• বুধবার, নভেম্বর ১৪, ২০১৮
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:১৫ রাত

রেড বার্ডস: মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আগ্রাসনের এক জ্বলন্ত চিত্র

  • প্রকাশিত ০৮:৫৬ রাত নভেম্বর ৭, ২০১৮
dhaka lit fest logo

দার্শনিক অনুসন্ধান ও অনবদ্য সাহিত্যিক দক্ষতার সঙ্গে বইটি দিতে পেরেছে অসাধারণ বিদ্রুপও

মোহাম্মাদ হানিফের তৃতীয় উপন্যাস, “রেড বার্ডস” এর পটভূমি হল চারিদিকে বিশাল মরুভূমি ঘেরা এক শরনার্থী শিবির। জায়গা ও মরুভূমির কোনো নাম উপন্যাসে উল্লেখ করা হয় নি। তবে পাঠকের বুঝতে কষ্ট হয় না যে এটি মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম অধ্যুষিত একটি যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশ। হয়তো বালির এই সমুদ্রটি আফগানিস্তান বা ইরাক। তবে একটি বিষয় পুরোপুরি নিশ্চিত যে জায়গাটি মার্কিন বিমানের বোমার আঘাতে বিধ্বস্ত, চারিদিক বাড়িঘরের ভাঙা টুকরোয় লণ্ডভণ্ড; আর শিশু থেকে বৃদ্ধ- কেউই মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না।

খালেদ হুসাইনির “এ থাউজ্যান্ড স্প্লেনডিড সান্স” এর পটভূমি ছিল আফগানিস্তানে, বিশেষত কাবুলে। হানিফের উপন্যাসটি পড়ে এরকম নিশ্চিত হওয়ার উপায় নেই, তবে এটা ছাড়াও আরো গভীর পার্থক্য রয়েছে।

হুসাইনির গল্পতে বিভিন্নরূপেই প্রমাণিত হয় যে এটা আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের এক অফিসিয়াল বর্ণনা। গীতিময় অলঙ্কারে এক গদ্য তিনি গেঁথেছেন যেখানে দেখা যায় মরিয়ম ও লায়লা চরিত্র দু’টি তাদের নির্যাতনকারী স্বামীর হাত থেকে পালানোর পরিকল্পনা করে যা তালেবানদের উত্থানের কারণে বাঁধাগ্রস্ত হয়। “দ্য কাইট রানার” উপন্যাসের সঙ্গে পরিচিত পাঠকরা সহজেই এর পরের ঘটনাবলি আঁচ করতে পারবেন: নারীদের প্রহার করা, নির্যাতন করা এবং অবস্থা সবচেয়ে করুণ হয় যখন তালেবানদের দ্বারা ওই নারীদেরকে জনসম্মুখে হত্যা করা হয়। হ্যাঁ, তারা অবশেষে মার্কিন সামরিক বাহিনী দ্বারা নিরাপত্তা পেয়েছে এবং আফগানরাও তাদের শহরে ফিরে এসেছে যেখানে এখন শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এক্ষেত্রে রিচার্ড অ্যাটেনবরো’র সিনেমা ‘গান্ধী’ (১৯৮২) সম্পর্কে সালমান রুশদীর তীব্র সমালোচনার প্রসঙ্গ এনে বলা যায়, এটা সত্য আর রাজনৈতিক গভীরতার ফাঁদে পড়া ভুলের মাশুল। 

অন্য দিকে, হানিফ আমাদেরকে এমন এক গল্প উপহার দেন যা মার্কিন আগ্রাসনের কাহিনীকে সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিকোন থেকে দেখে। শৈলীর আমেজ বাদ দিয়ে তিনি দিয়েছেন এক তীব্র বর্ণনা, যা পুড়িয়ে দেয়, যা দহন করে; ঠিক যেন মরুভূমির খরতাপ আর মার্কিন ফাইটার জেটের বোমার ভয়ঙ্কর আগুনের মতো। তবে প্রজ্ঞা, আয়রনি, অ্যাবাসার্ডিটির অসাধারণ মিশেল তিনি ঘটিয়েছেন যা দার্শনিক প্রশ্ন উদ্রেক করে, মার্কিন অর্থ দেওয়া যুদ্ধ ও এই সম্পর্কিত যুদ্ধ-অর্থনীতিকে অনবদ্যভাবে বিদ্রুপ করে। 

মূল উত্তেজনা তৈরি হয় যখন মোমোর বড় ভাই আলি উধাও হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের সৈনিকদের সঙ্গে আলি কাজ করতো, কয়েকমাস পরে  রহস্যজনকভাবে তার বয়সী অনেকের মতো সেও উধাও হয়ে যায়।

না খেতে পেয়ে এল্লি যখন প্রায় মৃত অবস্থায় তখন তাকে পাওয়া যায়। যে ক্যাম্পে এল্লির বোমা মারার কথা ছিল সেখান থেকে মোমো তাকে ড্রাইভ করে নিয়ে আসে। গল্পে ইউএসএইড এর একজন পরামর্শকও থাকে যাকে “মঙ্গলকারী” হিসেবে উল্লেখ করা হয়। যুদ্ধ-পরবর্তী অথবা যুদ্ধের সময়কার মুসলিম কিশোর-কিশোরীদের মানসিক অবস্থা নিয়ে তিনি একটি বই লিখছেন। এই ধরণের বিচিত্র আয়রনি ছাড়াও, উপন্যাস জুড়ে রয়েছে চিন্তা, আবেগ, অনুসন্ধান ও পর্যবেক্ষণ যা পড়ে আমি বারবার শব্দ করে হেসে উঠছিলাম যেমনটা হাসি পেয়েছিল হানিফ কুরেইশির “দ্য বুদ্ধ অফ সাবার্বিয়া” অথবা ফিলিপ রথের “পোর্টনইয়’স কমপ্লেইন্ট” পড়ার সময়। একই সাথে, মার্কিন মদদপুষ্ট যুদ্ধে একজন আরব অথবা আফগান মা অথবা ভাইয়ের হারানোর বেদনা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থার হাস্যকর কাজকর্ম এবং মার্কিন সৈনিক ও সাহায্য সংস্থার কর্মীদের মানবিক দিকগুলোও সম্পর্কেও আমাকে গভীরভাবে ভাবতে শেখায়।

দার্শনিক অনুসন্ধান ও অনবদ্য সাহিত্যিক দক্ষতার সঙ্গে বইটি দিতে পেরেছে অসাধারণ বিদ্রুপও।