Tuesday, May 21, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

৩৩ শিক্ষার্থীকে ‘এতিম বানিয়ে’ সরকারি টাকা লোপাট করতে চেয়েছিল মাদ্রাসাটি

এক শিক্ষার্থীর বাবা বলেন, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ আমাকে মৃত দেখিয়ে অর্থ বরাদ্দ নিয়েছে। মাদ্রাসার মতো প্রতিষ্ঠান যদি অনিয়ম দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে তাহলে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়

আপডেট : ১৭ মে ২০২৩, ০৫:৪৫ পিএম

জয়পুরহাটের পাঁচবিবিতে একটি মাদ্রাসা ও এতিমখানার ৩৩ শিক্ষার্থীর বাবাকে “অফিশিয়ালি মেরে ফেলে” ৫ লাখ টাকা আত্মসাতের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে মাদ্রাসাটির কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। অভিযোগের পরে সমাজসেবা অধিদপ্তরের দেওয়া ওই বরাদ্দ স্থগিত করা হয়েছে। 

অনলাইন সংবাদমাধ্যম বাংলা ট্রিবিউন এক প্রতিবেদনে জানায়, গত ২৭ ফেব্রুয়ারি সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে জেলার পাঁচটি উপজেলার ২৬টি বেসরকারি এতিমখানার ৪১৪ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে ৪৯ লাখ ৬৮ হাজার বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে রহমতপুর (রামভদ্রপুর) দারুস সুন্নাহ এবতেদায়ি ও হাফেজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার ৪৩ জন এতিম শিক্ষার্থীর জন্য ৫ লাখ ১৬ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে ৩৩ জনই ভুয়া এতিম।

স্থানীয় সূত্র সংবাদমাধ্যমটিকে জানিয়েছে, এতিমখানার শিক্ষার্থীদের এক শিক্ষক শিখিয়ে দিয়েছিলেন, যদি কেউ তাদের বাবার কথা জিজ্ঞাসা করে, তখন যেন তারা বলে বাবা জীবিত নেই। শিক্ষার্থীরা বিষয়টি বাড়িতে জানায়। তখন কয়েকজন অভিভাবকের সন্দেহ হয়। তারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে বিষয়টি জানান। ইউএনও বিষয়টি খতিয়ে দেখতে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন। এরপর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা শাহিনুর আফরোজ ওই মাদ্রাসা ও এতিমখানার শিক্ষার্থীদের বাবার মৃত্যু সনদ যাচাইয়ের জন্য বাগজানা ইউনিয়ন পরিষদে পাঠান। সেখানে ৪৫ জনের মধ্যে ৩৩ জনের বাবাকে জীবিত পাওয়া যায়। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।

এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির মুহতামিম আবদুল খালেক বলেন, “সমাজসেবা কার্যালয়ে ৮৫ জন এতিমদের নামের তালিকা দিয়েছিলাম। সেখানে সমাজসেবা কার্যালয় ৮৫ জনের মধ্যে ৪৫ জনের নামের তালিকা পাঠিয়ে দিলে জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে ৪৩ জনের তালিকা অনুমোদন হয়। এর মধ্যে ৩৩ জনের মৃত্যু সনদ কাগজের সমস্যা হয়েছে সেগুলো পুনরায় ঠিক করা হচ্ছে।”

পাঁচবিবি উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা শাহিনুর আফরোজ বলেন, “দুই ধরনের এতিম রয়েছে। ১৮ বছর পর্যন্ত যেসব শিশুদের বাবা জীবিত নেই তারাই এতিম। আবার মা-বাবা দুজনই জীবিত আছেন কিন্তু সন্তান পরিত্যক্ত। এই শিশুও এতিম। রহমতপুর (রামভদ্রপুর) দারুস সুন্নাহ এবতেদায়ি কওমি মাদ্রাসা এবং এতিমখানার ৪৫ জন এতিম শিক্ষার্থীর নামের তালিকা ও তাদের বাবার মৃত্যু সনদ জমা দিয়েছিল মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে ৪৩ জনের বরাদ্দ এসেছে। দুজন বাদ পড়েছে। তবে সরেজমিন তদন্ত ও অনলাইনে মৃত্যু সনদ যাচাই করে মাত্র ১২ জন শিক্ষার্থীর বাবার মৃত্যু সনদ পাওয়া গেছে। ৩৩ জন শিক্ষার্থীর বাবা জীবিত রয়েছেন। এই ৩৩ জন শিক্ষার্থীর বাবার ভুয়া মৃত্যু সনদ তৈরি করা হয়েছে।”

এতিমখানার পঞ্চম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর বাবা বলেন, “মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ আমাকে মৃত দেখিয়ে অর্থ বরাদ্দ নিয়েছে। এমন ঘৃণিত কাজ মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের ঠিক হয়নি। মাদ্রাসা একটি পবিত্র প্রতিষ্ঠান। সেই প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ যদি অনিয়ম দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে তাহলে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়। আমরা অভিভাবকরা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।”

বাগজানা ইউনিয়ন পরিষদের সচিব খাইরুল ইসলাম বলেন, “পাঁচবিবি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে রহমতপুর (রামভদ্রপুর) দারুস সুন্নাহ এবতেদায়ি কওমি মাদ্রাসা এবং এতিমখানার ৪৫ জন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্ম ও মৃত্যু সনদ যাচাইয়ের জন্য পাঠানো হয়েছিল। যাচাই শেষে ৩৩ জন শিক্ষার্থীর বাবা জীবিত থাকলেও তাদের ভুয়া মৃত্যু সনদ তৈরি করা হয়েছে। প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।”

এ বিষয়ে বাগজানা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান নাজমুল হোসেন বলেন, “জন্ম ও মৃত্যু সনদ অনলাইনে যাচাই করা যায়। উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তারা এতিমদের তালিকা অনুমোদনের আগে মৃত্যু সনদগুলো অনলাইনে যাচাই করতে পারতেন। যদি তখন যাচাই করা হতো, তখনই সঠিক তথ্য বেরিয়ে আসত। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা দরকার।”

জয়পুরহাট সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহকারি পরিচালক সালেকুল ইসলাম বলেন, “মাদ্রাসা ও এতিমখানায় বেশ কিছু শিক্ষার্থীর বাবা জীবিত আছেন। কিন্তু তাদের ভুয়া মৃত্যু সনদ দিয়ে এতিম বানানো হয়েছে। ঘটনাটি তদন্ত চলছে। এ কারণে চলতি বছরের ওই মাদ্রাসার এতিমদের নামে আসা বরাদ্দ ছাড় করা হয়নি। শুধু এই মাদ্রাসার না৷ জেলার অন্যান্য এতিমখানার কাগজপত্র যাচাই বাছাইয়ের কাজ চলছে। আর অপরাধীদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।”

About

Popular Links