Monday, May 27, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

ফাঁকা ঢাকা কতটুকু নিরাপদ

  • ঈদের ছুটিতে দোকানপাট, মার্কেট ঝুঁকির মধ্যে থাকে
  • ঢাকার তিনটি এলাকা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ
আপডেট : ০৯ এপ্রিল ২০২৪, ০৪:৫৭ পিএম

ঈদের ছুটিতে ঢাকা একরকম ফাঁকাই হয়ে যায়। আর এবার ছুটি লম্বা হওয়ায় আরও বেশি মানুষ ঢাকা ছাড়ছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু এই ছুটির সময় ফাঁকা ঢাকায় চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইসহ নানা অপরাধ বেড়ে যায়।

তাই নগরবাসীকে পুলিশের পক্ষ থেকে এবার ১৪টি পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আর পুলিশও বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবে বলে জানিয়েছে।

গত কোরবানির ঈদের চার দিনে ঢাকার ৫০টি থানায় চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে শতাধিক। এর মধ্যে ফার্মগেট এলাকায় ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে এক পুলিশ কনস্টেবলও নিহত হয়েছেন। আর বাড্ডা এলাকায় দিনের বেলা একটি বাসার পাঁচজনকে হাত-পা বেঁধে ডাকাতির ঘটনা ঘটে ওই ছুটির মধ্যেই। ডাকাতরা নগদ ১১ লাখ ৩০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে যায়।

ব্যবসায়ী ও গৃহস্থদের অভিজ্ঞতা

ঈদের ছুটিতে দোকানপাট, মার্কেট বিশেষ করে স্বর্ণের দোকানগুলো ঝুঁকির মধ্যে থাকে। 

বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) সহ-সভাপতি এবং “অলংকার নিকেতন”-এর মালিক এম এ হান্নান আজাদ বলেন, “যাদের বড় মার্কেটে স্বর্ণের দোকান তাদের নিরাপত্তা নিয়ে তেমন উদ্বেগ নাই। কারণ সেখানে নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা আছে। পুরো মার্কেট সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায়। নিরাপত্তা প্রহরীরাও প্রশিক্ষিত। আর যাদের দোকান ছোট মার্কেটে বা আলাদা তাদের নিরাপত্তা ঝুঁকি বেশি। ওই সব দোকানেই ঈদের সময় চুরি-ডাকাতি হয়। অনেক সময় সিকিউরিটি গার্ডরাও এর সঙ্গে যুক্ত থাকেন।”

“আমাদের দাবি, ছুটির সময় যেন মার্কেট এলাকায় পুলিশের টহল বাড়ানো হয়। বিশেষ করে রাতে এই টহল বেশি হওয়া জরুরি। আর যেসব এলকা একটু বেশি ফাঁকা সেখানে টহল বেশি রাখা দরকার,” বলেন তিনি।

একই কথা জানালেন বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলালউদ্দিন। 

তিনি বলেন, “দোকানগুলোর ৮০-৮৫%-ই এখন সিসিটিভি ক্যামেরা ব্যবহার করে। মার্কেটগুলোও ক্যামেরার আওতায় রয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো কোথাও কোথাও সিকিউরিটি গার্ডরাই অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। তখন কিছু করার থাকে না।”

এই ব্যবসায়ী নেতা আরও বলেন, “আমরা এবার সিকিউরিটি গার্ডদের ছুটি না দেওয়ার জন্য বলেছি। ঈদের ছুটির পর তাদের পর্যায়ক্রমে ছুটি দেওয়া হবে।”

এদিকে, মিরপুরের গৃহিনী জেসমিন লিপি বলেন, “চোরচক্র কৌশল পাল্টেছে। তারা তাদের দলের নারী সদস্যদের ব্যবহার করছে। তারা সঙ্গে শিশুদের নিয়ে এমনভাবে যায় যে তারা কোনো বাসায় বেড়াতে এসেছে। এভাবে কৌশলে তারা ফ্ল্যাটে ঢুকে চুরি করে। আবার কোনো ফ্ল্যাটে দুইজন দারোয়ান থাকলে একজন ছুটিতে থাকে তখন সুযোগ বুঝে চোর দিনের বেলাতেই ঢুকে পড়ে।”

আর আলাদা  বা ছোট বাড়িতে গ্রিলকাটা চোর বা ডাকাতরা সুযোগ নেয় বলে জানান তিনি।  

তিনি বলেন, “এই সময়ে ফাঁকা ঢাকায় ছিনতাইকারী ও প্রতারক চক্র বেড়ে যায়। রাস্তার পাশে অসুস্থতার ভান করে কেউ শুয়ে থাকেন। আপনি সহায়তা করতে গেলেই বিপদে পড়ার আশঙ্কা আছে। আপনাকে চেতনানাশক দিয়ে প্রতারক সব কিছু কেড়ে নিতে পারে ।”

যেসব এলাকা অপরাধ প্রবণ

ঢাকার তিনটি এলাকাকে বেশি অপরাধপ্রবণ বলে বিবেচনা করা হয়। এই তিনটি এলাকা হলো মিরপুর, রমনা ও তেজগাঁও।

২০২৩ সালের জানুয়ারি  থেকে এ বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি)আটটি বিভাগে চুরির মামলা হয়েছে ১,৭৮৬টি, ডাকাতি ৩৭টি, দস্যুতা ২৫০টি, খুন ১৮০টি ও অপহরণের ৭৭টি মামলা হয়েছে। আর ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে ১৭৪টি।

এই সময়ে পুলিশের তেজগাঁও বিভাগে সবচেয়ে বেশি ৩৯২টি চুরির মামলা হয়েছে। ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে ৭১টি। ডাকাতি-দস্যুতার মামলা হয়েছে ৭৭টি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৮০টি চুরির মামলা হয়েছে রমনা বিভাগে। সেখানে ডাকাতি ও দস্যুতার ৩২টি এবং ছিনতাইয়ের ১৪টি মামলা হয়েছে। মিরপুর বিভাগে ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে ২৬টি, যা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এই এলাকায় ডাকাতি ও দস্যুতার ২৩টি, চুরির ১৯৪টি, খুনের ২১টি ও অপহরণের আটটি মামলা হয়েছে। 

এই তিন এলাকায় পুলিশ এবার ছুটিতে বিশেষ নজর রাখবে বলে জানিয়েছে।

পুলিশের পরামর্শ ও নিরাপত্তা

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার খ. মহিদ উদ্দিন বলেন, “ঈদের ছুটিতে বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা আছে। আর নগরবাসীকেও আমরা ১৪ ধরনের পরামর্শ দিয়েছি। আমরা বাড়তি টহল, চেকপোস্ট, নজরদারি ছুটির মধ্যে এগুলো বাড়াব। আর নগরবাসীকেও তাদের বাসাবাড়ি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে। আমরা ফাঁকা ঢাকায় মোটরসাইকেলসহ যানবাহনের গতিও নিয়ন্ত্রণে রাখব।”

- ডিএমপির পরামর্শের মধ্যে আছে-নগদ টাকা কিংবা স্বর্ণালংকার ব্যাংক কিংবা নিকটাত্মীয়দের কাছে নিরাপদে রাখা। 

- রাতে কিংবা দিনে একসঙ্গে মুখে মাস্ক এবং মাথায় ক্যাপ পরা অপরিচিত সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের গতিবিধি নজরদারি করতে হবে। 

- গ্যাস সিলিন্ডার অথবা গ্যাসের লাইন, পানির লাইন, সব ধরনের লাইট, ফ্যানের সুইচ, বৈদ্যুতিক প্লাগ বন্ধ করে রাখা। বাসা বাড়িতে অগ্নি দুর্ঘটনা রোধে ছুটি শেষে বাড়ি থেকে ফিরে দরজা জানালা খুলে ঘরে জমে থাকা গ্যাস বের করার পর গ্যাসের চুলা জ্বালানো কিংবা বৈদ্যুতিক সুইচ চালু করা। 

- চুরি প্রতিরোধে বাসা-বাড়িতে সিসি ক্যামেরা বসানোসহ আগের বসানো সিসি ক্যামেরা সচল রাখা। বাসার চারপাশে বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবস্থা রাখা। প্রয়োজনে ৯৯৯ কল করে জানানো। মোটরসাইকেল চুরি রোধে অ্যালার্ম লাগাতে হবে।

খ. মহিদ উদ্দিন বলেন, “সব পরামর্শ পুলিশের আওতায় পড়ে না। তবু সার্বিক নিরাপত্তার কথা ভেবে আমরা পরামর্শ দিয়েছি। আমরা এই বিষয়গুলো নিয়ে ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছি। কথা বলেছি বিভিন্ন হাউজিং সোসাইটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে। প্রত্যেক জোনের ডিসি এবং ওসিরা এই দায়িত্ব পালন করেছেন। আর স্বর্ণের দোকানের নিরাপত্তার জন্য বাজুসের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করেছি।”

“আমাদের পরামর্শ হলো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়িতে আইপি সিসি ক্যামেরা লাগানো। সেটা করলে আপনি বিদেশে গেলেও সেখান থেকে মনিটরিং করতে পারবেন। আর বাসায় যদি  কাউকে রেখে যান এবং নিরাপত্তা কর্মীদের সঠিক পরিচয় নিশ্চিত হবেন।”

তিনি বলেন,“ঢাকার প্রবেশপথ ছাড়াও নির্জন এলাকায় বাড়তি চেকপোস্ট থাকবে। আর টহল বাড়ানো হবে নির্জন ঢাকায় চুরি ও ছিনতাই রোধে।”

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির ধারণা, এবার ঈদে ঢাকা এবং ঢাকার আশপাশের এলাকা থেকে ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ ঢাকার বাইরে যাবেন। এর মধ্যে রাজধানী থেকেই ঢাকা ছাড়বেন এক কোটি মানুষ। তাদের হিসেব অনুযায়ী গত ঈদে রাজধানী এবং আশপাশ এলাকা থেকে ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ ঢাকা ছেড়েছেন।

About

Popular Links