Thursday, May 30, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

৪৪৭ টাকা মাসিক আয়ের বাবলু এমপি হয়ে কোটিপতি

  • এমপি বাবলুর গৃহিণী স্ত্রীও কোটিপতি
  • একাদশ সংসদ নির্বাচনে অনেকটা ‘ভাগ্যের জোরে’ বগুড়া-৭ নির্বাচিত হন তিনি
আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৭:৪৯ পিএম

একসময় স্থানীয় একটি দৈনিকে সাংবাদিকতা করতেন। চলাফেরার সঙ্গী ছিল ভাঙা মোটরসাইকেল। আয়ের নির্দিষ্ট কোনো উৎস ছিল না। কিন্তু একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অনেকটা “ভাগ্যের জোরে” বগুড়া-৭ (গাবতলী-শাজাহানপুর) থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এখন সেই রেজাউল করিম বাবলু হয়ে গেছেন কোটিপতি। শুধু তিনিই নন, তার স্ত্রীর সম্পদও কোটি টাকার বেশি।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন বাবলু। মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দেওয়া সম্পদের বিবরণীতে এসব তথ্য জানা গেছে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হলফনামায় রেজাউল করিম বাবলু পেশা হিসেবে ব্যবসা ও সাংবাদিকতার কথা উল্লেখ করেছিলেন। সেসময় তার কাছে ছিল নগদ ৩০,০০০ টাকা ও ব্যাংকে জমা ছিল ৩০,০০০ টাকা। তার সেই পুরনো মোটরসাইকেলের দাম দেখিয়েছিলেন ৫০,০০০ টাকা। তখন বাবলুর বার্ষিক আয় ছিল ৫,০০০ টাকা। আর মাসিক আয় ৪১৭ টাকা।

হাজার থেকে কোটিতে

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হলফনামায় ইট, বালু, সিমেন্ট, অনলাইন পোর্টাল ও খাদ্য ব্যবসার কথা উল্লেখ করেছেন বাবলু। তার আয় বেড়েছে কয়েকশ’ গুণ। এখন তিনি ও তার ওপর নির্ভরশীলদের বার্ষিক আয় ৩৬ লাখ ২৪ হাজার ৩৩৫ টাকা। সে হিসেবে তার মাসিক আয় ৩ লাখ ২ হাজার ২৮ টাকা। এখন তার একটি নিশান জিপ ও একটি ল্যান্ড ক্রুজার রয়েছে। যার মূল্য ১ কোটি ৪ লাখ ৪৫ হাজার টাকা।

একাদশ জাতীয় নির্বাচনের হলফনামায় আয়ের উৎস হিসেবে কৃষি খাত থেকে বছরে তিন হাজার টাকা ও ব্যবসা থেকে বছরে দুই হাজার টাকা আয়ের কথা উল্লেখ করেন। এবারের হলফনামায় কৃষি খাতে তার কোনো আয়ের উল্লেখ নেই। বাড়ি ভাড়া থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা; ইট, বালু, সিমেন্ট ও অনলাইন পোর্টাল থেকে বছরে আয় ১১ লাখ ১৫ হাজার টাকা এবং সংসদ সদস্য হিসেবে প্রাপ্ত সম্মানী ও আনুতোষিক ২৩ লাখ ২৪ হাজার ২২৫ টাকা বলে উল্লেখ করেছেন।

হলফনামা অনুযায়ী, বর্তমানে তার কাছে ৫ লাখ ৫০ হাজার নগদ টাকা আছে। এবার ব্যাংকে কোনো সঞ্চয় থাকার বিষয়টির উল্লেখ নেই। গত নির্বাচনের হলফনামায় বাবলুর নামে কোনো বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্ট উল্লেখ ছিল না। বর্তমানে তার নামে ১৫ লাখ টাকার একটি অ্যাপার্টমেন্ট আছে। সবমিলিয়ে বর্তমানে তার সম্পদের মূল্য ১ কোটি ৬৪ লাখ ৩৯ হাজার ৩৩৫ টাকা।

সম্পদশালী হয়েছেন স্ত্রীও

গেল পাঁচ বছরে বাবলুর স্ত্রী বিউটি বেগমও অনেক অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছেন। যদিও তিনি একজন গৃহিণী। গত নির্বাচনের হলফনামায় স্ত্রীর নামে নগদ অর্থ কিংবা ভবন ছিল না। এবার তার নামে কোটি টাকার বেশি মূল্যের এক হাজার বর্গফুটের একটি ভবন আছে। আগে হলফনামায় স্বর্ণের উল্লেখ না থাকলেও এবার স্ত্রীর নামে বৈবাহিক সূত্রে ১০ ভরি স্বর্ণালংকারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

ওই সময় বাবলুর নিজের কাছে ছয় ভরি স্বর্ণ থাকলেও এবার তার উল্লেখ নেই। বর্তমানে বিউটি বেগমের নামে নগদ দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং তিন লাখ টাকা মূল্যের একটি মোটরসাইকেল রয়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হলফনামায় তার কৃষি জমির পরিমাণ ছিল ৪৫ শতক এবং অকৃষি জমির মূল্য ছিল ৪৫ লাখ টাকা। এবারের হলফনামায় কৃষি জমির উল্লেখ নেই। তবে, ৩৫ হাজার টাকা মূল্যের অকৃষি জমির উল্লেখ আছে।

উত্থান

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রেজাউল করিম বাবলু ওরফে শওকত আলী গোলবাগী বাবলু স্থানীয় দৈনিকে বিনা বেতনে সাংবাদিকতা করতেন। চলাফেরা করতেন ভাঙা মোটরসাইকেলে। আয়ের নির্দিষ্ট কোনো উৎস ছিল না। গত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-৭ (গাবতলী-শাজাহানপুর) আসনে অনেকটা ভাগ্যের জোরে স্বতন্ত্র এমপি নির্বাচিত হন তিনি। কারণ, ওই নির্বাচনে তিনি পেয়েছিলেন আওয়ামী লীগ বিরোধীদের সমর্থন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রেজাউল করিম বাবলু বলেন, “আমার কোনো অবৈধ সম্পদ নেই। দুদকের (দুর্নীতি দমন কমিশন) নোটিশের সঠিক জবাব দেওয়ায় অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। আবারো নির্বাচিত হতে পারলে অসমাপ্ত ও নতুন নতুন উন্নয়ন কাজ করব। সাংবাদিকরা আমার বিরুদ্ধে ভুয়া ও মিথ্যা রিপোর্ট করলেও তাদের জন্যও কাজ করে যাব।”

রেজাউল করিম বাবলু সাংবাদিকদের বলেন, “আয়কর বিভাগে জমা দেওয়া তথ্য হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে। অনেকদিন ধরে ইট, বাল ও সিমেন্টের ব্যবসা করি। এছাড়া গিগা ফুড ও জিটিটিভি নিউজ২৪ ডটকম নামে দুটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব থেকে আয়ের কথা আয়কর বিবরণীতে উল্লেখ আছে।

স্ত্রী বিউটি বেগমের আয়ের ব্যাপারে তিনি বলেন, “গত পাঁচ বছর এমপির সম্মানীর টাকা স্ত্রীকে দিয়েছি। সেই টাকা থেকেই স্ত্রী সম্পদ করেছে।”

যেভাবে এমপি হন বাবলু

বগুড়া-৭ আসনটি মূলত বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার নির্বাচনী এলাকা বলে পরিচিত। এই আসন থেকে খালেদা জিয়া কয়েকবার এমপি নির্বাচিত হন। তবে প্রতিনিধিত্ব না করে তিনি আসনটি ছেড়ে দিতেন। কারান্তরীণ থাকায় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খালেদা জিয়া প্রার্থী হতে পারেননি। সেখানে মনোনয়ন দেওয়া হয় গাবতলী উপজেলা বিএনপির সভাপতি মোরশেদ মিল্টনকে। তিনি গাবতলী উপজেলা চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তবে, তার পদত্যাগপত্র গৃহীত না হওয়ায় মনোনয়ন বাতিল হয়ে যায়। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট থেকে এই আসনে জাতীয় পার্টির অ্যাডভোকেট আলতাফ আলী প্রার্থী হন। সেই সঙ্গে প্রয়াত আজম খানের স্ত্রী ফেরদৌস আরা খানকে স্বতন্ত্র প্রার্থী করা হয়। নির্বাচনে নৌকা ঠেকাতে বিএনপি স্বতন্ত্র প্রার্থী বাবলুর ট্রাক মার্কাকে সমর্থন দেয়। বিএনপির সমর্থনেই সেবার বাবলু নির্বাচিত হন।

এমপি হওয়ার কয়েকদিন পর থেকে বাবলু ৩৬ লাখ টাকা মূল্যের গাড়ি ব্যবহার শুরু করেন। তিনি দাবি করেন, বঙ্গবন্ধুর মাজার জিয়ারতের জন্য স্থানীয় ইটভাটার মালিক বন্ধুরা তাকে গাড়িটি উপহার দেন। ফেসবুকে পিস্তল হাতে ছবি শেয়ার দিয়েও তিনি আলোচিত হন। শাজাহানপুর উপজেলা চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা সোহরাব হোসেন ছান্নুকে হত্যার হুমকি দিয়ে জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি করেন।

বাবলুর সম্পদের অনুসন্ধান করেছে দুদক

এমপি বাবলুর বিরুদ্ধে অবৈধভাবে শত কোটি টাকার সম্পদ গড়ার অভিযোগ উঠলে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) বগুড়া কার্যালয় থেকে ২০২১ সালের মার্চে তাকে সম্পদ বিবরণী জমা দেওয়া নির্দেশ দেওয়া হয়।

দুদকের সাবেক সহকারী পরিচালক আমিনুল ইসলাম জানান, তদন্তে এমপি বাবলুর বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অনেক সম্পদ পাওয়া যায়। এরপর তার বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার কথা। কিন্তু কেন সে মামলা হচ্ছে না সেটি জানা নেই।

এ প্রসঙ্গে বাবলু বলেন, “আমার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত কোনো সম্পদ নেই। এ কারণে দুদক মামলা করেনি।”

About

Popular Links