• শনিবার, ডিসেম্বর ১৪, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ০২:১১ দুপুর

হার না মানার গল্প লিখে গেলেন যারা...

  • প্রকাশিত ০৪:৫২ বিকেল নভেম্বর ১২, ২০১৮
ছবি: মাহমুদ হোসেন অপু
ছবি: মাহমুদ হোসেন অপু

সে সময় নারীদের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে নিরুৎসাহিত করা হতো 

সাংবাদিক-খবর পাঠিকা নবনীতা চৌধুরীর সঞ্চালনায় “হার স্টোরিজ: আই অ্যাম আ চেইঞ্জ” শীর্ষক এই সেশনে ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার খালেদা শাহরিয়ার কবির, অ্যাসিড আক্রমনের শিকার নমিতা হালদার, ড. সায়েবা আকতার এবং বাউল কাঙালিনী সুফিয়া। গল্পে-আলোচনায় জীবনের গল্প উঠে আসে।

সেশনের সূচনা হয় বুয়েট থেকে ১৯৬৮ সালে পাশ করাপ্রথম নারী সিভিল ইঞ্জিনিয়ার খালেদা শাহরিয়ার কবিরের গল্পের মধ্য দিয়ে। তিনি যেসময়ে ভর্তি হন, সে সময় নারীদের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে নিরুৎসাহিত করা হতো কেননা পড়াশুনার অংশ হিসেবেই তাদেরকে অনেকদিন বাড়ির বাইরে থাকতে হতো। এজন্যে তাদেরকে উল্টো আর্কিটেকচার বিভাগে পড়তে উৎসাহিত করা হতো।

“ভাগ্যের খেলায় আর্কিটেকচার বিভাগের ভর্তি পরীক্ষার দিন আমার খুব জ্বর হয়। তবে এর কিছুদিন আগে আমি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ১৩০০ শিক্ষার্থীর মধ্যে দ্বিতীয় হই। এতে বাধ্য হয়ে আমার ভর্তির ব্যাপারটি কর্তৃপক্ষ খুব গুরুত্বের সাথে নেয়”, বললেন খালেদা শাহরিয়ার।

পড়াশোনা শেষ করে খালেদা পানি উন্নয়ন বোর্ডে যোগ দেন। তিনিই ছিলেন তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের নিযুক্ত পূর্ব পাকিস্তানের সর্বপ্রথম নারী প্রকৌশলী। “বললে হয়তো বিশ্বাস করবেন না কিন্তু আমিই ছিলাম পুরো মতিঝিল এলাকায় কর্মজীবী একমাত্র নারী। অবশ্য এর বাইরে কিছু ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ান মেয়েও কাজ করতো, তবে তারা রিসিপশনিস্ট হিসেবে কাজ করতো“, তিনি বলেন।

পরের অনুপ্রেরণামূলক গল্প ছিল নমিতা হালদারের জীবনের গল্প। তিনি অ্যাসিড আক্রমনের শিকার হয়ে চোখ হারালেও তার মানসিক দৃঢ়তা ছিল অবিচল। দৃষ্টিশক্তি হারানোর পর তাকে নতুন করে জীবন শুরু করতে হয় – ব্রেইল সিস্টেমে পড়তে শেখা, পরবর্তীতে মাধ্যমিকসহ অন্য পরীক্ষাগুলোও দিয়েছেন একজন শ্রুতিলেখকের সাহায্যে। এরপর তিনি ব্যাপ্টিস্ট মিশন ইন্টেগ্রেটেড স্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। এই স্কুলই অবশ্য তাকে নতুন জীবন দিয়েছিল। “আমার ছাত্রছাত্রীদেরকে প্রতিষ্ঠিত হতে দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। আমি আমার ছাত্রছাত্রীদের বলি জীবনে যা-ই ঘটুক না কেন, কোনো কিছুই যেন জীবনের চলার পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়”, বলেন তিনি।

ড. সায়েবা আকতারের গল্প বাংলাদেশে সচরাচর শোনা যায়না। তিনি একজন গাইনোকলোজিস্ট। তার যুগান্তকারী উদ্ভাবন বাচ্চা প্রসবের সময়ে রক্তক্ষরণ হয়ে মায়ের মৃত্যু ঠেকাতে অনবদ্য ভূমিকা পালন করেছে। তার এই পদ্ধতি সাবেয়া মেথড নামে পরিচিত। তার এই পদ্ধতি গোটা বিশ্বেই ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করে।

 “আমি একদিন ওয়ার্ডে রোগিদের চেক-আপ করছিলাম, তখন এমন একজন মহিলার কথা শুনলাম যে একটি মৃত বাচ্চা প্রসব করে। এরপর থেকে তার রক্তক্ষরণ বন্ধই হচ্ছেনা। নিয়মিত পদ্ধতি হলো তার জরায়ু কেটে ফেলতে হবে এবং সে আর পরবর্তীতে মা হতে পারবেনা। কিন্তু আমি আবাসিক ডাক্তারকে বললাম আমাকে একটু সুযোগ দিলে আমি দেখতে পারি এর কিছু করা যায় কিনা। একটি কনডম এবং একটি ক্যাথেডার ব্যবহার করে আমি ১৫ মিনিটের মধ্যেই রক্তক্ষরণ বন্ধ করে ফেললাম। এতে করে তার জীবনও রক্ষা পেল আবার তার জরায়ুও ফেলে দিতে হলোনা”, তিনি বলেন।

প্যানেলে অন্য আরেকজন সুপারওম্যান উপস্থিত ছিলেন, তার নাম বাউল কাঙ্গালি সুফিয়া। তিনি কিভাবে সকল বাধা অতিক্রম করে জীবন যুদ্ধে জয়ী হয়ে অনেক পুরস্কার বিয়জের মধ্য দিয়ে আজকের এই অবস্থানে আসতে পেরেছেন- গল্পের মতো করে সে কথাই বলে গেলেন। একতারা হাতে “বুড়ি হইলাম তোর কারণে” গান দিয়ে শুরু করে ৮০ বছর বয়সের বাউল কাঙ্গালি সুফিয়া আজও সবাইকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখেন। তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “আমি যখনই এই একতারা ধরে রাখি, গানের টিউন তখন আমার ভেতর এমনেই চলে আসে। আমার কাছে একে এক স্বর্গীয় পাওয়া বলে মনে হয়”।