Tuesday, May 21, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

বিএনপির সাবেক সাংসদ মোমিনের ফাঁসির রায়

এ রায়ে  তার নিজ এলাকা আদমদীঘি উপজেলার সান্তাহারে আনন্দমিছিল ও মিষ্টি বিতরণ করেছেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২১, ০৩:৫৬ পিএম

মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা, হত্যা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগের মত মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার দায়ে বগুড়ার বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল মোমিন তালুকদার ওরফে খোকার ফাঁসির রায় দিয়েছেন যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বর্তমানে পলাতক রয়েছেন তিনি। এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে হলে তাকে আত্মসমর্পণ করতে হবে।

বুধবার (২৪ নভেম্বর) বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলামের নেতৃত্বাধীন তিন বিচারকের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। আব্দুল মোমিন তালুকদারের বিরুদ্ধে আনা তিনটি অভিযোগেই তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। 

চারদলীয় জোট সরকারের আমলের বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও রাজশাহী বিভাগীয় বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন আব্দুল মোমিন তালুকদার। বগুড়া-৩ আসন থেকে দুইবার এমপি হয়েছিলেন তিনি।

বগুড়া-৩ আসনে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল মোমিন তালুকদার খোকার মৃত্যুদণ্ডাদেশের খবরে স্বাধীনতার সপক্ষের জনগণের মাঝে স্বস্তি দেখা দিয়েছে। তার নিজ এলাকা আদমদীঘি উপজেলার সান্তাহারে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আনন্দমিছিল ও মিষ্টি বিতরণ করেছেন। সকলে অতি দ্রুত রায় কার্যকরের অনুরোধ জানিয়েছেন। 

রায়ের ব্যাপারে খোকার ছোট ভাই আদমদীঘি উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও বর্তমান আহবায়ক কমিটির সদস্য আবদুল মহিত তালুকদার জানান, এ ব্যাপারে

পরবর্তীতে বক্তব্য রাখা হবে। বগুড়া জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক অ্যাডভোকেট একেএম সাইফুল ইসলাম জানান, এ মামলায় পর্যাপ্ত সাক্ষী-প্রমাণ ছিল না। এরপরও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে খোকাকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দেওয়া হয়েছে। রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাওয়া হবে।

রায় ঘোষণার পর তাৎক্ষণিক মন্তব্যে বগুড়া জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক সভাপতি রুহুল আমিন বাবলু জানান, এ রায় যুগান্তকরী; সরকারের চেষ্টায় স্বাধীনতার ৫০ বছর পর হলেও আমরা রাজাকার মুক্ত হতে পারছি। বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মজিবর রহমান মজনু জানান, এ রায় জাতির প্রত্যাশা ছিল। পাপের প্রায়শ্চিত্ত হয়েছে। স্বাধীনতা স্বপক্ষের মানুষ হিসেবে তিনি এ রায়ে সন্তুষ্ট। 

জেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক আল রাজি জুয়েল জানান, যুগান্তকরী এ রায়ে তিনি খুব খুশি হয়েছেন। এ খুশিতে দুপুরে শহরের সাতমাথায়

জনগণের মাঝে মিষ্টি বিতরণ করা হয়েছে। 

বগুড়া জেলা যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ডালিয়া নাসরিন রিক্তা জানান, খোকা রাজাকারের বিরুদ্ধে এ রায় স্বাধীনতার স্বপক্ষের মানুষের বিজয়। তিনি অবিলম্বে যুদ্ধাপরাধী খোকাকে গ্রেপ্তার ও ফাঁসির রায় কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন।

আদমদীঘি উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম চম্পা জানান, খোকা রাজাকারের বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় ঘোষণা হওয়ায় মানবতার জয় হয়েছে। এ রায় জনগণের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার প্রতিফলন। 

তিনি জানান, সকালে রায় ঘোষণার পর সান্তাহার দলীয় কার্যালয় থেকে উপজেলা ও পৌর আওয়ামী লীগের উদ্যোগে আনন্দমিছিল করা হয়েছে। মিছিলে নেতৃত্ব দেন পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কাশেম। আদমদীঘিতে আনন্দ মিছিল ও মিস্টি বিতরণ করা হয়। তিনি পলাতক যুদ্ধাপরাধী খোকাকে অবিলম্বে গ্রেফতার ও রায় কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন।

খোকা রাজাকারের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার অন্যতম সাক্ষী দুপচঁাঁচিয়া উপজেলার প্রবীণ সাংবাদিক এম সরওয়ার খানসহ কয়েকজন সাক্ষী ইতোমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন। তবে তাদের পরিবারের সদস্যরা এ রায়ে সন্তোষপ্রকাশ করে বলেছেন, সাক্ষীরা বেঁচে থাকলে তারা অনেক খুশি হতেন।

রায়ের প্রতিক্রিয়ায় দুপচাঁচিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এমদাদুল হক বলেন, বর্তমান আওয়ামী সরকার স্বাধীনতার পক্ষের যা এ রায়ের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছে। এ রায়ে খোকা রাজাকার ও তার পরিবারের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত মুক্তিযোদ্ধার পরিবার ন্যায় বিচার পেয়েছেন। তিনি অবিলম্বেফাঁসির রায় কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন। দুপচাঁচিয়া মুক্তিযোদ্ধা টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা সুজ্জাত আলী জানান, রাজাকার খোকার বিরুদ্ধে রায়ে আমরা সন্তষ্ট। এ রায়ের মাধ্যমে স্বাধীনতা বিরোধীদের পরাজয় হয়েছে। 

উপজেলা জাসদের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মালেক সরকার বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধে খোকা রাজাকারের মৃত্যুদন্ডাদেশ হওয়ায় বিচার বিভাগ, সরকারসহ সংশ্লিষ্টকে আমি সাধুবাদ জানাই। সেইসঙ্গে অন্যান্য রাজাকারদেরও যেন একই রায় হয় এই প্রত্যাশা করছি। বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ দুপচাঁচিয়া উপজেলা কমান্ডের সাবেক কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব আব্দুল মজিদ বলেন, মানবতা বিরোধী অপরাধে রাজাকার খোকার মৃত্যুদণ্ডা দেশ হওয়ায় ন্যায় বিচার হয়েছে। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে এ রায়ে আমি খুশি।

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা জানান, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় শান্তি কমিটির সভাপতি আবদুল মজিদ তালুকদার ১৯৭৯ থেকে ১৯৮১, ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ এবং ১৯৯৬ থেকে ২০০৮ সালে বগুড়া-৩ (আদমদীঘি-দুপচাঁচিয়া) আসনে বিএনপি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি দেশে রাজাকারের তালিকায় ৫০ জনের মধ্যে ৪৯তম

ছিলেন। আবদুল মোমিন তালুকদার খোকা তার বাবার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধে বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। তারা যুদ্ধের সময় জ্বালাও পোড়াও, মুক্তিযুদ্ধে স্বপক্ষের মানুষদের নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞে অংশ নিয়েছিলেন।

রাজাকারের তালিকায় বাবা মজিদ তালুকদার ১ নম্বর ও ছেলে খোকা ২ নম্বরে ছিলেন। দেশ স্বাধীনের পর খোকা ১৯৭৮ সালে বিএনপিতে যোগ দেন। পরে আদমদীঘি

উপজেলা বিএনপির সভাপতি, জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ও রাজশাহী বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক হন। তিনি ২০০১ ও ২০০৮ সালে বগুড়া-৩ আসনের সংসদ

ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় খোকা বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

আবদুল মোমিন তালুকদার খোকার বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আদমদীঘি, সান্তাহার ও আশপাশের এলাকায় হত্যা, লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগের অভিযোগ উঠে।

২০১১ সালের ৯ মার্চ আদমদীঘির কায়েতপাড়া গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা সুবেদ আলী খোকার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন। আদালত মামলাটি গ্রহণ করে সেটি রেকর্ড করতে আদমদীঘি থানার তৎকালীন ওসিকে নির্দেশ দেন। 

পরে ওই মামলা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। ২০১৬ সালের ১৮ জানুয়ারি থেকে ২০১৮ সালের ৩ মে পর্যন্ত তদন্ত হয়। তার বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের বিভিন্ন সময়ে ১৯ জনকে হত্যাসহ লুট ও অগ্নিসংযোগসহ তিনটি অভিযোগ আনা হয়। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে ট্রাইব্যুনাল তার বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করেছিলেন।

About

Popular Links