Saturday, June 22, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

কুষ্টিয়ায় সাবমার্সিবল পাম্প বসানোর হিড়িক, ভয়াবহ বিপর্যয়ের শঙ্কা

কুষ্টিয়া জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল কার্যালয়ের তথ্য বলছে, জেলায় ২০২৪ সালে এ পর্যন্ত ৪০০টি গভীর এবং অগভীর সাবমার্সিবল পাম্প সরকারিভাবে দেওয়া হয়েছে

আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০২৪, ০৭:৪২ পিএম

কুষ্টিয়ায় তীব্র তাপপ্রবাহ কমছেই না। গরমে অতিষ্ঠ জনজীবন। টানা খরায় নেমে গেছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। এ অবস্থায় স্থানীয়রা সাবমার্সিবল পাম্প বসিয়ে পানি তুলছেন। বিষয়টি বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে সতর্ক করে দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

রবিবার (২১ এপ্রিল) বিকেল ৩টার দিকে কুষ্টিয়া জেলার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৪০.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যা শনিবারের চেয়ে কিছুটা কম। এদিকে তীব্র তাপপ্রবাহে জনজীবনে ত্রাহি অবস্থা। হাসপাতালে বাড়ছে গরমে অসুস্থ রোগীর সংখ্যা।

তীব্র খরায় স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় বেশিরভাগ টিউবওয়েলে মিলছে না পানি। বিকল্প হিসেবে অতিরিক্ত খরচে সাবমার্সিবল পাম্প বসাচ্ছেন অনেকেই। অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে বসানো হচ্ছে এসব পাম্প।

এই পাম্প বসানোর হিড়িক পরিবেশের জন্য অশনি সংকেত বলে জানান পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. রেজওয়ানুল ইসলাম বলেন, “স্তর নেমে যাওয়ায় টিউবওয়েলে পানি উঠছে না। তবে শঙ্কার কথা আমরা সাবমার্সিবল পাম্পের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারের প্রতিযোগিতায় নেমেছি। এটি পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।”

তার পরামর্শ, “ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে নদী কিংবা খাল বিলের পানির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যতে চরম বিপাকে পড়তে হবে। পরিবেশ বিপর্যয়ের জন্য আমাদেরই দায়ী থাকতে হবে।”

শত শত সাবমার্সিবল

কুষ্টিয়া জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল কার্যালয়ের তথ্য বলছে, জেলায় ২০২৪ সালে এ পর্যন্ত ৪০০টি গভীর এবং অগভীর সাবমার্সিবল পাম্প সরকারিভাবে দেওয়া হয়েছে।

এ মাসের হিসেব অনুযায়ী কুষ্টিয়া সদরে ১৭টি অগভীর ও একটি গভীর নলকূপ নষ্ট হয়েছে। কুমারখালীতে ৩৪টি, খোকসায় ২৮টি, মিরপুরে ১১টি এবং ভেড়ামারায় ৪০টি অগভীর ও একটি গভীর নলকূপ নষ্ট হয়েছে। এছাড়া দৌলতপুরে ১২৫টি অগভীর নলকূপ নষ্ট হয়ে গেছে।

তবে বেসরকারি পর্যায়ে কী পরিমাণ নলকূপ নষ্ট হয়ে গেছে এর তথ্য নেই জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিসে।

কুষ্টিয়ার মিরপুর গ্রামের ব্যবসায়ী মহির উদ্দিন বলেন, “প্রায় তিন দিন টিউবওয়েলে পানি ওঠেনি। তাই প্রায় ২৭ হাজার টাকা ব্যয়ে সাবমারবসিবল পাম্প বসিয়েছি।”

একই এলাকার আব্দুর রহমান বলেন, “গত দুই মাস ধরে টিউবওয়েলে পানি ওঠা একেবারেই কমে গেছে। এতে খাওয়া-গোসলসহ দৈনন্দিন কাজে অনেক ঝামেলার মধ্যে পড়তে হচ্ছে।”

দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত

কুমারখালী পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আসাদুজ্জামান খোকন বলেন, “সংকট এতটাই প্রকট যে খাবার পানির ব্যবস্থা করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। গোসল এবং গবাদিপশুর জন্য পানি সংগ্রহ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।”

৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সুকুমার সাহা বলেন, “পানির জন্য নদীর চরে অনেকটা পথ হেঁটে যেতে হচ্ছে। এমন সংকটে আগে কখনো দেখিনি।”

যদুবয়রা গ্রামের গৃহিনী মারুফা বেগম বলেন, “কল থাকলেও তাতে পানি নেই। অধিকাংশ বাড়িতেই পানির সংকট চলছে। যার কলে পানি উঠছে, সেখানে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে আনতে হচ্ছে।”

নদীতেও পানি নেই, স্তর নেমে গেছে নিচে

কুমারখালী উপজেলা জনস্বাস্থ্যের নির্বাহী প্রকৌশলী মনে করেন, “যত্রতত্র সাবমার্সিবল পাম্প স্থাপন ও ব্যবহার বেড়ে যাওয়ার কারণেই পানির এমন সমস্যা দেখা দিয়েছে।”

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর কুষ্টিয়া অফিসের প্রাক্কলনিক কর্মকর্তা মো. আসিফ হোসেন বলেন, “নদীতে পানি নেই। গড়াই নদী শুকিয়ে গেছে, পদ্মায় মূল স্রোত থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে পানি আছে। তাও খুবই সীমিত। পদ্মা এ অঞ্চলের পানির লেয়ার ধরে রাখতে সহায়তা করে গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্প। কিন্তু এই প্রকল্পের তিনটি মেশিন নষ্ট থাকায় বড় একটা লেয়ার ফল করেছে। আগে যেখানে ১৫ থেকে ১৮ মিটারের মধ্যে পানি পাওয়া যেত এখন সেটি ২৮ থেকে ৩৬ পর্যন্ত চলে গেছে।”

তিনি আরও বলেন, “পানি সংকটের আরও একটি বড় কারণ অত্যাধিক পরিমাণে সাবমার্সিবল পাম্পের ব্যবহার বেড়ে গেছে। সাবমার্সিবল ব্যবহারের কারণে আশেপাশের যেগুলো হাত নলকূপ ছিল সেগুলোতে পানি কমে গেছে। আগে যেখানে একটি গ্রামে চার থেকে পাঁচটি সাবমার্সিবল থাকত, এখন সেখানে অনেক বাড়িতেই ব্যবহৃত হচ্ছে।”

কুষ্টিয়ার কুমারখালী আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের তথ্য অনুযায়ী, রবিবার জেলায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৪০.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যা শনিবার ছিল ৪১.২ ডিগ্রি, শুক্রবার ৪০.২ ডিগ্রি এবং বৃহস্পতিবার ছিল ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

কুমারখালী আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ মামুন আর রশিদ বলেন, “উষ্ণতম বছর হওয়ায় সামনে তাপমাত্রা আরও বাড়তে পারে।”

About

Popular Links