Sunday, May 26, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

উচ্চ আদালতের নির্দেশ, এবার কি বন্ধ হবে অবৈধ হাসপাতাল-ক্লিনিক?

  • দেশে অবৈধ হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ব্লাড ব্যাংকের সংখ্যা ১,০২৭টি
  • ভুয়া চিকিৎসক, অনভিজ্ঞ নার্স ও অদক্ষ আয়া দিয়ে চলছে চিকিৎসা কার্যক্রম
  • দেশের মাত্র ৩৫% চিকিৎসা সরকারি হাসপাতালে হয়
আপডেট : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৩:৩৭ পিএম

দেশে অবৈধ বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ব্লাড ব্যাংকের সংখ্যা ১,০২৭টি। আর লাইসেন্স আছে ১৫,২৩৩টি প্রতিষ্ঠানের। হাইকোর্টে দাখিল করতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের (স্বাস্থ্যসেবা) পক্ষে দেওয়া এক প্রতিবেদনে এ তথ্য এসেছে। প্রশ্ন উঠেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যদি জানে অবৈধ প্রতিষ্ঠানের নাম-ঠিকানা, তাহলে সেগুলো বন্ধ করতে বাধা কোথায়? কেন এতদিনেও এগুলো বন্ধ করা হয়নি। উচ্চ আদালতের নির্দেশের পর এবার কি এগুলো বন্ধ করা সম্ভব হবে?

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অবৈধ হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ব্লাড ব্যাংকের যে সংখ্যা বলেছে, বাস্তব চিত্র তার চেয়ে অনেক বেশি।

এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, “স্বাস্থ্য অধিদপ্তর উচ্চ আদালতে যে তালিকা দিয়েছে, বাস্তবে এই সংখ্যা আরও বেশি হবে। জনবল বা তথ্য ঘাটতির কারণে হয়ত তাদের রিপোর্টে বাস্তব চিত্রটা উঠে আসেনি। তারপরও সংখ্যাটা যাই হোক না কেন, অনুমোদন ছাড়া শিক্ষা বা স্বাস্থ্যের একটি প্রতিষ্ঠানও চলতে পারে না। দ্রুত এগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এখানে রাজনৈতিক বা অর্থের যতই দাপট থাকুক না কেন এ ব্যাপারে কোনো ছাড় দেওয়া উচিৎ নয়।”

রাজধানীর ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে খৎনা করাতে গিয়ে মৃত্যু হয় আয়ান নামে এক শিশুর/কোলাজ

“লাইফ সাপোর্ট থেকে ফিরল না আয়ান: খতনা করাতে গিয়ে মৃত্যু” শিরোনামে গত ৮ জানুয়ারি প্রতিবেদন প্রকাশ করে একটি জাতীয় দৈনিক। প্রকাশিত এই প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত খবর-প্রতিবেদন যুক্ত করে গত ৯ জানুয়ারি হাইকোর্টে রিট করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এ বি এম শাহজাহান আকন্দ। আবেদনে প্রাথমিক শুনানির পর গত ১৫ জানুয়ারি রুলসহ আদেশ দেন বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি মো. আতাবুল্লাহর হাইকোর্ট বেঞ্চ। আয়ানের মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান করে সাত দিনের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে সারাদেশে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত বা অনুমোদনহীন কতগুলো বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার আছে, সে বিষয়েও একটি প্রতিবেদন চান হাইকোর্ট। রবিবার সেই রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান বলেন, “আমরা উচ্চ আদালতে যে তালিকা দিয়েছি, সেটা কম-বেশি হতে পারে। আমরা সবগুলোর জেলার সিভিল সার্জনদের কাছে অবৈধ বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ব্লাড ব্যাংকের তালিকা চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলাম। তারা অনুসন্ধান করে যে তালিকাটা দিয়েছে, আমরা সেটাই উচ্চ আদালতে জমা দিয়েছি। তালিকা হাতে পাওয়ার পর আমরা সবগুলো প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিতে চিঠি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি। ইতোমধ্যে অনেকগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। এ ব্যাপারে আমরা কাউকে ছাড় দেব না।”

কিছুদিন পরপর অবৈধ হাসপাতাল ও ক্লিনিকের বিরুদ্ধে অভিযান চালায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এতে কিছু হাসপাতাল বন্ধও হয়। কিছুদিন পর আবারও চালু হয়। এভাবেই চলছে স্বাস্থ্য বিভাগের বেসরকারি খাত। এমন পরিস্থিতিতে জনগণকে মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন বিশেষজ্ঞরাও।

গত ২০ জানুয়ারি স্বাস্থ্য বিভাগের অভিযানে যশোরের চৌগাছা উপজেলায় দুটি বেসরকারি ক্লিনিক বন্ধ ও চারটির মালিককে জরিমানা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত/ঢাকা ট্রিবিউন

আগের অভিযানে যেগুলো বন্ধ করা হয়েছিল সেগুলোর মধ্যে অনেকগুলোই পরের অভিযানে চালু অবস্থায় পাওয়া গেছে? গত বছর দুই দফায় অভিযান চালায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। প্রথম দফায় সাড়ে ১,৬০০ অবৈধ হাসপাতাল ও ক্লিনিক বন্ধ করা হয়েছে। আর দ্বিতীয় দফায় বন্ধ করা হয় ৮৬০টি অবৈধ হাসপাতাল ও ক্লিনিক।

বন্ধ করার পর আবার কীভাবে সেগুলো চালু হয়? জানতে চাইলে ঢাকা জেলার সিভিল সার্জন ডা. আবুল ফজল মো. সাহাবুদ্দিন খান বলেন, “বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক দেখার জন্য আমাদের আলাদা কোনো জনবল নেই। একেক সময় একেক জনকে দায়িত্ব দিয়ে এটা করা হয়। আর আমাদের মোবাইল কোর্ট চালাতে হলে ডিসির কাছ থেকে নিতে হয়। ফলে আমরা চাইলেই সবসময় অভিযান চালাতে পারি না। আমার কোনো কর্মকর্তা যদি কোথাও গিয়ে অবৈধ এমন প্রতিষ্ঠান দেখেন তিনি বন্ধ করতে বললেও তারা অনেক সময় করেন না। কারণ তারা জানেন আমাদের হাতে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো ক্ষমতা নেই। আমার ঢাকা জেলা একটা বিশাল এলাকা। এখানে কোন গলির মধ্যে একটা রুমে ক্লিনিক খুলে ব্যবসা শুরু করলে সেটা দেখারও কোনো সুযোগ আমাদের নেই। কারণ আমার হাতে তো স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) নেই। কোনো দুর্ঘটনা যদি ঘটে বা সাংবাদিকরা যদি লেখেন তাহলে আমরা জানতে পারি। ফলে আমাদের এগুলো দেখার জন্য নির্দিষ্ট লোকবল ও ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দিতে হবে। তাহলে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসবে।”

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চালানো অভিযানে দেখা গেছে, অনেক হাসপাতালে নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চলছে চিকিৎসা। নেই সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী অবকাঠামো। এক্সরে মেশিন এমন জায়গায় রাখা হয় যেখানে ন্যূনতম সুরক্ষা-ব্যবস্থা নেই। এতে এক্সরে করতে আসা রোগী, যিনি এক্সরে করাচ্ছেন তিনি এবং আশপাশের মানুষ ভয়াবহ রেডিয়েশনের শিকার হচ্ছেন। রি-এজেন্ট অর্থাৎ কেমিক্যালের পাশে রাখা হচ্ছে তরকারি। ভুয়া চিকিৎসক, অনভিজ্ঞ নার্স ও অদক্ষ আয়া দিয়ে চলছে চিকিৎসা কার্যক্রম। অর্থাৎ চিকিৎসার নামে মরণব্যবস্থা চালু আছে।

বাংলাদেশ প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মনিরুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, “দেশের মাত্র ৩৫% চিকিৎসা সরকারি হাসপাতালে হয়, বাকি ৬৫% হয় বেসরকারি হাসপাতালে। ফলে বেসরকারি খাতের অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে করোনাভাইরাসের সময় আমাদের এখানে যে চিকিৎসা হয়েছে, সেটা তো আপনি অস্বীকার করতে পারবেন না। উন্নত দেশগুলো যেখানে হিমশিম খেয়েছে সেখানে আমরা কত চমৎকারভাবে সামাল দিয়েছি। এগুলো মাথায় নিয়েই অভিযান চালাতে হবে। অবৈধদের বিরুদ্ধে অভিযানে আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু বৈধ যারা, তাদের যেন কোনোভাবেই হয়রানি করা না হয়, সেদিকেও বিশেষ নজর রাখতে হবে।”

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেন, “দেশের আনাচে-কানাচে গজিয়ে উঠেছে হাজার হাজার অনিবন্ধিত ক্লিনিক-হাসপাতাল। ফলে অধিকাংশ হাসপাতালে প্রতিদিনই ঘটছে নানা অঘটন। ভুল চিকিৎসার শিকার হয়ে রোগীদের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটছে প্রায়ই। অনেক প্রতিষ্ঠানের তথ্যও নেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে। দেশজুড়ে এমন অবৈধ, নিবন্ধনহীন হাসপাতালের সংখ্যা হাজার হাজার। যেগুলোর বেশিরভাগেরই নাম ও অবস্থান জানে না অধিদপ্তর। অনলাইনে আবেদনের পর স্বাস্থ্য বিভাগের একটি টোকেন, সিটি কর্পোরেশনের ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা করছেন ক্লিনিক মালিকেরা। এসব অবৈধ, নিবন্ধনহীন ক্লিনিক-হাসপাতাল বন্ধে নানা সময়ে অভিযান পরিচালিত হলেও আসলে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। বরং এই সংখ্যা দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে।”

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, “এভাবে শৃঙ্খলা ফেরানো যাবে না। শুধু অভিযান চালিয়ে চলে গেলে হবে না। লাগাতার পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এই দুর্বলতা শুরু থেকেই রয়েছে। আসলে প্রয়োজন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে একটা আলাদা উইং তৈরি করা। তাদের পর্যাপ্ত জনবল ও সুযোগসুবিধা দিতে হবে। তারা সারাবছরই এগুলো মনিটরিং করবে। এর পাশাপাশি মফস্বলে স্থানীয় প্রশাসনকেও এর সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে। প্রয়োজনে তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। আর বন্ধ করাও কোনো সমাধান না। যেগুলো তৈরি হয়েছে, সেগুলো কীভাবে সঠিক পথে আনা যায় সেই চেষ্টাও করতে হবে। তাহলেই গড়ে উঠবে সুশৃঙ্খল স্বাস্থ্য খাত।”

 

About

Popular Links