Tuesday, May 21, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

মানবপাচার: ১২ দেশ ঘুরে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছে গ্রেপ্তার হন কুমিল্লার মোফাজ্জল

বিপুল অঙ্কের অর্থ নিয়ে সংঘবদ্ধ মানবপাচার চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে বহু বাংলাদেশি নাগরিককে অবৈধ পথে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়ার প্রলোভন দেখাচ্ছে

আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০২৩, ০৪:৩৬ পিএম

উন্নত জীবন ও আর্থিক স্বচ্ছলতার আশায় অনেকে বিদেশে যেকোনো মূল্যে যেতে আগ্রহী। এই মানুষদের লক্ষ্যবস্তু করে দেশে ক্রমাগত মানবপাচারের ঘটনা ঘটছে। গত ১২ থেকে ১৭ মার্চের মধ্যে ৫০ জনের বেশি বাংলাদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার করে গায়ানার ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে দেশ ছেড়েছিলেন এবং অবৈধ পথে গায়ানায় প্রবেশের চেষ্টা করছিলেন।

এর সূত্র ধরে বাংলাদেশের একটি মানবপাচার চক্রের সন্ধান পায় যুক্তরাষ্ট্র। গত জুন মাসে এ ঘটনায় রাজধানীর গুলশান থানায় রুহুল আমিন, আকলিমা ও ফাহাদ হোসেন নামের তিনজনকে আসামি করে মামলা করে ঢাকার মার্কিন দূতাবাস।

এই মামলায় গত ১০ জুলাই রুহুল আমিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে পল্টন এলাকায় তার “জাপান ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস”র কার্যালয় থেকে একটি হার্ডডিস্ক জব্দ করা হয়। রুহুলের বিরুদ্ধে ২০২১ সালে যাত্রাবাড়ী থানায় আরও একটি মানবপাচারের মামলা রয়েছে। এই চক্রের সঙ্গে জড়িত আরিফ ও সনেট নামে আরও দুজনের খোঁজ পেয়েছে তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা। রুহুল আমিনসহ এই চক্রের সদস্যরা ১০০ জনের বেশি নাগরিককে ইতিমধ্যে গায়ানা ও সুরিনামে নিয়েছে।

মামলাটি তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (উত্তর) বিভাগ। পুলিশের এই বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) তারেক আহমেদ সংবাদমাধ্যম প্রথম আলোকে বলেন, “বিপুল অঙ্কের অর্থ নিয়ে সংঘবদ্ধ মানবপাচার চক্রটি দীর্ঘদিন থেকে বহু বাংলাদেশি নাগরিককে অবৈধ পথে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে সাহায্য করে আসছে। আমরা কেবল দুজনকে গ্রেপ্তার করেছি। এই চক্রের অন্য সদস্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।”

ভ্রমণ ও ব্যবসায়ী ভিসাকে ব্যবহার করে প্রতারক চক্র

মামলার তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাতে সংবাদমাধ্যম প্রথম আলো জানায়, প্রতারক চক্রের সদস্যরা লোকজনকে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বড় অঙ্কের টাকা নেন। এরপর প্রথমে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় ভারতে। সেখান থেকে ভ্রমণ ও ব্যবসায়ী ভিসায় নেওয়া হয় তুরস্কের ইস্তাম্বুলে। পরে নতুন বোর্ডিং পাস ও নতুন টিকিটে তাদের কোপা ও ক্যারিবিয়ান এয়ারলাইনসের ফ্লাইটে করে নেওয়া হয় গায়ানা ও সুরিনামে। সেখান থেকে মেক্সিকো সীমান্ত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করান।

পাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়ে পড়েছিলেন কুমিল্লার মোফাজ্জল হোসেন। পাঁচ বছর আগে (২০১৮ সালের ১০ মার্চ) যশোর সীমান্ত দিয়ে প্রথমে তাকে ভারতে নেওয়া হয়। পরে উড়োজাহাজে করে তাকে নেওয়া হয় আফ্রিকার দেশ কেনিয়ায়। সেখান থেকে আরেক ফ্লাইটে ইথিওপিয়া হয়ে নেওয়া হয় ব্রাজিলে। পরে ব্রাজিল সীমান্ত পার করে তাকে নেওয়া হয় পেরু। পেরু থেকে কলম্বিয়া হয়ে তিনি পৌঁছান পানামায়। পরে পানামা থেকে কোস্টারিকা, নিকারাগুয়া, হন্ডুরাস, গুয়াতেমালা হয়ে মোফাজ্জল পৌঁছান মেক্সিকোয়। মেক্সিকো সীমান্ত দিয়ে তাকে পাচার করা হয় যুক্তরাষ্ট্রে। চার মাসের যাত্রায় যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছেছিলেন তিনি।

বৈধ কাগজপত্র না থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন মোফাজ্জল। যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালত তাকে পাঁচ বছরের জন্য দেশটিতে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেয়।

অবর্ণনীয় কষ্ট ভোগ করে আবার দেশে ফিরে এসেছেন মোফাজ্জল। গত ৫ জুলাই রাজধানীর শাহজাহানপুর থানায় মানবপাচার প্রতিরোধ আইনে একটি মামলা করেছেন তিনি।

যারা এভাবে যুক্তরাষ্ট্রে মানবপাচার করছেন, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনতে কাজ চলছে বলে মার্কিন দূতাবাসের মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা ও ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (উত্তর) বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) ফজলুর রহমান জানিয়েছেন।

তিনি সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, “গ্রেপ্তার রুহুল আমিন ও আকলিমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে চক্রের কয়েকজন সদস্যের নাম জানা গেছে। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।”

মানবপাচার: আধুনিক দাসত্বের দিকে ঝুঁকছে বাংলাদেশ

গত ২৬ জানুয়ারি জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনের বরাতে বাংলাদেশে মানবপাচারে ঘটনা ও কোন অঞ্চলে বেশি চক্র গড়ে উঠেছে- তা নিয়ে খবর প্রকাশ করে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির বাংলা সংস্করণ।

জাতিসংঘের অভিবাসন বিষয়ক সংস্থা আইওএম এবং জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক দপ্তরের “ট্রাফিকিং ইন পার্সনস ইন বাংলাদেশ” শীর্ষক প্রতিবেদনের বরাতে বিবিসি জানায়, জেলা হিসেবে বাংলাদেশের সাতটি জেলায় সবচেয়ে বেশি মানবপাচারের ঘটনা ঘটে। জেলাগুলো হলো- মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, নড়াইল, ঝিনাইদহ, শরীয়তপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং হবিগঞ্জ। এসব জেলা থেকে প্রতি লাখে দেড় জনের বেশি মানুষ পাচারের শিকার হন।

জাতিসংঘের প্রতিবেদনটিতে বলা হচ্ছে যে, যেসব কারণে মানবপাচার হয় তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘটে থাকে উন্নত জীবনের আশায় এবং আর্থিক স্বচ্ছলতার প্রলোভনে। প্রায় ৫১% মানুষ অর্থনৈতিক কারণে পাচারের শিকার হন।

বাংলাদেশের সঙ্গে প্রত্যাবাসনের চুক্তি রয়েছে এমন দেশে ২০২০ সালে বাংলাদেশ থেকে মোট ৭৩০টি মানবপাচারের ঘটনা ঘটেছে। ২০১৭ সালে ৭৭৮টি এবং ২০১৮ সালে ৫৬১টি মানবপাচারের ঘটনা ঘটে।

এর বাইরে যেসব দেশের সঙ্গে প্রত্যাবাসন চুক্তি নেই সেসব দেশে বাংলাদেশ থেকে কত মানুষ পাচার হয়েছে সে সংক্রান্ত কোনো তথ্য জাতিসংঘ জানায়নি।

মানব পাচার ঠেকাতে করণীয় কী

গত ২ আগস্ট “বিশ্ব মানবপাচার বিরোধী” দিবসের এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, “পাচারের শিকার ব্যক্তিকে উদ্ধার ও পুনর্বাসনের পাশাপাশি পাচারের ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের আগে থেকে সচেতন করা গেল পাচার রোধ করা সম্ভব।”

তিনি বলেন, “প্রতিটি মানবপাচার ঘটনার তদন্ত ও বিচার করতে আমরা বদ্ধ পরিকর। এটি একটি গুরুতর অপরাধ। আমাদের উদ্ধার, প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসন ছাড়াও আমাদের সমন্বিতভাবে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। যাতে পাচারের শিকার হতে পারেন এমন ব্যাক্তিরা আগে থেকেই সচেতন হতে পারেন।”

About

Popular Links