• শুক্রবার, ডিসেম্বর ১৩, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৯:১৯ রাত

অনুবাদকের ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ এবং অনুবাদের চ্যালেঞ্জসমূহ

  • প্রকাশিত ০১:২২ দুপুর নভেম্বর ১০, ২০১৮
ছবি : মাহমুদ হোসাইন অপু
ছবি : মাহমুদ হোসাইন অপু

বর্তমান বাংলাদেশের চারজন স্বনামধন্য অনুবাদ রচয়িতা- আলম খোরশেদ, আলিম আজিজ, মোজাফফর হোসেন এবং প্যানেল মডারেটর রফিক-উম-মুনির চৌধুরী অনুবাদ শিল্পের খুঁটিনাটি নিয়ে আলোচনা করেন।

অনুবাদ করার সময় কি অনুবাদক মূল লেখার আক্ষরিক অনুবাদ করবেন? নাকি তার অনুবাদে নতুনত্ব দেওয়ার স্বাধীনতা থাকা উচিৎ? অনুবাদক মূল লেখার প্রতি আনুগত্য দেখাবেন কিনা এই বিতর্ক বহু পুরনো। এসব বিষয়ই উঠে এসেছিল “অনুবাদ : মূলানুগ নাকি রূপান্তর” শীর্ষক ঢাকা লিট ফেস্ট-২০১৮ এর প্রথম দিনের প্যানেল আলোচনায়।  বর্তমান বাংলাদেশের চারজন স্বনামধন্য অনুবাদ রচয়িতা- আলম খোরশেদ, আলিম আজিজ, মোজাফফর হোসেন এবং প্যানেল মডারেটর রফিক-উম-মুনির চৌধুরী অনুবাদ শিল্পের খুঁটিনাটি নিয়ে আলোচনা করেন। 

রফিক-উম-মুনির চৌধুরী অনুবাদকের শৈল্পিকতা ও নৈপুণ্য বোঝাতে গিয়ে তার একটি গল্পের ব্রাজিলিয়ান এক কিশোরের উদাহরণ টেনে আনেন। তিনি মনে করেন একজন অনুবাদকের কাজটি শেষ হলে তার চিত্র কেমন দাঁড়াবে সেদিকে নজর না দিয়ে বরং অনুবাদটি যেন ভালো মানের হয় সেদিকে নজর দেওয়া উচিৎ। অনুবাদটি কীভাবে করা যায় সেদিকে মনোযোগ না দিয়ে বরং অনুবাদ কিভাবে হচ্ছে সেই প্রক্রিয়ার দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিৎ যেন অনুবাদের বর্ণনার ভাষা যথোপযুক্ত হয়।  

প্যানেলের সবাই একমত হন যে লাইন ধরে ধরে অনুবাদ করা সেকেলে এবং অপ্রচলিত। আলম খোরশেদ ব্যাখ্যা করেন যে একজন অনুবাদকের কাজ মূল লেখার অর্থ অবিকৃত রেখে অনুবাদ করা হলেও তার নিজের সৃজনশীলতা প্রদর্শনের কিছু ক্ষেত্র থেকে যায়। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন কবিতা অনুবাদ করতে গেলে অনুবাদককে অবশ্যই কবি হতে হবে; এতে করে একরকম ভারসাম্য রক্ষা পায়। অপরদিকে, মোজাফফর হোসেন ভিন্ন মত পোষণ করে ল্যাতিন আমেরিকান বিখ্যাত লেখক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ এবং গেররি রাবাসার মধ্যকার সম্পর্ককে উদাহরণ হিসেবে টেনে আনেন। 

এক্ষেত্রে অনুবাদক নিজে লেখক না হলেও লেখক নিজেই কিন্তু প্রায়ই রাবাসার প্রশংসা করতেন। অনুবাদ লেখায় ফুটনোট সংযুক্ত করা উচিৎ কিনা এ প্রশ্নে প্যানেলিস্টগণ একমত হতে পারেননি। কেউ কেউ মনে করেন ফুটনোট থাকা জরুরি এবং বাকিরা এর প্রয়োজনীয়তা দেখেন না। যাহোক, প্যানেলিস্টগণ মনে করেন উত্তর ঔপেনিবেশিকতার এই যুগে ‘বিড়ি’ বা ‘সিঁদুর’ এর মতো মূল শব্দ ফুটনোটসব বা বাদ দিয়ে যেভাবেই হোক অনুবাদ করা বাঞ্চনীয় নয়। 

অন্যদিকে, আলিম আজিজ অনুবাদকে ‘নোংরা কাজ’ বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, “অনুবাদকের কাজ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মূল লেখার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার পর্যায়ে চলে যায়। অনুবাদের মূল সমস্যা হলো অনুবাদ করতে যেয়ে প্রায়ই লেখার অন্তঃসার হারিয়ে যায়।” 

তবে, তিনি দর্শকদের বলেন যে তিনি নিজে অনুবাদক হয়েছেন এই তাড়না থেকে যে যারা মূল ভাষায় দক্ষ না তারাও তার অনুবাদের মাধ্যমে উপকৃত হবেন। অনুবাদের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে যেয়ে আলম খোরশেদ একটি বাক্যাংশের উদাহরণ দেন। যেমনঃ ‘he kicked the bucket’ ভাষান্তর করতে গেলে এর মূল অর্থ হারিয়ে যাবে। 

প্যানেল সদস্যগণ একমত হন যে অনুবাদকের উচিৎ লাইন ধরে ধরে পড়া যেন মূল লেখার নির্যাস থেকে যায়। মোজাফফর হোসেন এর উদাহরণ হিসেবে বলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম যদি রাশিয়াতে পাঠানো হয় তাহলে আম হলো সেই নির্যাস আর এই আম এমন প্যাকেজে করে পাঠাতে হবে যেন দীর্ঘ ফ্লাইটের ধকল সহ্য করেও আম নষ্ট না হয়ে যায়। এজন্যে, যে ভাষায় অনুবাদ করা হচ্ছে সেই ভাষায়র উপযোগী করার ব্যাপারে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।