Friday, May 24, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

জন্মদিনে ছেলেকে হারিয়ে আহাজারি থামছে না মাঈন উদ্দিনের মায়ের

সৎ পুলিশ কর্মকর্তা হওয়ার স্বপ্নে বিভোর মাঈন উদ্দিন এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে কলেজে ভর্তির অপেক্ষায় ছিল  

আপডেট : ৩০ নভেম্বর ২০২১, ০১:৩০ পিএম

নিরাপদ সড়ক এবং বাসে হাফভাড়ার দাবিতে রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলছে। এরই মধ্যে বাসের চাপায় ঝরে গেল মাঈন উদ্দিন নামের এক শিক্ষার্থীর তাজা প্রাণ। জন্মদিনেই তাকে চিরতরে হারিয়ে মা রাশেদা বেগম এখন শুধুই আহাজারি করছেন।

দেশের অন্যতম্ অনলাইন পোর্টাল বিডি নিউজ ২৪  এর এক প্রতিবেদনে এ কথা জানা যায়।

সোমবার (২৯ নভেম্বর) রাত ১০টার দিকে রাজধানীর ডিআইটি রোড পূর্ব রামপুরা লাজ ফার্মার সামনে অনাবিল পরিবহনের একটি বাসের চাপায় মৃত্যু হয় তার। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যেই  মাঈন উদ্দিনের মৃত্যুর ঘটনা ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছে। দুর্ঘটনার পর ক্ষুব্ধ জনতা সেখানে অন্তত আটটি বাস পুড়িয়ে দিয়েছে।

মাঈন উদ্দিন একরামুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এবার এসএসসি দিয়ে কলেজে ভর্তির অপেক্ষায় ছিল। দরিদ্র সংসারে অভাব থাকলেও  মাঈনকে ঘিরে অনেক স্বপ্ন ছিল তার বাবা-মায়ের। কিন্তু জন্মদিনেই মাঈন উদ্দিনের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তাকে ঘিরে দেখা পরিবারের স্বপ্নেরও সলিল সমাধি তৈরি হলো।

রাজধানীর পূর্ব রামপুরার বাসায় গিয়ে এক সাংবাদিক রাশেদা বেগমের কাছে তার  মাঈন উদ্দিনের বয়স নিয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, ২০০২ সালের ২৯ নভেম্বর  মাঈন উদ্দিনের জন্ম হয়। সেই সাংবাদিক তখন বলেন, “আজই তো ২৯ নভেম্বর।”।

রাশেদা বেগম তখন কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকেন, “আমার পুতের জন্মদিন আইজকা, আমার মনে নাই গো। হেও জানতো না গো।… ২৯ নভেম্বর আমার পুতের জন্ম দিন গো। আজকে আমার বাবার জন্ম দিন গো।”

অভাবের সংসারে দুই ভাই আর এক বাক প্রতিবন্ধী বোনের মধ্যে ১৯ বছর বয়সী মাঈন উদ্দিন ছিল সবার ছোট। তার বাবা আব্দুর রহমান ভাণ্ডারী তিতাস রোডে (মোল্লাবাড়ি) রাস্তার পাশে টং দোকানে চা-পান বিক্রি করেন। তার বড় ভাই বনশ্রীর এক ব্যক্তির গাড়ি চালক।


আরও পড়ুন- রামপুরায় বাসচাপায় শিক্ষার্থীর মৃত্যু, বাসে আগুন


জীবিকার তাগিদে ১৫ বছর আগে পরিবার নিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল সদরের আব্দুর রহমান। ২০২১ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী  মাঈন উদ্দিন তার বাবাকে ভালো কোনো কলেজে ভর্তি হওয়ার ইচ্ছার কথাও জানিয়েছিল।

ছেলেকে হারিয়ে আব্দুর রহমান কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “আমার ছেলে বলতো- আব্বা আমাকে একটা ভালো কলেজে ভর্তি করিয়ে দিও। আমার ছেলেকে ভালো কলেজে ভর্তি করিয়ে দিব। আমার ছেলের কত আশা আকাঙ্ক্ষা… আমি বলছি আমার ছেলেকে ভালো কলেজে ভর্তি করিয়ে দিব।”

মাঈন উদ্দিনের বাবা বলতে থাকেন, “মাইনু তাড়তাড়ি আসো, তোমাকে ভাল কলেজে ভর্তি করাবো। তুমি না ভাল কলেজে ভর্তি করাতে বলেছিলে? আসো, তাড়তাড়ি আসো, তোমাকে ভাল কলেজে ভর্তি করাবো।”

শত অভাবের মধ্যেও ছেলের পড়াশোনার খরচ চালিয়ে যেতে গয়না আর জিনিসপত্রও বিক্রি করতে হয়েছে মা রাশেদা বেগমকে। বড় হয়ে মায়ের বিক্রি করা অলঙ্কারগুলো আবার কিনে দেওয়ার কথা বলতো মাঈন উদ্দিন। সে কথা জানিয়ে রাশেদা বেগম বলেন, “কত কষ্ট করে আমার ছেলেকে লেখাপড়া করাচ্ছি। সে পরীক্ষা দেয়, জিনিস বিক্রি করে করে জানুয়ারি মাসে ভর্তি করাই। আমি বলি তোর জিনিসের তো ভাগেরটা শেষ! আমার আর কিচ্ছু নেই তোকে ভর্তি করাতাম। সে বলতো- মা আমি বড় হয়ে তোমাকে বানিয়ে (অলঙ্কার) দিব।”

পড়াশোনা শেষ করে মাঈন উদ্দিনের সৎ পুলিশ কর্মকর্তা হওয়ার স্বপ্ন ছিল। তার সে স্বপ্নের কথা জানিয়ে রাশেদা বলেন, “বলতাম- পুলিশ তো ঘুষ খায়। সে বলতো- মা আমি ঘুষ খাব না।”


আরও পড়ুন- রামপুরায় দুর্ঘটনা: অভিযুক্ত বাস ও চালক আটক


গত সপ্তাহে সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির চাপায় এক কলেজ শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর থেকে রাজধানীতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলছে। নিরাপদ সড়কের দাবিতে সেই আন্দোলনে বন্ধুদের সঙ্গে  মাঈন উদ্দিনও যোগ দেয়।

তার মা বলেন, “স্কুলের পরীক্ষার শেষ দিন সে বলছিল- মা আজকে মারামারি হবে! আমি বলেছিলাম, বাবা মারামারি করো না, স্কুল থেকে পরীক্ষা দিয়া বাসায় এসে পড়বে।”

চায়ের দোকানে মাঝে-মাঝে বাবাকে সহযোগিতা করত  মাঈন উদ্দিন। সোমবার রাতে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগেও সে বাবার সঙ্গে দোকানের কাজে ছিল। সে কথা জানিয়ে আব্দুর রহমান ভাণ্ডারী বলেন, “আমার ছেলে আমার সঙ্গে দোকানে বসেছে। সুপারি কেটেছে। সুপারি কেটে হাত ধুয়েছে, বলেছে- আব্বা ১০টা টাকা দাও, বুট খাব। খেতে বের হওয়ার ১০-১৫ মিনিট পরই আমার ছেলে না ফেরার দেশে চলে গিয়েছে।”

 মাঈন উদ্দিনের মা রাশেদা বেগম বলেন, “গাড়িতে কি খালি ছাত্ররাই এক্সিডেন্ট করে? সরকার কী করবে! সরকার কী করে? আল্লাহ আমার দুই ছেলে, তোমার হাতে মেহেরবান।”

মাইনুলের ভগ্নিপতির ভাই মো. বাদশা ইসলাম জানান, দুই বন্ধুর সঙ্গে  মাঈন ডিআইটি রোডের সোনালী ব্যাংকের সামনে দিয়ে সড়ক দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছিল। তখনই দুর্ঘটনা ঘটে। 

তিনি বলেন, “আমরা সেখানে গিয়ে শুনেছি, অনাবিল পরিবহন ও রাইদা পরিবহনের দুটো বাস পাল্লাপাল্লি করে যাচ্ছিল, সেই সময় তারা (মাঈন উদ্দিন) রাস্তা ক্রস করছিল। তারা হাত উড়িয়ে বাস থামাতে বললেও দুই বাসের মধ্যে পড়ে তার শরীর বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে যায়।”

তিনি জানান, সে সময়  মাঈন উদ্দিনের সঙ্গে থাকা মুঠোফোন থেকেই ঘটনাস্থলের এক ব্যক্তি তার স্বজনদের খবর দেন। খবর পেয়েই তারা ছুটে যান। পরে মাঈনের খণ্ডবিখণ্ড দেহ বাসায় নিয়ে রাস্তার পাশে রাখেন। সেখান থেকে রাত ১২টার দিকে পুলিশ একটি ভ্যানে করে লাশ নিয়ে হাসপাতালের মর্গে চলে যায়।

About

Popular Links