Monday, May 20, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

নবজাতক ও মায়ের মৃত্যু: সংযুক্তা সাহার ওপর দায় চাপাল সেন্ট্রাল হাসপাতাল

যদিও ডা. সংযুক্তা সম্প্রতি দাবি করেন, সিজারিয়ান অপারেশন বন্ধ করার জন্য তিনি ‘সামাজিক আন্দোলন’ শুরু করেছেন, সে কারণে একটা পক্ষ তার বিরুদ্ধে ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ চালাচ্ছে

আপডেট : ০২ জুলাই ২০২৩, ০৮:৪০ পিএম

নবজাতকসহ না ফেরার দেশে পাড়ি জমানো মাহবুবা রহমান আঁখির ঘটনায় আবারও প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ সংযুক্তা সাহার ওপর দায় চাপিয়েছে ঢাকা সেন্ট্রাল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালটির দাবি, অধ্যাপক ডা. সংযুক্তা সাহার নির্দেশনা ছিল তিনি অনুপস্থিত থাকলেও তার নামেই রোগী ভর্তি করতে হবে। সে কারণেই ৯ জুন সে দেশে না থাকলেও তার “অধীনে” ওই রোগীকে ভর্তি করা হয়েছিল।

ইডেন শিক্ষার্থী মাহবুবা রহমান আঁখি ও তার নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় দেওয়া প্রাথমিক ব্যাখ্যায় এমন কথা জানায় সেন্ট্রাল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। রবিবার (২ জুলাই) সেন্ট্রাল হাসপাতালের পরিচালক ডা. এম এবি সিদ্দিক ও ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এমএ কাশেমের সই করা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব বিষয় উল্লেখ করা হয়।

প্রাথমিক তদন্তের পর পর্যবেক্ষণে সেন্ট্রাল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, অধ্যাপক ডা. সংযুক্তা সাহা কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে দুবাই যান। গত ১০ জুন অর্থাৎ তার বিদেশ যাওয়ার পরদিন ওই রোগীর অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া হয় এবং এর প্রমাণও আছে হাসপাতালের কাছে।

ডা. সংযুক্তা সাহার দুটি সংবাদ সম্মেলনকে অসত্য, বিভ্রান্তিকর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আখ্যা দিয়ে তার বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছে হাসপাতাল।

তাদের ভাষ্য, ডা. সংযুক্তা সাহার অসত্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বক্তব্যে সেন্ট্রাল হাসপাতালের সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। পাশাপাশি তিনি নিজের দায় হাসপাতালের ওপর চাপানোর চেষ্টা করছেন। 

সেন্ট্রাল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা সংযুক্তা সাহাকে কোনো কমিশন দেয়নি এবং তার কাছ থেকে কমিশনও নেয়নি। হাসপাতাল এবং ডাক্তারের খরচ কত তা রশিদে উল্লেখ থাকে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু বিল যাচাইয়ের জন্য তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিয়ে গেছে।

সংযুক্তা সাহা অভিযোগ করেছেন সেন্ট্রাল হাসপাতালের কোনো নিয়ম-কানুন নেই। তার এই বক্তব্যের জবাবে হাসপাতালটির পাল্টা প্রশ্ন, “তাহলে সংযুক্তা সাহা ২০০৭ সাল থেকে কীভাবে এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করলেন? তাছাড়া বিভিন্ন ভিডিওর মাধ্যমে হাসপাতালের প্রচার করলেন কেন?”

ডা. সংযুক্তা সাহা একটি সংবাদ সম্মলনে বলেছেন, “সেন্ট্রাল হাসপাতালে বেশি সময় দেন, তাই তিনি অন্য একটি প্রতিষ্ঠানে চেম্বার করা বন্ধ করেছেন। সেন্ট্রালের যদি নিয়ম-কানুন না থাকে তাহলে তিনি অন্য একটি প্রতিষ্ঠান ছেড়ে এলেন কেন?”

এমনকি পুরো বিষয় তদন্তে চিকিৎসকের সহকারী মো. জমিরের সঙ্গে রোগীর কথোপকথনের রেকর্ড, রাত সাড়ে ১০টার পর থেকে দিবাগত রাত ৩টা পর্যন্ত ওই রোগীর বিষয়ে ডা. সংযুক্তার মোবাইল ফোনের কল লিস্ট এবং হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জারের কথোপকথনের ফরেনসিক রেকর্ড যাচাই করলে সব স্পষ্ট হয়ে যাবে বলেও মনে করে সেন্ট্রাল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

হাসপাতালের আরেক চিকিৎসক ডা. শাহজাদীর বরাতে বিবৃতিতে বলা হয়, ‍“সংযুক্তা সাহার সঙ্গে ওই রোগীর বিষয়ে মোবাইলেও কথা হয়েছে। সংযুক্তা সাহার মোবাইলটি ফরেনসিক টেস্ট করলে সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যাবে।”

এতে বলা হয়, “ডা. সংযুক্তা সাহা সেন্ট্রাল ছাড়াও অন্য হাসপাতালে চেম্বার করতেন। নরমাল ডেলিভারি এবং নিজের রোগীদের জন্য ডা. সংযুক্তা সাহার নিজস্ব দল রয়েছে। তার অন কল ডাক্তার ছিল। অন কল ডাক্তাররাই তার রোগী ডিল করতেন। সেন্ট্রালের ডাক্তাররা ডা. সংযুক্তা সাহা ও তার টিমের নির্দেশনা অনুসারে দায়িত্ব পালন করেন মাত্র।”

আঁখিকে ডা. সংযুক্তা সাহার তত্ত্বাবধানে ভর্তির বিষয়ে প্রশাসন বা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই বলেও দাবি করা হয় ওই বিবৃতিতে।

তিন মাস ধরে সেন্ট্রাল হাসপাতালের গাইনি ও প্রসূতি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সংযুক্তা সাহার অধীনে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন মাহবুবা রহমান আঁখি। তখন তার শারীরিক অবস্থা স্বাভাবিক ছিল বলেও চিকিৎসক জানিয়েছিলেন। নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমেই সন্তান প্রসব সম্ভব বলে আশ্বস্তও করেছিলেন ডা. সংযুক্তা সাহা।

প্রসব ব্যথা ওঠায় গত ৯ জুন দিবাগত রাত ১২টা ৫০ মিনিটে সেন্ট্রাল হাসপাতালে ডা. সংযুক্তার অধীনে মাহবুবাকে ভর্তি করা হয়। স্বজনদের অভিযোগ, ওইসময় ডা. সংযুক্তা সাহা দেশেই ছিলেন না, অথচ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, সংযুক্তা সাহা আছেন এবং ওটিতে (অপারেশন থিয়েটার) কাজ করছেন। অন্য চিকিৎসকের মাধ্যমে স্বাভাবিক প্রসবের চেষ্টা ব্যর্থ হলে তখন অস্ত্রোপচার করে বাচ্চা বের করা হয়। পরদিন মারা যায় শিশুটি। চিকিৎসকদের ভুলে আঁখির অবস্থাও সঙ্কটাপন্ন হয়ে পড়ে। ঘটনার পর তাকে পার্শ্ববর্তী ল্যাবএইড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।

আঁখি ও তার নবজাতকের মৃত্যুর পর ধানমন্ডি থানায় মোট ছয়জনের নাম উল্লেখ এবং পাঁচ-ছয়জনকে অজ্ঞাত আসামি করে “অবহেলাজনিত মৃত্যুর” অভিযোগ এনে একটি মামলা করা হয়। যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের মধ্যে ডা. শাহজাদী মুস্তার্শিদা সুলতানা ও ডা. মুনা সাহাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বাকিরা হলেন ডা. মিলি, ডা. এহসান, অধ্যাপক সংযুক্তা সাহার সহকারী জমির এবং হাসপাতালের ব্যবস্থাপক পারভেজ।

মামলাটিতে গ্রেপ্তার হওয়া দুই চিকিৎসক ডা. শাহজাদী মুস্তার্শিদা সুলতানা ও ডা. মুনা সাহা দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।

এদিকে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য অধিপ্তরের একটি দল ওই হাসপাতাল পরিদর্শন করেছে। পরিদর্শনে আইসিইউতে রোগীর রাখার উপযুক্ত পরিবেশ পাওয়া যায়নি। এজন্য পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ওই হাসপাতালের অস্ত্রোপচার কক্ষ বন্ধ করে দেওয়াসহ কয়েক দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

About

Popular Links