ করে বৃদ্ধ, শিশু ও গর্ভবতী নারীদের ওপর এগুলোর প্রভাব মারাত্মক। এখন সিটি কর্পোরেশনগুলো মশক নিধনের জন্য যে কীটনাশক মেশানো ওষুধ স্প্রে করে তা কতটুকু মানসম্পন্ন, কতটুকু পরিমাণ ব্যবহার করে থাকে ও তা কার্যকর হচ্ছে কি-না সে বিষয়গুলোও দেখতে হবে।”

About

Popular Links