Tuesday, May 21, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

‘চেয়ারম্যান মারে আর বলে, স্বীকার কর চুরি করছস’

ঢাকার ধামরাইয়ে মো. হাসেম আলী (৩৯) নামে এক ব্যক্তিকে নির্যাতনের এমন বর্ণনা দিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শী

আপডেট : ১০ মার্চ ২০২৪, ১২:১৩ এএম

“কোরবানির গরুর মতো বেঁধে মারছে। রক্ষা পেতে কান্নাকাটি করছে। ‘বাবা’ ডাকছে। তাও ছাড়ে নাই। মারে আর বলে, স্বীকার কর চুরি করছস। স্বীকার না করায় আরও বেশি মারছে,” ঢাকার ধামরাইয়ে মো. হাসেম আলী (৩৯) নামে এক ব্যক্তিকে নির্যাতনের এমন বর্ণনা দিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শী।

মঙ্গলবার (৫ মার্চ) রাত ১০টার দিকে উপজেলার কুল্লা ইউনিয়নের বড় চন্দ্রাইল এলাকায় চেয়ারম্যান লুৎফর রহমানের বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। আহত হাসেম আলী ধামরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন। তার বাড়ি একই ইউনিয়নের খাতরা এলাকায়। 

স্বজনদের অভিযোগ, কুল্লা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. লুৎফর রহমান, তার দুই ছেলে এবং তাদের কয়েকজন সহযোগী মিলে হাসেমকে মারধর করেছেন।

তারা বলছেন, একটি জমি নিয়ে লুৎফর রহমানের পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই তাদের বিরোধ চলে আসছে। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সময় বিবাদেও জড়িয়েছে উভয়পক্ষ। এ কারণে পরিবারটির ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন লুৎফর রহমান। কিছুদিন ধরে চেয়ারম্যানের বাড়ি সংলগ্ন স্থানীয় আব্দুল বারেক নামে এক ব্যক্তির পাঁচতলা ভবনের নির্মাণকাজ করছিলেন হাসেম। গত ৫ মার্চ সেখান থেকে ১ লাখ টাকা বিল পান তিনি। বাড়ি ফেরার সময় তাকে আটক করে চেয়ারম্যানের লোকজন। 

খবর পেয়ে হারেছুল ইসলাম নামে এক শুভাকাঙ্খী তাকে ছাড়াতে যান। কিন্তু চেয়ারম্যান ও তার লোকজন বাধা উপেক্ষা করে হাসেমকে বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেট আটকে দেয়। সেখানেই তাকে নির্যাতন করা হয়। 

স্থানীয়রা জানান, গত ৫ মার্চ রাত ১০টার দিকে স্থানীয় আনোয়ারের বাড়ির কাছে ‘‘চোর চোর’’ বলে চিৎকার শুনতে পান তারা। বাড়ির কাছে গিয়ে দেখেন হাসেমকে কয়েকজন চড়-থাপ্পড় দিচ্ছে। একপর্যায়ে সেখানে উপস্থিত হন হারেছ। তিনি সেখান থেকে ভুক্তভোগীকে নিয়ে তার বাড়ির দিকে রওনা দেন। পথিমধ্যে চেয়ারম্যানের বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছালে তিনি বাড়ি থেকে বের হয়ে হাসেমকে জোর করে তার বাড়ির ভেতরে নিয়ে যান। এ সময় আরও কয়েকজন ভেতরে ঢোকে। এর কিছুক্ষণ বাড়ির ভেতর থেকে হাসেমের চিৎকার শুনতে পান তারা। 

আহত হাসেমের বরাত দিয়ে তার ভাই মো. জাহের আলী বলেন, ‘‘বাড়িতে নিয়ে উঠানের মেঝেতে ফেলে তাকে পা দিয়ে মুখ চেপে ধরেন লুৎফর রহমান। আর তার দুই ছেলে প্লাস্টিকের রশি দিয়ে হাসেমকে পিঠমোড়া করে বেঁধে ফেলে। এরপর টানা আধা ঘণ্টা মারধর করা হয় তাকে।’’

ভুক্তভোগীর ভাই আরও বলেন, ‘‘হাসেমের চিৎকারে স্থানীয়রা টের পেয়ে আমাদের জানায়। আমরা ৯৯৯ নম্বরে কল দিয়ে পুলিশের সহযোগিতা চাই। প্রায় আধা ঘণ্টা পর ওই বাড়িতে ঢুকে পুলিশের এসআই অসীম বিশ্বাস হাসেমকে উদ্ধার করেন।’’ 

তিনি বলেন, ‘‘শুক্রবার রাতে আমরা থানায় গিয়ে ওসির সঙ্গে দেখা করেছি। বিষয়টি তাকে জানিয়েছি। তিনি আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে রবিবার সকাল ১০টায় যেতে বলেছেন।’’

হারেছুল ইসলাম জানান, ‘‘হাসেমকে কয়েকজন ধরে মারধর করছিল। বিষয়টির সত্যতা যাচাইয়ে হাসেমসহ অন্যদের নিয়ে আমার বাড়ির দিকে আসতে থাকি। চেয়ারম্যানের বাড়ির সামনে এলে তিনি তাকে আমার হাত থেকে টেনে তার বাড়িতে নিয়ে গেট বন্ধ করে দেন। কিছুক্ষণ পর বাড়ির ভেতর চিৎকার শুনতে পাই।’’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ‘‘হাসেমকে চেয়ারম্যান, তার দুই ছেলে এবং আরও কয়েকজন বেদম মারধর করছিল। একপর্যায়ে পুলিশ এলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।’’

আরেক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ‘‘ঘটনার সময় আমি চেয়ারম্যানের বাড়ির ভেতরে ছিলাম। দেখি চেয়ারম্যান উঠানের পাকা জায়গায় হাসেমের মুখ পা দিয়ে চেপে ধরে আছে। চেয়ারম্যানের ছেলে হাসেমকে রশি দিয়ে বাধে। প্রথমে দুই পা ভাঁজ করে বাঁধে। এরপর দুই হাত পায়ের সঙ্গে আটকে কোরবানির গরুর মতো বেঁধে ফেলে। এরপর মোটা পাইপ দিয়ে পেটাতে থাকে। হাসেম চিৎকার করে ছেড়ে দিতে বলে। পুলিশ আসার আগপর্যন্ত তাকে এভাবেই পেটাতে থাকে। কান্নাকাটি আর চিৎকার করেও রক্ষা মেলেনি।’’

এ বিষয়ে ধামরাই থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) অসীম বিশ্বাস বলেন, ‘‘রাত সাড়ে ১১টার দিকে জাতীয় জরুরি সহায়তা নম্বর ৯৯৯ এ খবর পেয়ে চেয়ারম্যানের বাড়িতে যাই। স্থানীয় জনতা হাসেমকে মারধর করেছে বলে চেয়ারম্যান জানান। পুলিশের কাছে না দিয়ে মারধর করা অন্যায় হয়েছে বলে ভুক্তভোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করি। সেখানে হাসেমের ভাই উপস্থিত ছিলেন। তিনি আমাকে বিষয়টি স্থানীয়ভাবে সমাধান করা হবে বলে জানান। এরপর আমি থানায় চলে আসি। আমি তাদের উভয়কে বলেছি, কারও কোনো অভিযোগ থাকলে থানায় এসে জানাতে।’’

কুল্লা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান লুৎফর রহমান বলেন, ‘‘একটি বাড়িতে চুরি করতে গেলে স্থানীয়রা তাকে ধাওয়া দিয়ে আটক করে মারধর করে। চৌকিদাররা উদ্ধার করে তাকে আমার বাসায় নিয়ে আসে। আমি থানায় ফোন করে বিষয়টি ওসি সাহেবকে জানাই। পুলিশ এসে তাকে হেফাজতে নেয়।’’

নির্যাতনের অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘‘না, এখানে কোনো মারধর করা হয়নি।’’

ধামরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সিরাজুল ইসলাম শেখ বলেন, ‘‘উভয়পক্ষকে রবিবার (১০ মার্চ) সকালে আসতে বলা হয়েছে। এরপর তাদের সঙ্গে কথা বলে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’

About

Popular Links