• শনিবার, ডিসেম্বর ১৪, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ০১:৪২ দুপুর

হেমন্ত, শেষ বিকেল এবং শীর্ষেন্দু... (পর্ব- ১)

  • প্রকাশিত ০৫:৩৮ সন্ধ্যা নভেম্বর ১২, ২০১৮
দুই বাংলার সবচেয়ে প্রিয় কথাসাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। ছবি: রাজীব ধর
দুই বাংলার সবচেয়ে প্রিয় কথাসাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। ছবি: রাজীব ধর

“আমি পাঠকদের জন্য নয়, নিজের জন্য লিখি"

বাংলা একাডেমির হেমন্তের এই শেষ বিকেলটা অন্য সব বিকেলের থেকে ভিন্ন। তিন দিনের এই সাহিত্য আসরের শেষ দিন বলেই কি? 

বাংলা একাডেমির আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ মিলনায়তনে আগতদের মাঝে কেমন এক উৎসাহ, অস্থিরতা, উদ্বিগ্নতা -  সব অনুভূতি মিলেমিশে একাকার!  তিল ধারণের ঠাই নেই;  সীমিত আসনকে তোয়াক্কা না করে মেঝেতেই বসে পড়লেন কেউ কেউ। উপস্থিত সব ক’টা মুখে তখন ‘আর কতক্ষণ’!  সব ক’টা চোখ আটকে আছে মিলনায়তনের মঞ্চে।

ছোটবেলায় ভয় দেখাতে ব্যর্থ হওয়া ভয়ংকর ভুতগুলোও হয়তো আজ এই মিলনায়তনে আশেপাশেই কোথাও আছে। বললে একদম বাড়াবাড়ি হবে না। ওরাও দেখতে এসেছে, কার লেখার যাদুতে তাদের ভয় দেখানোর প্রফেশনে ভাঁটা পড়েছিল।

কেউ একজন পেছন থেকে বলেই উঠলেন, ‘শীর্ষেন্দু কোথায়’!

ঢাকা লিট ফেস্টের শেষ বিকেলে এই অধির অপেক্ষা ছিল দুই বাংলার সবচেয়ে জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। এক বিকেল চোখ ভরে-প্রান ভরে প্রিয় লেখককে দেখতেই এতো সব আয়োজন- এতো সব অস্থিরতা।

অপেক্ষার প্রহরের অবসান ঘটিয়ে শীর্ষেন্দুকে মঞ্চে নিয়ে এলেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন। 

গেল ২রা নভেম্বর ছিল লেখকের জন্মদিন, পা দিলেন ৮৩-এ। তবে তাঁকে ৩৮ বললেও বা ভুল কি? 

আলাপচারিতার শুরুতেই ইমদাদুল হক মিলন বললেন, “আমাকে বলা হয়েছে, যতক্ষণ ইচ্ছা কথা বলা যাবে”। উপস্থিত ভক্তরা তাদের আনন্দ প্রকাশ করলেন সজোরে করতালির মাধ্যমে। হাস্যরস আর বাকবৈদগ্ধপূর্ণ, প্রাণবন্ত আর অনবদ্য তাদের আলাপচারিতা। 

লেখক মিলন শীর্ষেন্দুর কাছে জানতে চাইলেন, তার লেখার জগৎ নিয়ে। তিনি যেমন প্রাপ্তবয়স্কদের লেখক, তেমন তো শিশুদেরও। শুরুটা যদিও হয়েছিল প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য গল্প লিখে, শীর্ষেন্দু পরবর্তীতে শিশুদের জন্য তার কলম ধরেন ছোটদের জন্য লেখা তার প্রথম উপন্যাস “মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি” বইয়ের পাতায় ভর করে। 

প্রাপ্ত-অপ্রাপ্ত দুই বয়সেরই প্রিয় লেখক তিনি। উপন্যাস নাকি শিশু-সাহিত্য- কোনটা লিখে তিনি বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন?  শীর্ষেন্দু বললেন, “অ্যাডাল্টদের নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতাম। আর বাচ্চাদের জগৎটা আমার অচেনা”।

ভুতের গল্প লেখার প্রসঙ্গে তিনি বললেন, “ব্যক্তি হিসেবে আমি ভুতকে ভয় পাই। কিন্তু বাচ্চাদের জন্য সাবধানে লিখতে হয়, যেন তাদের মনে অনভিপ্রেত কোন দাগ না পরে”।

আর তাই শিশুদের ভুতের এই ভয় ভাঙ্গাতেই কিনা এই মহাযজ্ঞ! বাংলা সাহিত্যে কিন্তু শীর্ষেন্দুই প্রথম লেখক যিনি তার ভুতের গল্পগুলোতে ভুতকে ভয়ের কিছু হিসেবে উপস্থাপন করেন নি। বরং দেখিয়েছেন, ভুত ভয়ের নয়, মজারও হয়! ওই যে প্রথমেই বলেছিলাম, তাঁর লেখার জন্যই ভুতেদের ভয় দেখানোর প্রফেশনে ভাঁটা পড়েছিল রীতিমতো।

কথা হল তাঁর লেখার পদ্ধতি নিয়ে। খুব সাবলীল ভাবেই বললেন তিনি, “আমার লেখার পদ্ধতি শুনলে হাসবেন”, বলে নিজেই হেসে ফেললেন। এরপর বললেন, “ভাবতে থাকি। একটা লাইন- এই একটা লাইন খুঁজি। এই একটা লাইন যদি পেয়ে যাই, ওখান থেকেই লেখা। এই লাইন অনেকটা তকলিতে সুতো কাটার মতো। একবার পেলে ওখান থেকে যেভাবে সুতো কাটা হয়, সেরকম লেখাও। বিজ্ঞানসম্মতভাবে লিখতে আমি পারি না। আমার লেখার পদ্ধতি তাই বিজ্ঞানসম্মত না”।

লেখার ভাষা নিয়ে তিনি বললেন, “একটা জিনিস নিয়ে সবাইকেই ভাবতে হবে। আমি বলি ভাবা উচিৎ। ভাষার সৌন্দর্য নিয়ে ভাবা উচিৎ। বাংলা ভাষার সৌন্দর্য নিয়ে না ভাবলে লেখা হবে, গল্পও হবে- কিন্তু অভিঘাতটা আর হবে না”। 

তিনি আরও বললেন, “আমি পাঠকদের জন্য নয়, নিজের জন্য লিখি। নিজেকে তৃপ্ত করে লিখি”।

ছোটবেলার কথা বলতে গিয়ে তিনি বললেন, “আমি মাঝে মাঝেই বলি, যে আমার ছেলেবেলা থেকে একটা মানসিক সঙ্কট ছিল, একটা বিপন্নতা ছিল। একটা অদ্ভুত ধরণের মাঝে মাঝে বিষণ্ণতা আসত। পাঁচ-ছয় বছর বয়স থেকেই। এই মেলানকলি আমাকে এমন একটা জায়গায় নিয়ে যেত যে আমার চারদিক আমার খুব আনরিয়াল মনে হত। আমি কে, কোথা থেকে এলাম...। আমার মনে হতো আমি একটা এলিয়েন- কোত্থেকে এসে পরলাম- কিছু চিনতে পারতাম না- এরকম মনে হতো। এটা হয়তো দুই-তিন মিনিটের জন্য হত, মাকে গিয়ে জড়িয়ে ধরতাম। ‘মা আমার মাথা কেমন করছে-কেমন করছে’ বলতাম। পরে অনেক বড় হয়ে পড়েছি ওয়ার্ডস ওয়ার্থের এই রোগটা ছিল। একটা সময় আরেকটু বয়স হল, আটাশ-ঊনত্রিশ বছর বয়স, তখন আরেকবার এই সঙ্কটটা দেখা দিয়েছিল”।

কথোপকথনের এক পর্যায়ে কথা আসে তাঁর লেখায় ক্রিকেট আর টেন্ডুল্কারের কথা; কথা হয় ক্রিকেটের প্রতি তাঁর অনুরাগ নিয়ে। কথাসাহিত্যিক মিলন জানতে চাইলেন ক্রিকেটের প্রতি তাঁর অনুরাগ জন্মাল কিভাবে। বললেন, “যদিও আমি বাবার খুব কুপুত্র ছিলাম”, বলে গাল ভরে হাসলেন তিনি, “বাবা থেকেই এসেছে। বাবা খুব ভাল ছিলেন খেলাধুলায়। টেনিস, ক্রিকেট সবই ভাল খেলতে তিনি। তবে, আমি ওটা নিয়ে যা লিখি তা মন থেকে লিখি না। অফিস থেকে বলা হয়, তাই লিখি”।

ক্রিকেটের কথা উঠতেই বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে তাঁর ভাবনা জানতে চান ইমদাদুল হক মিলন।  শীর্ষেন্দু বললেন, “ক্রিকেটে একদিক ভারত আরেকদিক বাংলাদেশ হলে, যদি ভারত জেতে ভাল লাগে। কিন্তু বাংলাদেশ জিতলে খুশি হই মন থেকে”।

কবিতা কখনো লেখেননি শির্ষেন্দু। কিন্তু তাঁর স্ত্রী পেরেছিলেন কবিতা লিখতে। দেশ পত্রিকায় ছাপাও হয়েছিল। পরবর্তীতে তিনি আর সেটা ধরে রাখতে পারেননি। 

কথা হয় তাঁর গল্পে নতুন শব্দের ব্যাবহার নিয়ে। যেমন, ‘আলু টপকানো’ এ ধরণের শব্দ তিনি কি ভেবেছিলেন সাহিত্যে আনা যায়- জানতে চাইলে তিনি বললেন সেই স্কুলের কথা, যেখানে তিনি একসময় পড়াতেন। বললেন, “এসব কলোকয়েল শব্দ- কুড়িয়ে মাড়িয়ে আনা সব।আমি কনটেম্পোরারিতে খুব কাছে থাকার চেষ্টা করি। আমি নিজে একটা স্কুলে পড়াতাম। আমার স্কুলটা খুব বাজে স্কুল ছিল, ফেল করা ছাত্র এসে ভর্তি হতো, মস্তান-টস্তান টাইপের। একবার এক ছেলেকে আমি কানমলে দিয়েছিলাম। তখন এক বন্ধু বলেছিল, ‘তুই কানমলে দিয়েছিস, ও কে জানিস? ও ক্ষুদিরাম। আলু টপকে দিবে’। কিন্তু ক্ষুদিরাম আমাকে খুব ভালবাসত, সে কারণে কিছু করেনি, আমাকে আলু টপকায় নি” বলে হেসে দিয়ে বললেন, “ওই যে বললাম, কুড়িয়ে মাড়িয়ে আনা সব”। 

(শেষের অংশ দ্বিতীয় পর্বে