• শুক্রবার, ডিসেম্বর ০৬, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৭:৫৬ রাত

‘জীবন মানে যেন অনেক গল্পের সমষ্টি’

  • প্রকাশিত ০২:০৩ দুপুর নভেম্বর ১০, ২০১৮
ছবি : সৈয়দ জাকির হোসাইন
ছবি : সৈয়দ জাকির হোসাইন

উপন্যাস লেখার একটি বড় দিক হলো আপনার লেখাকে অবশ্যই বাস্তব হতে হবে। আপনি হয়তো নন-ফিকশন লিখলেন, কিন্তু উপন্যাসকে অবশ্যই বাস্তবধর্মী হতে হবে। আমাদের মনে এই ফিকশন লেখার ক্ষমতা বিরাজ করে। আমরা কল্পনা নিয়েই বেঁচে থাকি।

অ্যাডাম জনসন তার দ্যা অরফ্যান মাস্টার্স সান উপন্যাসের জন্যে ২০১২ সালে পুলিতজার পুরস্কার পান। এই সাক্ষাতকারে তিনি তার লেখা, লেখার আগের গবেষণা এবং বাস্তবতার সাথে তাঁর গল্পের মিল-অমিল নিয়ে আলাপ করেছেন। 

এ বছরের লিট ফেস্টে আসতে পেরে কেমন লাগছে? এই প্রথম বাংলাদেশে এলেন?

হ্যাঁ, এবারই প্রথম এলাম। ঢাকা একটি চমৎকার শহর, লিটারেরি ফেস্টিভালও অসাধারণ লাগছে। আমি মনে করি এই উৎসবের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করার পাশাপাশি স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করা ও সত্য বলতে পারার উপরও গুরুত্ব আরোপ করা গিয়েছে। এই উদ্যোগের অংশ হতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত।  

এবার আপনার উপন্যাস দ্যা অর্ফান মাস্টার্স সান  নিয়ে কথা বলা যাক। এই বইয়ের পটভূমি উত্তর কোরিয়া। আপনি এই বইতে বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র উত্তর কোরিয়ার ভয়াবহ জীবন ব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরেছেন। এই বই লেখার প্রেরণা কোথা থেকে পেলেন?

আমি বলবো একজন পাঠক হিসেবে এর শুরু। উত্তর কোরিয়া নিয়ে আমার অনেক আগে থেকেই আগ্রহ ছিল। উত্তর কোরিয়া হলো এমন এক দেশ যেখানে কেউ কিচ্ছু বলতে পারেনা এবং সবাইকে দমনপীড়নের ভয়ে দিন কাটাতে হয়। বিশ্বের অন্য কোথাও যদিও এর চেয়ে ভয়াবহ কোনো জায়গা থেকেও থাকে, উত্তর কোরিয়া আরও বেশি ভয়ংকর কারণ এখানে মানুষ হিসেবে ব্যক্তি পরিচয় নিয়ে বেঁচে থাকার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু, একজন পাঠক হিসেবে আমি আবিষ্কার করি যে উত্তর কোরিয়া সম্পর্কে জানার কোনো সুযোগ নেই কারণ উত্তর কোরিয়ানদের জন্যে লেখালেখি করা নিষিদ্ধ। তবে, যারা উত্তর কোরিয়া থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়, কেবল তাদের কাছ থেকে এই দেশ সম্পর্কে জানা সম্ভব। আমি তাই এমন একটি উপায় খুঁজতে শুরু করি যেন আমি আমার কণ্ঠস্বর গোটা বিশ্বকে শোনাতে পারি।   

আপনি একবার উত্তর কোরিয়ায় গিয়ে পাঁচ দিন ছিলেন। এরকম একটি রাষ্ট্রে কীভাবে গেলেন?

উত্তর কোরিয়া এমন একটি রাষ্ট্র যা মূলত অর্থের প্রয়োজনীয়তার ওপর নির্ভর করে পরিচালিত হয়। এবং তাদের অর্থের মূল উৎস হলো ট্যুরিজম। তারা সাধারণত লেখকদের ভিসা দেয় না। তারা ইন্টারনেটে খুঁজলেই দেখতে পেত যে আমি একজন লেখক। আমি মনে করি ট্যুরিস্টদের সামনে উত্তর কোরিয়াকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যে শাসকদের নেতিবাচক কিছু ট্যুরিস্টদের নজরেই আসে না। কিন্তু, বাস্তবতা একদম ভিন্ন।

আপনি উত্তর কোরিয়ার উপর প্রচুর গবেষণা করেছেন। আপনার বইতে উত্তর কোরিয়ার ফোক গান “আরিরাং” থেকে শুরু করে স্থানীয় মদের প্রকারভেদেরও উল্লেখ আছে। এই বই লিখতে কতদিন লেগেছে এবং আপনি কীভাবে এই গবেষণা করলেন? 

আমি সাংবাদিক হিসেবে লিখতে শুরু করি। সাংবাদিকরা বিষয়ে আমার একটি ডিগ্রি আছে এবং আমি সাক্ষাৎকার নিয়ে, গবেষণা করতে এবং সঠিকভাবে ঘটনাকে তুলে ধরতে পছন্দ করি। আমি নিজে যেহেতু কোরিয়ার নই, তাই নিজের না এমন সংস্কৃতি নিয়ে লিখতে গেলে অবশ্যম্ভাবীভাবেই কিছু বাড়তি দায় চলে আসে। এদেশের মানুষ দুর্ভিক্ষ ও দমনপীড়নের মুখোমুখি হয়েছে এবং তাদের দিয়ে জোরপূর্বক কাজ করানো হয়। কিন্তু, আমার কাছে এরকম সামগ্রিক কোনো চিত্র ছিল না। তাই আমি গবেষণায় প্রচুর সময় ব্যয় করেছি। এরকম মানুষজনের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার ফলে আমার মধ্যে অনেক পরিবর্তন এসেছে যার প্রতিফল পাওয়া যাবে আমার বইতেও। গবেষণার কাজে আমি  সর্বপ্রথম যে কোরিয়ানের সাথে সাক্ষাত করি, সে ছিল একজন এতিম। সে আমাকে তার কষ্টের ইতিহাস শুনিয়েছিল। তার বর্ণনা শুনে আমার কাছে মনে হয়েছে তার এই অভিজ্ঞতাকে আমি এমনভাবে তুলে ধরবো যেন তা সবাই শুনতে পায়। 

ইন্টারনেটেও তো উত্তর কোরিয়ার এরকম অনেকের সাক্ষাৎকার পাওয়া যায়, তাইনা? 

হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন। এরকম আরও অনেক ঘটনা সম্পর্কে আমি জেনেছি। ক্রিশ্চান মিশনারি, এনজিও কর্মী, সাহায্যকর্মীসহ আরও অনেকে এরকম পীড়াদায়ক অনেক ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তবে, কোনো উত্তর কোরিয়ানকে দিয়ে তার ঘটনা বলাতে এবং আমাকে বিশ্বাস করাতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। উত্তর কোরিয়ার যাদের সঙ্গে আমি কথা বলেছি তার অধিকাংশই হয়েছে আমার বই বের হওয়ার পরে। 

আপনার উপন্যাসে এরকম একটি বাক্য আছে- “মানুষের মনে যে অন্ধকার বিরাজমান তা কল্পনার গল্প দিয়ে পূর্ণ হয়ে ওঠে, চারিদিকে যত অন্ধকারই থাকুক না কেন, এই কল্পনায় তা কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনা।” আপনি গল্পের এই বাস্তবতা এবং আমাদের চারপাশের বাস্তবতার মধ্যে কতটুকু মিল খুঁজে পান?

উপন্যাস লেখার একটি বড় দিক হলো আপনার লেখাকে অবশ্যই বাস্তব হতে হবে। আপনি হয়তো নন-ফিকশন লিখলেন, কিন্তু উপন্যাসকে অবশ্যই বাস্তবধর্মী হতে হবে। আমাদের মনে এই ফিকশন লেখার ক্ষমতা বিরাজ করে। আমরা কল্পনা নিয়েই বেঁচে থাকি। যেমন-কাল কী ঘটবে বা অমুক তারিখে কী ঘটবে ইত্যাদি কিন্তু আমরা অনবরত কল্পনা করতেই থাকি। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে বলবো এরকম নিষ্প্রভ বিষয়াবলী নিয়ে আমার বেশি আগ্রহ রয়েছে। কোনো একটি ঘটনা ঘটে গিয়েছে এমন হলে সেটা কল্পনা করা আমার জন্যে সহজতর। 

আপনি বাংলাদেশি কোনো লেখকের লেখা পড়েছেন?

পড়িনি, তবে এখানে এসে আমি কয়েকজন বাংলাদেশি লেখকের সাথে পরিচিতি হয়েছে। তাদের লেখা সম্পর্কে জেনেছি। তাদের সাথে আলাপচারিতা করতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত।