Monday, June 17, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

রূপালী ব্যাংকে যৌন হয়রানি: অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে বহাল রেখেই তদন্ত

  • অভিযোগের কথা শুনে ভুক্তভোগীকে শাসান অভিযুক্ত
  • তদন্ত শেষ হওয়ার আগে মন্তব্য করতে নারাজ কর্তৃপক্ষ
আপডেট : ৩০ মে ২০২৪, ০৫:৩৪ পিএম

রূপালী ব্যাংকের ঢাকা দক্ষিণ বিভাগীয় কার্যালয়ের আইসিটি সিস্টেমস বিভাগের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ কাউসার মোস্তাফিজের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেছেন তারই এক নারী সহকর্মী। এ ঘটনায় দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। নিয়মানুযায়ী এ ধরনের অভিযোগে অভিযুক্তকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে ডিজিএম কাউসারকে স্বপদে বহাল রেখেই তদন্ত কমিটি গঠন করেছে কর্তৃপক্ষ। ফলে তদন্ত প্রভাবমুক্ত হবে কি-না তা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।

লিখিত অভিযোগ থেকে জানা যায়, ওই নারী কর্মকর্তা কর্মস্থলে যোগদানের পর থেকেই মোস্তাফিজ তাকে আপত্তিকর প্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন। সায় না দেওয়ায় গালিগালাজ, শারীরিক গঠন নিয়ে মন্তব্য ও কুরুচিপূর্ণ কথা শোনানোর পাশাপাশি বিভিন্নভাবে হয়রানি করতেন তাকে।

এমন পরিস্থিতিতে ওই নারী কর্মকর্তা কয়েকজন সহকর্মীর পরামর্শে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বিষয়টি টের পেয়ে ডিজিএম কাউসার তাকে একা কক্ষে ডেকে নিয়ে ভয় দেখান। বলেন, অভিযোগ করলে সম্মানহানি হবে। এরই জেরে এ বছরের গত ২৫ মার্চ তিনি ওই নারী কর্মকর্তাকে প্রকাশ্যে গালিগালাজ করেন ও হুমকি দেন।

রূপালী ব্যাংকের এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নানান অপকর্ম ঢাকতে নিজের কক্ষের সিসিটিভি অপসারণেরও অভিযোগ রয়েছে।

ভুক্তভোগী দেখা পাননি ব্যবস্থাপনা পরিচালকের

গত ১ এপ্রিল ওই নারী কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়। বদলির আগে বিষয়টি একই বিভাগের এজিএম মোল্লা গোলাম ফারুককে অবহিত করেন ভুক্তভোগী। এজিএম বিষয়টির সমাধান না করে উল্টো ভয়ভীতি দেখিয়ে তা ধামাচাপা দেওয়ার উপদেশ দেন।

৩০ এপ্রিল লিখিত অভিযোগ করেন তিনি। অভিযোগে ভুক্তভোগী উল্লেখ করেন, বিষয়টি জানাতে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে একাধিকবার দেখা করতে চেয়েও পারেননি তিনি। এদিকে, এ কথা শুনে ডিজিএম মোস্তাফিজ আরও ক্ষেপে যান। বাড়িয়ে হুমকি, শুরু করেন নানামাত্রিক অপপ্রচার।

অভিযুক্ত ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ কাউসার মোস্তাফিজ/ঢাকা ট্রিবিউন

ভুক্তভোগী নারী ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘একা কক্ষে ডেকে নিয়ে সিগারেটের মুখভর্তি ধোঁয়া আমার দিকে ছুঁড়তেন মোস্তাফিজ। এছাড়া নানা নোংরা ইশারা করতেন। আমি ঊর্ধ্বতন কর্মকতাকেও জানিয়েছি। কোনো প্রতিকার পাইনি। তাই অভিযোগ করেছি। আমি প্রতিষ্ঠানের আইন অনুযায়ী বিচার চাই।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘মোস্তাফিজের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। যাতে আর কেউ কখনও এমন কাজ না করতে পারে।’’

প্রভাবমুক্ত তদন্ত নিয়ে সন্দেহ

অভিযোগের ঘটনায় গঠিত দুই সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রধান ঢাকা দক্ষিণ বিভাগীয় কার্যালয়ের মহাব্যবস্থাপক মো. ইসমাইল হোসেন শেখ এবং সদস্য প্রধান কার্যালয়ের স্থাবর সম্পত্তি বিভাগের সহকারী মহাব্যবস্থাপক নাজনীন সুলতানা। দশ কর্মদিবসের মধ্যে কমিটিকে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে হবে। 

এদিকে, গুরুতর অভিযোগ তদন্তাধীন হলেও নিয়মিত অফিস করছেন অভিযুক্ত মোহাম্মদ কাউসার মোস্তাফিজ। ফলে তদন্ত প্রভাবমুক্ত হবে কি-না তা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। সূত্র বলছে, তদন্ত কমিটির কাছে নিজের পক্ষে বক্তব্য দিতে অধস্তন কর্মকর্তাদের শাসাচ্ছেন অভিযুক্ত কর্মকর্তা। 

ভুক্তভোগী নারী কর্মকর্তা বলেন, ‘‘অভিযোগ করার কথা শুনে তিনি আমাকেই নানাভাবে শাসিয়েছেন। তদন্তে তার অধস্তন কর্মকর্তাদেরই বক্তব্য নেওয়া হবে। তাদেরও তিনি শাসাতে ও হুমকিধামকি দিতে পারেন। এতে তদন্ত প্রভাবিত হতে পারে। তাই তাকে পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে তদন্ত করলে সেটি প্রভাবমুক্ত হতো।’’

ভুক্তভোগীর অভিযোগ, বিষয়টি একই বিভাগের এজিএম মোল্লা গোলাম ফারুককে অবহিত করেন তিনি। কিন্তু এজিএম বিষয়টির সমাধান না করে উল্টো ভয়ভীতি দেখিয়ে তা ধামাচাপা দেওয়ার উপদেশ দেন।

সহকর্মীকে যৌন হয়রানির বিষয়ে জানতে চাইলে ডিজিএম মোস্তাফিজ বলেন, ‘‘আমার বলার কিছু নাই। আমি নির্দোষ। অবশ্যই সত্য প্রকাশিত হবে। আমার মানইজ্জত কিছু রাখেনি। এখান থেকে বদলি হওয়ার পর কেন এ অভিযোগ করেছেন, তা উনিই জানেন। আমার ২৫ বছরের ক্যারিয়ার। প্রত্যেকটা কলিগ আমার সন্তানের মতো। সত্য প্রকাশিত হবে। আল্লাহ প্রমাণ করবে।’’

দায়িত্বে বহাল রয়েছেন কি-না প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘‘আমি রূপালী ব্যাংকে কাজ করছি। নিয়মিত অফিস করছি।’’

এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি প্রধান মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘‘চিঠিটি যখন ইস্যু হয় তখন আমি অসুস্থ হয়ে আট দিন হাসপাতালে ছিলাম। হাতে পেয়েছি। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়ে কাজ শুরু করব।’’

কর্তৃপক্ষের ভাষ্য

রূপালী ব্যাংকের সহকারী মহাব্যবস্থাপক হাসান তানভীর বলেন, ‘‘চেয়ারম্যান ও এমডি বরাবর একটি অভিযোগ করেছেন তিনি। একজন জিএম ও একজন এজিএমকে দিয়ে দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। এটি তদন্ত পর্যায়ে আছে। তদন্তে কী পাওয়া যায় তারপর বিষয়টি বলা যাবে।’’

অভিযুক্তকে স্বপদে বহাল রেখে তদন্তের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘‘তদন্তে প্রমাণ হতে হবে তিনি দোষী নাকি নির্দোষ। তদন্ত কর্মকর্তারা কেউই ওই বিভাগের নন। তারা আরও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। সার্ভিস রুল অনুযায়ীই তদন্ত হচ্ছে। শেষ হলে সত্য মিথ্যা বলা যাবে।’’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ‘‘কিছু কিছু পুরুষ কর্মস্থলে নারীর প্রতি এমন অশ্লীল ইঙ্গিত দিয়ে থাকে। কুরুচিপূর্ণ আচরণ করে। এই মানসিকতার লোকজন আছে। নারী বাইরে যেমন অবমাননা ও নির্যাতনের শিকার হয়। তেমনি কর্মস্থলেও হচ্ছে। আমরা এসবের বিরুদ্ধে অফিসগুলোতে যথাযথ আইন কমিটি করার কথা বলেছি। হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছি। রূপালী ব্যাংকের যে ঘটনা সেই বিষয়েও আমরা একইভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই।’’

About

Popular Links