Friday, June 14, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

ডেঙ্গু পরিস্থিতি নভেম্বর পর্যন্ত খারাপ থাকতে পারে, শঙ্কা বিশেষজ্ঞদের

অন্যান্য বছর ডেঙ্গু মৌসুম শুরু হওয়ার সময় রোগী বাড়লেও এবারের পরিস্থিতি একদমই ব্যতিক্রম

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২৩, ০২:৪৬ পিএম

এ বছর বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব রীতিমতো ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রতিদিনই হাসপাতালে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রোগীর সংখ্যা। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা,  নভেম্বর মাস পর্যন্ত ডেঙ্গুর সর্বোচ্চ প্রকোপ অব্যাহত থাকতে পারে।

অন্যান্য বছর ডেঙ্গু মৌসুম শুরু হওয়ার সময় রোগী বাড়লেও এবার পরিস্থিতি একদমই ব্যতিক্রম। এ বছর ডেঙ্গুর মৌসুম শুরু আগেই হাসপাতালগুলোতে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। হাসপাতালে বাড়তি রোগীর চাপে তাদের সেবা দিতে চিকিৎসকরা হিমশিম খাচ্ছেন।

ইতোমধ্যে ঢাকার তিনটি বড় সরকারি হাসপাতালে রোগীর চাপ ধারণক্ষমতার বাইরে। গত তিন বছরের পরিসংখ্যান বলছে, ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের সর্বোচ্চ সময় (পিক টাইম) এখনx আসেনি।

২০১৯ সালে সর্বাধিক ডেঙ্গু রোগী ছিল আগস্টে

২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তির সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন। ওই বছর ডেঙ্গু সন্দেহে ২৬৬টি মৃত্যু হলেও সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) জানিয়েছিল, ডেঙ্গুর কারণে ১৬৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।

তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গুতে প্রকৃতপক্ষে ১৭৯ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ওই বছরের জুলাইয়ে ১৬ হাজার ২৫৩ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হলেও আগস্টে তা ৫০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। তবে সেপ্টেম্বর থেকে রোগীর সংখ্যা কমতে শুরু করে।

২০২১ সালে ডেঙ্গুর প্রকোপ সর্বাধিক ছিল আগস্ট-সেপ্টেম্বরে

২০২০ সালে মহামারি করোনাভাইরাসের সময় ডেঙ্গু রোগী কম ছিল। তবে ২০২১ সালে আবার ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু হলে জুলাই থেকে রোগী বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।

ওই বছরের জুলাইয়ে ২ হাজার ২৮৬ জন, আগস্টে ৭ হাজার ৬৯৮ জন, সেপ্টেম্বরে ৭ হাজার ৮৪১ জন, অক্টোবরে ৫ হাজার ৪৫৮ জন, নভেম্বরে ৩ হাজার ৫৬৭ জন রোগী ছিল।

২০২১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ২৮ হাজার ৪২৯ জন রোগী ভর্তি হয়েছিল। অন্যদিকে, এডিস মশাবাহিত রোগে ১০৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল।

গত বছরের পরিস্থিতি

গত বছর জুন থেকে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। জুনে ৭৩৭ জন রোগী ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেও জুলাই থেকে সেই সংখ্যা দেড় হাজার ছাড়িয়ে যায়।

২০২২ সালের আগস্টে ৩ হাজার ৫২১ জন, সেপ্টেম্বরে ৯ হাজার ৯৯১ জন, অক্টোবরে ২১ হাজার ৯৩২ জন, নভেম্বরে ১৯ হাজার ৩৩৪ জন এবং ডিসেম্বরে ছিল ৫ হাজার ২৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়। 

গত বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ছিল ৬২ হাজার ৩৮২ জন এবং মারা গিয়েছিল ২৮১ জন।

ডেঙ্গু ব্যানার

২০২৩ সালের জুলাই

২০২২ সালে ডেঙ্গুতে সর্বাধিক ২৮১ জনের মৃত্যু হয়। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে এ বছরের ১ আগস্ট পর্যন্ত ২৬১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শুধু জুলাইয়েই ২০৪ জন মারা গেছেন। এর আগে বাংলাদেশে কখনো এক মাসে ডেঙ্গুতে এত মৃত্যু দেখা যায়নি।

এর আগে, গত বছরে নভেম্বরে এক মাসে সর্বোচ্চ ১১৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০১৯ সালের আগস্টে সর্বাধিক ৫২ হাজার রোগী ভর্তি হলেও মৃত্যু ছিল ৮৩ জন। এ বছরের জুলাইয়ে মোট রোগীর সংখ্যা ৪৩ হাজার ৮৫৪ জন, যা আগে কখনও দেখা যায়নি।

ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের সর্বোচ্চ সময়

গত চার বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৯ সালে ডেঙ্গুর সর্বোচ্চ প্রাদুর্ভাব দেখা গিয়েছিল আগস্টে, ২০২১ সালে আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে আর ২০২২ সালে অক্টোবর ও নভেম্বরে। অর্থাৎ ধীরে ধীরে বছরের শেষদিকে ডেঙ্গুর সর্বোচ্চ প্রাদুর্ভাব দেখা যায়।

আবার বছরের শেষভাগে যাওয়ার কারণে পরবর্তী বছরের জানুয়ারি থেকেই ডেঙ্গু রোগীর প্রকোপ দেখা যাচ্ছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে ৫ হাজার ২৪ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হলেও এ বছরের জানুয়ারিতে ৫৬৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৭ হাজার ৯৭৮ জন রোগী ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যা বাংলাদেশে আগে কখনও দেখা যায়নি।

আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, “ডেঙ্গু চিকিৎসায় রোগী ব্যবস্থাপনা ভালো থাকলে মৃত্যু কম হতে পারে। গত বছর অক্টোবরে সর্বোচ্চ প্রাদুর্ভাব দেখা গিয়েছিল। এবার নভেম্বর পর্যন্ত সেটা থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করছি। তারপর হয়তো কমতে পারে।”

তিনি আরও বলেন, “এখন ডেঙ্গু গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে। তাই অক্টোবর-নভেম্বর পর্যন্ত হয়তো গণহারে ডেঙ্গু রোগী বাড়তেই থাকবে।”

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, সারাদেশে এডিস মশা দমন বা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা খুব কঠিন হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও গবেষণা) অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর বলেন, “শুধু ঢাকা না, ডেঙ্গু যতটা না মেডিক্যাল প্রবলেম, তার চেয়ে বেশি পরিবেশগত সমস্যা।”

তিনি আরও বলেন, “এক্ষেত্রে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বেশি জরুরি। প্রাইমারি হেলথ এবং পাবলিক হেলথ (জনস্বাস্থ্য) এক নয়। জনস্বাস্থ্য হচ্ছে জনগণকে সম্পৃক্ত করে মশা নিয়ন্ত্রণ করা। এগুলো যদি আমরা বাড়াতে না পারি, আর ডেঙ্গু রোগী যদি এভাবে বাড়তে থাকে, আমাদের জন্য কঠিন হয়ে যাবে।”

অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর বলেন, “জরুরি ভিত্তিতে মশা নিয়ন্ত্রণে একটি ক্রাশ প্রোগ্রাম প্রয়োজন। যারা এসব কাজ (মশা নিয়ন্ত্রণ) করছেন, তারা যদি এই কাজগুলো আরো বেশি করেন, তাহলে যেভাবে রোগীর সংখ্যা বাড়চ্ছে সেটা কমানো যাবে এবং ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসাও যথাযথভাবে দেওয়া যাবে।”

এ স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আরো বলেন, “বর্তমানে সারাদেশেই ডেঙ্গু ছড়িয়েছে। এখন ঢাকা সিটির পাশাপাশি ঢাকার বাইরে রোগীর সংখ্যা বেশি। এডিস মশা যদি আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি, ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা খুব কঠিন হবে।”

এদিকে, স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক ঢাকার সরকারি হাসপাতালগুলোতে আরো দেড় হাজার শয্যা বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি জানান, যেখানে শয্যা দেওয়া সম্ভব, সেখানেই প্রস্তুত করা হচ্ছে। ঢাকা মেডিক্যাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী, কুয়েত-মৈত্রী, কুর্মিটোলা, বার্ন ইনস্টিটিউট, যেখানে জায়গা আছে শয্যা প্রস্তুতের জন্য বলে দেওয়া হয়েছে।

About

Popular Links