Sunday, May 19, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

প্রেমিকার অবহেলা, সম্মানহানির ভয় আর দরিদ্র বাবা-মায়ের স্বপ্ন ‘শুয়ে আছে কবরে’

প্রেমিকার সঙ্গে পরিচয় করাতে মাকে ক্যাম্পাসে নিয়ে এসেছিলেন ফিরোজ কাজী। কিন্তু বাবা দিনমজুর হওয়ায় ফিরোজের মায়ের সঙ্গে আর দেখা করেনি তার প্রেমিকা

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০২:২৩ পিএম

এক সতীর্থের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল ঢাকা শ্বিবিদ্যালয়ের (ঢাবি) চাইনিজ ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড কালচার বিভাগের শিক্ষার্থী ফিরোজ কাজীর। কিছুদিন আগে প্রেমিকার সঙ্গে পরিচয় করাতে গ্রাম থেকে মাকে ক্যাম্পাসে নিয়ে এসছিলেন তিনি। কিন্তু বাবা দিনমজুর হওয়ায় ফিরোজের মায়ের সঙ্গে আর দেখা করেননি তার প্রেমিকা। ফিরোজ মাকে নিয়ে ফেরেন গোপালগঞ্জ সদরের পুখুরিয়ার বাড়িতে। সেই দফা বাড়ি ফিরেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হন তিনি।

চিকিৎসা শেষে শনিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরেন ফিরোজ। ঢাকায় যাওয়ার আগে বিমর্ষ এই তরুণ মাকে কথা দিয়েছিলেন, “আত্মহত্যা” করবেন না। তবে সেই কথা রাখতে পারেননি। মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় ৭১ হলের ছয়তলা থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি।

মঙ্গলবার বিকেলে গ্রামের বাড়িতে ফিরোজের মরদেহ পৌঁছায়। তার মৃত্যুতে গ্রামের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। ছেলের এমন মৃত্যুতে শোকে কাতর মা। এদিকে ছেলেকে হারিয়ে নির্বাক দিনমজুর বাবা চুন্নু কাজী। দিনমজুরি করে ফিরোজসহ তিন সন্তানের পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছিলেন চুন্নু। দ্বিতীয় সন্তানের এমন চলে যাওয়া তাকে পাথর বানিয়ে দিয়েছে।

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিরোজের বাবার কাছে খবর আসে ফিরোজ কাজী আত্মহত্যা করেছেন। এরপর ঢাকায় ছুটে যায় পরিবারের সদস্যরা। তারা জানতে পারেন, মঙ্গলবার রাত ২টা ৪০ মিনিটে ফিরোজের কক্ষে টেবিলে রাখা একটি প্যাডে কিছু লেখা দেখতে পান তার বন্ধুরা। এ সময় তার টেবিলে মুরগির মাংস ও ভাত রাখা ছিল। বন্ধুরা তার জন্য খাবার রুমে এনে রেখেছিলেন। ফিরোজ তা না খেয়েই হঠাৎ রুম থেকে বেরিয়ে যান। কিছুক্ষণ পরই বিজয় ৭১ হলের ভবন থেকে পড়ে যাওয়ার খবর পান তারা। এরপর ফিরোজের  পরিবারের সদস্যদের কাছে ফোন করা হয়।

মা-বাবাকে চিন্তা করতে নিষেধ করেছিলেন ফিরোজ

ফিরোজের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার মা বিলাপ করছেন। এ সময় তার মায়ের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, “আমার ছাওয়ালডা গতকাল (সোমবার) রাত ৯টার সময় ফোন দিয়েছিল। আমাকে ফোন দিয়ে বলে, মা আমি ভালো আছি। তুমি আমরে নিয়া চিন্তা কইরো না। আমি এখানে খুব ভালো আছি। এইডা-ই  আমার বাবার সাথে আমার শেষ কথা হইছে। আমার বাবা আমারে আর কিছু বইলে যায় নাই।”

ফিরোজ কাজীর বাবা চুন্নু কাজী  বলেন, “ছেলের এমন মৃত্যুর খবর মেনে নিতে পারছি না। প্রায়ই বাড়িতে কথা বলত। আমাদের খোঁজ-খবর নিতো। আমার বুকের ধন চলে গেল। আর কারও সন্তানের যেন এমন মৃত্যু না হয়।”

তিনি আরও বলেন, “গতকাল (সোমবার) রাত ৯টার সময় ফিরোজের সাথে কথা হয়েছিল আমাদের। তখন আমার ছেলে আমাদের সাথে ভালোভাবে কথা বলছিল। সে বলেছিল, তাকে নিয়ে যেন আমরা চিন্তা না করি। কিন্তু রাত আর পার হলো না। রাত শেষ হওয়ার আগেই চিন্তা শেষ করে দিছে।”

মা-বাবার স্বপ্ন ফিরলো লাশ হয়ে

ফিরোজদের প্রতিবেশী রাফিন মোল্লা বলেন, “চুন্নু কাজী এলাকায় কৃষিকাজ করেন। অনেক কষ্ট করে ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালাতেন। তিন ছেলে মধ্যে ফিরোজ কাজী ছিলেন দ্বিতীয়। মা-বাবার স্বপ্ন ছিল ছেলে লেখাপড়া শেষ করে ভালো চাকরি করবে। সেদিন হয়ত তাদের কষ্ট ঘুচবে। লেখাপড়া শেষ করার আগে ছেলে ফিরল লাশ হয়ে।”

ফিরোজের সুইসাইড নোটে যা লেখা আছে

ফিরোজের মৃত্যুর পর একটি সুইসাইড নোট পাওয়া গেছে। তবে সেটি ফিরোজের লেখা কি-না তা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সেখানে লেখা আছে, “মানুষ বাঁচে তার সম্মানে। আজ মানুষের সামনে আমার যেহেতু সম্মান নাই। এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার আমার কোনো অধিকার নাই। আমার মৃত্যুর দায়ভার একান্ত আমার। সরি মা! বাড়ি থেকে তোমাকে দিয়ে আসা কথা রাখতে পারলাম না। আমি জীবন নিয়ে হতাশ।”

সুইসাইড নোটে কিছুটা ফাঁকা রেখে পরের অনুচ্ছেদে লেখা, “আমার ওয়ালেটের কার্ডে কিছু টাকা আছে। বন্ধুদের কাছে অনুরোধ রইলো মায়ের হাতে দিতে। আমার লাশের পোস্টমর্টেম না করে যেন বড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কোনো আইনি ঝামেলায় কাউকে যেন জড়ানো না হয়। সবাই বাঁচুক, শুধু শুধু পৃথিবীর অক্সিজেন আর নষ্ট করতে চাই না।”

About

Popular Links