Thursday, May 30, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

দেশের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী রেল প্রকল্পের খরচ

প্রকল্পের জন্য এ পর্যন্ত ৪২ হাজার ৬১৯টি গাছ কাটা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে প্রকল্পের জন্য আরও ২ লাখ ৪০ হাজার গাছ কেটে ফেলতে হবে।তবে এখন পর্যন্ত কত পাহাড় ধ্বংস হয়েছে তার কোনো তথ্য নেই বন বিভাগের কাছে

আপডেট : ৩০ নভেম্বর ২০২১, ০৭:০৬ পিএম

সরকারের অন্যতম উচ্চাভিলাষী রেল প্রকল্প চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সিঙ্গেল-লাইন ডুয়েল গেজ রেলপথ। যা যোগাযোগের ক্ষেত্রে সুবিধা বয়ে আনলেও প্রকল্প এলাকার বন ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলের জন্য হুমকিস্বরূপ। রেললাইনের নির্মাণকাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে, কারণ সরকার ২০২২ সালের শেষে এটি চালু করতে চায়। 

প্রকল্পটি এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে দেশের রেল যোগাযোগ উন্নত করতে বাংলাদেশ রেলওয়ে (বিআর) কর্তৃক গৃহীত সাতটি বিনিয়োগ উপ-প্রকল্পের একটি। এটি ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে (টিএআর) নেটওয়ার্কের অংশ এবং মিয়ানমার ও এর বাইরেও দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় উন্নতি করবে। প্রকল্পটি সাউথ এশিয়া সাব-রিজিওনাল ইকোনমিক কো-অপারেশন (এসএসইসি) অনুমোদন করেছে।

এ প্রকল্পের ১০১ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথটি চট্টগ্রামের তিনটি সংরক্ষিত বনের ২৭ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। চুনতি, ফাসিয়াখালী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এবং মেধকাচাপিয়া জাতীয় উদ্যান এই তিনটি সুরক্ষিত এলাকা এবং দেশের দক্ষিণ-পূর্বে অন্যান্য কিছু বনাঞ্চল এশিয়ান হাতিদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডোরের অংশ। এই অঞ্চলগুলো ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) বিপন্ন তালিকায় থাকা ৬১টি প্রজাতির প্রাণীর আবাসস্থল।

বন কর্তৃপক্ষ বলছে, বারবার এই প্রকল্প পুনর্বিবেচনার জন্য বললেও তাদের আবেদন শোনা হয়নি।

সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন,  পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত বনাঞ্চলগুলোকে স্পর্শ না করে প্রকল্পটি কার্যকর করার কোনো উপায় ছিল না এবং তারা হাতির করিডোরটিকে অক্ষত রাখার চেষ্টা করেছিলেন। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) স্বাক্ষরকারী হিসেবে ২০২০ সালের মধ্যে বন উজাড় বন্ধ করার কথা ছিল বাংলাদেশের। ২০২৩ সালের মধ্যে ২০% বনভূমি নিশ্চিত করারও কথা ছিল।

বনের ভেতর মরুভূমি

সম্প্রতি এ প্রতিবেদক চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের ভেতরে কয়েক কিলোমিটার হেঁটে যাওয়ার পর তার কাছে মনে হয়েছে তিনি মরুভূমিতে এসেছেন। ৬০ থেকে ৭০ ফুট উঁচু পাহাড়গুলো কেটে সমতল রাস্তা তৈরি করা হয়েছে এবং অসংখ্য গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। এর মধ্যে কিছু গাছের বয়স শত বছরেরও বেশি। কাটা গাছের কিছু এখনও মাটিতে পড়ে রয়েছে। আর বাকিগুলো গত তিন বছর ধরে বিক্রি করা হয়েছে।

চট্টগ্রামের বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম চৌধুরীর মতে, প্রকল্পের জন্য এ পর্যন্ত ৪২ হাজার ৬১৯টি গাছ কাটা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, প্রকল্পের জন্য আরও ২ লাখ ৪০ হাজার গাছ কেটে ফেলতে হবে। তবে এখন পর্যন্ত কত পাহাড় ধ্বংস হয়েছে তার কোনো তথ্য নেই বন বিভাগের কাছে। প্রকল্পের অন্যতম ঠিকাদার তমা কনস্ট্রাকশনকে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে বনাঞ্চলে ২২ মিলিয়ন ঘনফুট পাহাড় ধ্বংসের জন্য ৫০ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছিল।

এর আগে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশ হয়ে ভারতে যাওয়া হাতির করিডোরটি মানববসতি স্থাপনের কারণে এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মানুষ এবং বন্য হাতির মধ্যে দ্বন্দ্ব ক্রমবর্ধমান আকারে বাড়ছে এবং রেললাইন নির্মাণের ফলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মানব বসতি এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে হাতির বিপদের কথা স্বীকার করে বন বিভাগের কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, বিপন্ন এশিয়ান হাতি এবং অন্যান্য বন্যপ্রাণী বিলুপ্তির পথে যেতে পারে। তবে এরকম বড় উন্নয়ন প্রকল্পের বিরুদ্ধে কথা বলতে রাজি হননি তারা।

চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের রেঞ্জ অফিসার মঞ্জুরুল আলম বলেন, “সংরক্ষিত বন একটি কারণে সংরক্ষিত। এসব এলাকা বন্যপ্রাণীর জন্য সুরক্ষিত থাকার কথা থাকলেও তা হয়নি। প্রকল্পটি ইতোমধ্যে অনেক প্রজাতির বন্যপ্রাণীর ক্ষতি করেছে। এর কারণে এই অঞ্চলে অবশিষ্ট হাতিদেরকেও সম্পূর্ণরূপে তাড়িয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।” 

কেন এই প্রকল্পটি প্রথম স্থানে নেওয়া হয়েছিল জানতে চাওয়া হলে এ কর্মকর্তা বলেন, “এটি সরকারের একটি শীর্ষ অগ্রাধিকার প্রকল্প। এ বিষয়ে আমি আর কথা বলতে পারব না।”

“না” বলতে অপারগ বন বিভাগ

তিনটি সংরক্ষিত বনের মধ্যে চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের প্রায় ৪১% অর্থাৎ রেলওয়ে প্রকল্পের মোট ১৮ হাজার ৭৮১ হেক্টর জায়গা এ বনের মধ্যে পড়েছে। যা হাতি চলাচলের মূল অঞ্চলের মধ্য দিয়ে যাবে।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের তৈরি করা ২০১৬ সালের এনভায়রনমেন্ট ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্টের (ইআইএ) প্রতিবেদনে বন্যপ্রাণীর সম্ভাব্য ক্ষতির কথা স্বীকার করে উল্লেখ করা হয়েছে, “প্রকল্পের কারণে হাতির চলাচলের করিডোরে প্রভাব উল্লেখযোগ্য। দেশের ভূমির প্রায় ১৭% বনভূমি রক্ষায় কাজ করার কথা বন বিভাগের। কিন্তু বনের অভ্যন্তরে উন্নয়ন কার্যক্রম ভেটো করার ক্ষমতার অভাব রয়েছে তাদের।”

বন বিভাগের সংরক্ষক (বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ) মোল্লা রেজাউল করিম বলেন, “আমরা এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে একাধিকবার প্রতিবাদ জানিয়েছি। কিন্তু আমাদের আবেদন শোনা হয়নি। বন রক্ষার দায়িত্ব কি শুধু বন বিভাগের? এটি একটি সরকারি প্রকল্প এবং বাংলাদেশ রেলওয়ে বনকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেনি।”

দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইনের প্রকল্প পরিচালক মো. মফিজুর রহমান ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “চট্টগ্রাম মহাসড়ক সংলগ্ন বনাঞ্চল হওয়ায় এই প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় তিনটি সংরক্ষিত বনকে এড়ানোর কোনো উপায় নেই। আমরা এমন একটি নকশা অনুমোদন করেছি যা জীববৈচিত্র্যের ওপর সবচেয়ে কম প্রভাব ফেলবে। হাতির করিডোর সংরক্ষণের জন্য একটি ওভারপাস, তিনটি আন্ডারপাস, একটি হাতির ফানেল বেড়া এবং বিভিন্ন পয়েন্টে ক্রসওয়াক করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।”

তবে বন কর্মকর্তারা এই উদ্যোগের সমালোচনা করেছেন। কারণ কালভার্টগুলো সর্বোচ্চ ৫ থেকে ৬ ফুট চওড়া, যেখানে চলাচলের জন্য গড়ে একটি হাতির নূন্যতম ৮ থেকে ১০ ফুট জায়গা প্রয়োজন৷

যদিও প্রকল্প পরিচালক মো. মফিজুর রহমান দাবি করেন, হাতির করিডোরে সঠিক পরিমাপ করে আন্ডারপাস ও ওভারপাস নির্মাণ করা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ লাউয়াছড়া রিজার্ভ ফরেস্টে একটি পরিকল্পনা করেছে, যেখানে রেল ইঞ্জিনের ভিতরে থার্মাল ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। যাতে ট্রেন মাস্টাররা ট্র্যাকে প্রাণীর উপস্থিতি শনাক্ত করতে পারে।

About

Popular Links